জাতীয়শিরোনাম

দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫০ লাখ লোক

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
বাংলাদেশে দিন দিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস এখন মহামারি হয়ে উঠছে। সারা বিশ্বে এটি একটি আতঙ্কের নাম হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে এই রোগীর সংখ্যা অর্ধ কোটির উপরে। বছরে বাড়ছে আরো ১ লাখ রোগী। আগামী ২০ বছরে এ সংখ্যা পৌঁছবে ১ কোটি ২০ লাখে। বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ৫৭ শতাংশ লোক জানেনা যে তার ডায়াবেটিস রোগ আছে। বছরে এই রোগে প্রায় ১ লাখ লোক মারা যাচ্ছে।
আান্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব মতে, ২০১৯ সালে প্রতি ১১ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিল (মোট ৪২৫ মিলিয়ন); ২০৪৫ সালে ৪৮ শতাংশ বেড়ে তা ৬২৯ মিলিয়ন হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পৃথিবীর মোট ডায়াবেটিস রোগীর ৮৭ শতাংশই উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে।
বাংলাদেশে যেমন ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশি, তেমনি ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হারও বেশি। ২০১৯ সনে বাংলাদেশ শীর্ষ ১০ ডায়াবেটিস সংখ্যাধিক্য দেশের মধ্যে ১০ম স্থানে ছিল। কিন্তু আরো ভয়াবহ হলো ২০৩০ ও ২০৪৫ সনে বাংলাদেশ নবম অবস্থানে থাকবে। পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে উচ্চহারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে। বাংলাদেশসহ সব উন্নয়নশীল দেশে খুব দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে, মানুষের দৈহিক ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে আনুপাতিক ও কাঙ্খিত হারের চেয়ে বেশি, মানুষের দৈহিক শ্রম দিনে দিনে কমে যাচ্ছে, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মানসিক চাপ বেড়েছে অনেকগুণ। উন্নত দেশগুলোতে ডায়াবেটিস রোগীর হার কমলেও তা খুব উল্লেখযোগ্য হারে নয়।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ডায়াবেটিস এমন এক রোগ, স্বাস্থ্য শিক্ষাই যার প্রধান চিকিৎসা। যথাযথ স্বাস্থ্য শিক্ষা পেলে একজন ডায়াবেটিক রোগী চিকিৎসকের ওপর নির্ভর না হয়ে এ রোগ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। ডায়াবেটিস সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় প্রতিবছর মৃত্যুবরণ করছে অসংখ্য মানুষ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে জীবনযাপন পদ্ধতি ও খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে ডায়াবেটিস মহামারি আকার ধারণ করছে। ডায়াবেটিস যে হারে বাড়ছে তাতে আমাদের এখনই এ রোগ প্রতিরোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। আর যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের সচেতন করে তুলতে হবে, যাতে তারা ডায়াবেটিসকে সুনিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মঠ জীবন নিশ্চিত করতে পারে। ঘন ঘন ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে হবে। একপর্যায়ে পৌঁছালে অনেক জটিল রোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে ডায়াবেটিস।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) সূত্র জানায়, টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী বেশি। প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ। শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশি প্রতিরোধযোগ্য। প্রাথমিকভাবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাডাস কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সমপ্রতি বাডাস কর্পোরেট ভিত্তিক ডায়াবেটিস প্রতিরোধ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এই কর্মসূচির অধীনে বিভিন্ন অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্বল্পমূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয় ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা দেয়া হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। ২০৩০ সালে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে ৫০ কোটিতে। বাংলাদেশে আশির দশকে ডায়াবেটিস রোগী সংখ্যা ছিল যেখানে মাত্র ২ শতাংশ এটি এখন শুধু ঢাকা শহরেই প্রায় ১০ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ। এছাড়াও প্রি-ডায়াবেটিস (ডায়াবেটিস-এর আগের ধাপ)-এর হার আরো প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ বিএসএমএমইউ’র এন্ডোক্রাইনোলজি (ডায়াবেটিস ও হরমোন) বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আশির দশকে যেখানে মোট ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২ শতাংশ, সেখানে এখন গ্রামাঞ্চলেও ডায়াবেটিসের সামগ্রিক প্রবণতা ৮ শতাংশের মতো। এভাবে ক্রমশ ডায়াবেটিস বাড়তে থাকলে শুধু ডায়াবেটিসের কারণেই দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য হবে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। তাছাড়া, ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যার কারণে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়ে হার্ট অ্যাটাক, কিডনি ফেইলিউর, অন্ধ হয়ে যাওয়া, পায়ে পচন, এমনকি পা কেটে ফেলা পর্যন্ত লাগতে পারে। সময় মতো ইন্টারভেনশন (খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রার পরিবর্তন), নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডায়াবেটিস প্রতিরোধ সম্ভব বলে জানান তিনি।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে গর্ভবতী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যা শতকার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এই সংখ্যা ২০ বছর আগে ৫ থেকে ১০ শতাংশ ছিল। এটা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ন ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেই রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের প্রায় অর্ধেক পরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। এমনকি অপরিকল্পিত গর্ভধারণের কারণে শিশু অপুষ্টির শিকার হলে এবং সেই শিশু পূর্ণবয়স্ক হবার পর অতিরিক্ত ওজন হলে তার ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি বহুগুণ বেশি থাকে। ডায়াবেটিস এর চিকিৎসার জন্য একজন রোগীর মাসিক গড় খরচ প্রায় ২ হাজার টাকা হয় বলে বাংলাদেশে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন এর এক গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশে যারা ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা নেন তাদের শতকরা প্রায় ৭২ ভাগ ট্যাবলেট খান এবং প্রায় ১৭ ভাগ ইনসুলিন নেন। বাকি ১১ শতাংশের দুটোই প্রয়োজন।

এদিকে, ডায়াবেটিস প্রতিরোধে জাতীয় নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি করে তা সরকারের কাছে হস্তান্তর করা করেছিল বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস)। গত ১০ বছরের বেশি সময়ে ডায়াবেটিস রোগ নিয়ে মন্ত্রণলায়ে জমা দেয়া খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করতে পারেনি সরকার। বাডাস’র সভাপতি অধ্যাপক একে আজাদ খান বলেন, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগী বাড়ছে। তবে এর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও আনুমানিক ৫০ লাখ লোক এই রোগে আক্রান্ত। গ্রামের চেয়ে শহরে ডায়াবেটিসের রোগী বেশি। বহুবিধি কারণে এটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নগরায়ন, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া ইত্যাদি। বছরে এই রোগে প্রায় এক লাখ লোক মারা যাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগে আজ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘ডায়াবেটিস সেবায় পার্থক্য গড়ে দেন নার্সিং’।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button