দিনাজপুরে বন্যার অবনতি : তিন জেলায় ১৭ জনের মৃত্যু

বন্যায় দিনাজপুরে একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ১৩ জন মারা গেছেন। জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে নিহতের মধ্যে নয়জনের নাম পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানান, বিরল, কাহারোল, সদর, খানসামা ও বীরগঞ্জ উপজেলায় এ পর্যন্ত মোট ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে নিহতদের সবার নাম এখনো জানা যায়নি।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাংবাদিকদের জানান, সদর উপজেলার বেংকালী গ্রামের মোস্তফার ছেলে রাশেদ, বালুবাড়ীর ডিপিপট্টি এলাকার মেহেদী হাসান (১৫), বালুবাড়ী ঢাকাইয়াপট্টি এলাকার শফিকুল ইসলাম (৩৮), রাজবাটী এলাকার নাঈম (১৬), বিরল উপজেলার মালঝাড় গ্রামে দিপালী রায় (৩৫) নামে এক গৃহবধূ পানিতে ডুবে মারা যান।
এদিকে, কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ঈশ্বরপুর গ্রামে আশ্রয়কেন্দ্রে আসার সময় কলার গাছের তৈরি ভেলা উল্টে চার ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো চুমকি (১৩), শহীদ আলী (১০) ও স্মৃতি (৭) ও তাদের চাচাতো ভাই শিহাদ (৭)। প্রথম তিনজনের বাবা আবদুর রহমান।
কাহারোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনসুর আলী সরকার বলেন, বাড়িতে পানি ওঠায় ওই চার শিশু কলাগাছের তৈরি ভেলায় করে ঈশ্বর গ্রাম মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্রে আসছিল। এ সময় আশ্রয়কেন্দ্রের পাশেই ভেলাটি উল্টে ওই চারজন মারা যায়। তবে ওই ভেলায় আরো কেউ ছিল কি না, তা জানাতে পারেননি ওসি।
ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দিনাজপুর জেলায় শনিবার থেকে শুরু হয় বন্যা। ইতিমধ্যেই দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর সদর, বিরল, কাহারোল, বীরগঞ্জ, খানসামা, চিরিরবন্দর ও পার্বতীপুর উপজেলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানিবন্দি ও গৃহহীন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাঁধ এলাকায়। জেলার দুই হাজার ৯৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বানভাসী মানুষের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।
দিনাজপুর সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুজ্জামান জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা না হলেও বন্যাদুর্গত এলাকায় বানভাসী মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আশ্রয় নেয়ায় সেগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলার সব নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহরের তুঁতবাগান এলাকায় দিনাজপুর শহর রক্ষা বাধের ৫০ মিটার ভেঙে গেছে। এছাড়াও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বাধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়জুর রহমান জানান, পুনর্ভবা নদীর পানি বিপদসীমার দশমিক ৭৮ সেন্টিমিটার এবং আত্রাই নদীর পানি দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়াও সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
দিনাজপুর শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় সেই বাঁধ সংস্কারে বিজিবি সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। বিজিবি ব্যর্থ হওয়ায় দুপুরে বাঁধ সংস্কার ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী।
রোববার দুপুর থেকে মেজর তৌহিদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের ৫২ সদস্য বাঁধ সংস্কার ও বানভাসী মানুষকে উদ্ধারের কাজ শুরু করেছেন।
বন্যার কারণে দিনাজপুরের অধিকাংশ সড়ক ও মহাসড়ক পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় দিনাজপুর জেলার সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। হিলি স্থল বন্দর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শনিবার থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম।
বন্যায় ভেঙে গেছে জেলার হাজার হাজার ঘরবাড়ি। পানির নিচে তলিয়ে গেছে জেলার প্রায় দুই লাখ হেক্টর জমির ফসল।
দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুরে ২৯৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এক লাখ ১০ হাজার টাকা ও ৬৭ মেট্রিকটন চাল বন্যাদুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও বন্যার্তদের জন্য ৫০ লাখ টাকা ও তিনশ’ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ চেয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম রোববার দিনাজপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার্তদের মাঝে খাবারসহ ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন।




