ভারতের কেরালার রাজধানী তিরুঅনন্তপুরমের অমবুরি গ্রামের উষাকুমারীর বসবাস। গত ২০ বছর ধরে রাস্তা, নদী, জঙ্গল ও পাহাড় ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া শিক্ষককে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম সংবাদ প্রতিদিন।
শিক্ষাদানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। আর ছিল সমস্ত বাধা পেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তরকঠিন জেদ। এই দুই অস্ত্রকে হাতিয়ার করেই একদিন পছন্দর পেশায় চলে এসেছিলেন। সেই থেকে শুরু। কণ্টকময় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া এখন রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষিকা উষাকুমারীর। এই শিক্ষিকার নিত্য সংগ্রামের কথা জানলে, তাকে স্যালুট না করে উপায় নেই।

রোজ ঘড়ি ধরে সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি থেকে স্কুলে উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে স্কুটি নিয়ে পৌঁছন কাদাভু। সেখান থেকে নদীপথ। বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গল লাগোয়া অগস্ত্যবনম। তারপর জঙ্গলের ভিতর পাহাড়ের গা বেয়ে শুরু হয় ট্রেকিং। একটি মাত্র লাঠি সম্বল করে চড়াই-উতরাই পেরনো। প্রতি মুহূর্তে জঙ্গলের ভয়ংকর প্রাণীদের আক্রমণের আশঙ্কা।

কিন্তু সে সব ভয়কে জয় করে মহানুভব এই শিক্ষিকা একা স্কুলে পা রাখেন। এ সময় তার জন্য সেখানে অপেক্ষা করতে থাকে ১৪জন খুদে পড়ুয়া। এরা সকলে পিছিয়ে পড়া কান্নি উপজাতির। স্কুলে পড়ার তেমন সুযোগ তারা পায় না। আর এখানেই উষাকুমারীর জেদ আরো বেড়েছে। তিনি খুব ভাল বুঝতে পারেন যে, এখানে পড়াতে না এলে এরা চিরকাল শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।

প্রথমে গাছতলায় বসে ছাত্রছাত্রীদের পড়াতেন উষাকুমারী। তারপর তার উদ্যোগেই স্কুলবাড়ি তৈরি হয়। তিনি একাই এসব শিশুদের ভাষা, অঙ্ক আর বিজ্ঞানের পাঠ দেন। সকলে মন দিয়ে তার ক্লাস করে। পড়াশোনা শেষে খাওয়ার পালা। সেখানেও উষাকুমারী একাই সব। একাই রেঁধে-বেড়ে খাওয়ান। বেতনের টাকা থেকে বাঁচিয়ে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য নিয়মিত দুধ, ডিম দেন। এভাবেই তার একটা দিন শেষ হয়।

সবদিনই অবশ্য এমন মসৃণভাবে কাটে না। ঝড়-জল আছে, আছে অসুস্থতাও। তেমন অসুবিধায় পড়লে পডুয়াদের কারো একটা বাড়িতে থেকে যান উষাকুমারী। যাতে পরেরদিন স্কুলে যেতে সমস্যা না হয়। একটি দিনও কামাই দেন না তিনি। তাহলে যে খুদেরা পিছিয়ে পড়বে!

প্রতিটি দিন এমন সংগ্রামকে সঙ্গী করে নিয়ে নিজের কর্তব্যে অবিচল থাকা শিক্ষিকা বহু সম্মান, বহু পুরস্কারও পেয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, এই ছাত্রছাত্রীরা বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কারটি পাওয়া হবে। উষাকুমারীর মতো শিক্ষিকাই সমাজের প্রকৃত শিক্ষাদাত্রী, সেই সঙ্গে নারীশক্তির এক বড় প্রতিভূ। উষাকুমারী, আপনাকে অন্তরের শ্রদ্ধা, কুর্নিশ।
বাংলা




