উপমহাদেশশিরোনাম

দিল্লির সহিংসতা বন্ধে মধ্যরাতে আদালত বসানো সেই বিচারপতিকে বদলি

ভারতে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় বিজেপি সরকার ও পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করা দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি এস মুরলিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করা হয়েছে। খবর এনডিটিভি।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে নিজের বাসভবনে আদালত বসিয়ে দিল্লির সহিংসতা বন্ধে রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মুরলিধর। সেই সঙ্গে দোষী বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন এবং দিল্লি পুলিশের ব্যর্থ ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি।
বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ঘিরে রাজধানী দিল্লিতে টানা কয়েক দিন ধরে চলা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুই শতাধিক। নিহতদের মধ্যে রয়েছে পুলিশ কর্মী, গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যও।
উত্তর-পূর্ব দিল্লির মুস্তাফাবাদে আটকে পড়া আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তি করতে পুলিশের কোনো সাহায্য না-পেয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার সময় বিচারপতি মুরলীধরের বাড়িতে যান চিকিৎসক, মানবাধিকার কর্মীরা।
তাদের আবেদন শুনতে রাজি হন বিচারপতি মুরলিধর। রাত পৌনে ২টার সময় দিল্লি পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা মানুষের কাছে পৌঁছে ভরসা তৈরির সময়।’
দিল্লি পুলিশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে বিচারপতি বলেন, ‘আপনি দিল্লির পুলিশ কমিশনারকে পরামর্শ দিন, উসকানিমূলক ভাষণ দেওয়ার জন্য চার বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে এফআইআর করা হোক।’
তুষার মেহতা আবেদন করেন, ‘এ বিষয়ে শুনানি কি ১৬ ঘণ্টার জন্য মুলতবি রাখা যেতে পারে?’ বিচারপতি মুরলীধর বলেন, ‘দোষীদের বিরুদ্ধে কি অবিলম্বে এফআইআর করা উচিত নয়? শহরের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা মোটেই সন্তোষজনক নয়।’
এরপরে বিচারপতি কপিল মিশ্রের উসকানিমূলক ভাষণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ওই বিজেপি নেতার ভাষণের ভিডিও শত শত মানুষ দেখেছেন। আপনি কি এর পরেও মনে করেন, ব্যাপারটা জরুরি নয়?’
এক পুলিশকর্মী হাইকোর্টে বলেন, ‘তিনি সহিংসতার কয়েকটি ভিডিও দেখেছেন। কিন্তু কপিল মিশ্রের ভাষণের ভিডিও দেখেননি’। বিচারপতিরা বলেন, ‘ব্যাপারটা খুবই উদ্বেগজনক। আপনাদের অফিসে অনেকগুলি টিভি আছে। এক পুলিশ অফিসার কেমন করে বলতে পারেন, তিনি ওই ভিডিও দেখেননি? দিল্লি পুলিশের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়।’
বিচারপতি এস মুরলিধর নির্দেশ দেন, নাগরিকদের প্রয়োজনে জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা দিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব কেন্দ্রীয় সরকারে পক্ষ থেকে আক্রান্তদের পরিবারের প্রতি সব ধরনের সহায়তা পৌঁছানো দরকার বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি। ২৪ ঘণ্টার হেল্প লাইন, সব সময়ের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা রাখতে হবে পুলিশকে।
দিল্লি হাইকোর্টের তৃতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী বিচারপতি এস মুরলিধরের বদলির বিজ্ঞপ্তি বুধবার রাতে ইস্যু করে কেন্দ্রীয় সরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়াম থেকে এটি সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে প্রেসিডেন্ট বিচারপতি মুরলিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত করা হলো।
তবে মুরলিধরের বদলিতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দিল্লি হাইকোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন ‘দ্ব্যর্থহীন এবং যথাসম্ভব কড়া ভাষায়’ বদলির সিদ্ধান্তের নিন্দা করে বলে, এর ফলে প্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মঙ্গলবার মাঝরাত থেকে বিচারপতি মুরলীধরের ভূমিকায় আইনজীবীদের ভাষ্য ছিল। কার্যত দিল্লির মানুষের ‘রক্ষাকর্তা’ হয়ে উঠলেন তিনি।
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী টুইট করে বিচারপতির বদলির সমালোচনা করেছেন। তিনি লেখেন, এই বদলির নির্দেশ এই মুহূর্তে ততটা ‘শকিং’ নয়। কিন্তু এটি একই সঙ্গে দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার জানায়, এই বদলির সিদ্ধান্ত সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মধ্যেই নেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য বিচারপতির অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ টুইট করে কংগ্রেসের সমালোচনা করেছেন একটি নিয়মমাফিক বদলির ঘটনাকে ‌নিয়ে রাজনীতি করার জন্য।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button