উপমহাদেশশিরোনাম

দিল্লিতে ১৫ দিন পর ডেঙ্গিতে শিশুর মৃত্যু, হাসপাতাল বিল চাইলো ১৭ লাখ রুপি

ভারতে রাজধানী দিল্লির কাছে একটি বেসরকারি হাসপাতাল একটি শিশুকে মাত্র পনেরো দিন ভর্তি রেখে তার পরিবারকে সতেরো লক্ষ রুপির বিল ধরানোর পর কেন্দ্রীয় সরকার গোটা বিষয়টিতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
আদ্যা সিং নামে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত ওই বাচ্চাটিকে বাঁচানোও যায়নি, অথচ হাসপাতাল তার পরিবারকে ২৭০০ গ্লাভস ও সাড়ে ছশোরও বেশি সিরিঞ্জের দাম পর্যন্ত চার্জ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদিও দাবি করেছে তাদের বিলিংয়ে কোনও ভুলত্রুটি হয়নি, কিন্তু এই ঘটনার পর ভারতের বেসরকারি হাসপাতালগুলো কীভাবে চিকিৎসার নামে রোগীর পরিবারকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে সেই অভিযোগ আরও একবার সামনে এসেছে।
দিল্লির কাছে গুরগাঁওয়ে সাত বছরের বাচ্চা মেয়ে আদ্যা সিং ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় গত সেপ্টেম্বরে।

দিল্লির একটি হাসপাতালে ডেঙ্গি রোগীর ভিড়

মারা যাওয়ার আগে পনেরোদিন তাকে ভেন্টিলেটর ও ডায়ালিসিসে রাখা হয়েছিল স্থানীয় ফর্টিস হাসপাতালে – যার জন্য তার পরিবারকে সতেরো লক্ষ রুপিরও বেশি অঙ্কের বিল ধরায় ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আদ্যার বাবা বলছেন, “শেষ দিনে তাদের মনোভাব পুরোপুরি বদলে যায় যখন তারা বুঝতে পারে এর কাছ থেকে আর কোনও টাকা দুইয়ে নেওয়া যাবে না। চিকিৎসার ব্যাপারে আমি অজ্ঞ, কিন্তু বিলের অঙ্ক দেখে এই প্রশ্নটা আমার মনে হচ্ছেই যেভাবে আমার মেয়েকে টানা ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল সেটার আদৌ দরকার ছিল কি না।”
মোটা ওই বিলে শত শত গ্লাভস, সিরিঞ্জ এমন কী অ্যাপ্রনের দাম পর্যন্ত ধরা হয়েছে বলে পরিবারটি জানাচ্ছে।
তাদের এক বন্ধু এই ঘটনার কথা টুইটারে জানানোর পর বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার নজরে পড়ে।
মি নাড্ডা আশ্বাস দিয়েছেন, “সরকার এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এর মধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদেরকে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট দিতেও বলা হয়েছে, এবং কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব সেই রিপোর্ট দেখে ও তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।”
ফর্টিস কর্তৃপক্ষ অবশ্য একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছে, তারা আদ্যার পরিবারকে তার শারীরিক অবস্থা ও খরচের অঙ্ক নিয়ে প্রতিদিন অবহিত রেখেছিল।
তবে ঘটনা হল, দিল্লি ও তার আশেপাশে তাদের বিভিন্ন হাসপাতাল নিয়ে এই ধরনের অভিযোগ নতুন নয়।
বেশ কয়েক মাস আগে দিল্লিতে ফর্টিসের বসন্ত কুঞ্জ শাখায় বিহারের এক গরিব মেহনতি মানুষের বাচ্চার মৃতদেহ আটকে রাখা হয়েছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার রুপি বকেয়া আছে, এই অপরাধে।
দিল্লিতে একটি এলাকায় মশা নিধনের ওষুধ ছড়ানো হচ্ছে

ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য দাবি করছে হাসপাতালগুলো যাতে ইচ্ছেমতো রোগীকে লুঠতে না-পারে তার জন্য যথেষ্ট আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা আছে।
সংস্থার সভাপতি ড: কে কে আগরওয়াল জানাচ্ছেন, “ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল অ্যাক্টই বলুন বা ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্ট, সব আইনই বলে রোগীকে চিকিৎসার আগেই খরচ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে – পরে নয়।”
“এমন কী রোগীর পরিবারের তা সাধ্যের বাইরে হলে নিকটবর্তী অন্য হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করারও দায়িত্ব তাদের, যা তারা এড়াতে পারে না।”
কিন্তু ভারতের বিভিন্ন কর্পোরেট হাসপাতালে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অন্য কথাই বলে।
কিছুদিন আগে কলকাতার এক কর্পোরেট হাসপাতালে প্রায় দুলক্ষ রুপির মেডিক্যাল বিল ওপর মহলে চাপ দেওয়ার পর কীভাবে ছ-সাত হাজারে নেমে এসেছিল, তা নিয়ে বিপুলজিৎ বসুর একটি পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছিল।
মি বসু মঙ্গলবার বিবিসিকে বলছিলেন, “এই সব হাসপাতালে একটা গ্রিভ্যান্স সেল বা হেল্পডেস্ক থাকার কথা – যেখানে এই সব ক্ষেত্রে রোগীর পরিবার সাহায্য পাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় সেটা অদৃশ্যই, রোগীর লোকজন এখান থেকে ওখানে ঘুরতে থাকে কিন্তু কখনো সেই ডেস্কের আর নাগাল পায় না।”
হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা সেবা নিয়ে লোকের মনে অসন্তোষ আছে

“আর যখন আমি আমার বাবা-মা কিংবা কোনও প্রিয়জনকে ভর্তি করাতে যাচ্ছি, তখন হাসপাতাল আমায় তাদের নিয়মকানুনের কী ফর্মে সই করাল – যাতে মেডিক্যাল পরিভাষা ভর্তি – সেগুলো বোঝা তখন কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বলেই পরে তারা সেই কর্পোরেট হাসপাতাল ভাঙচুর করতে বাধ্য হন, কারণ তাদের কাছে আর কোনও রাস্তা থাকে না”, বলছিলেন মি বসু।
গুরগাঁওয়ের আদ্যা সিংয়ের পরিবার হাসপাতাল ভাঙচুরের রাস্তায় যাননি, মেয়েকে হারানোর পর তাদের সেই অবস্থাও ছিল না।
কিন্তু ভারতে প্রিয়জনকে হারানোর শোককেও কীভাবে ছাপিয়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতালের বিলের ধাক্কা – এই ঘটনা তারই এক করুণ দৃষ্টান্ত।
বিবিসি বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button