ঢাকা-বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড, ৪০ জনের লাশ উদ্ধার

মোঃশাহাদাত হোসেন মনু, ঝালকাঠি প্রতিনিধি : ঢাকা থেকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামে একটি লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাবার পথে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পৌঁছলে ইঞ্জিন রুম থেকে এ আগুনের সুত্রপাত হয়। বৃহষ্পতিবার সন্ধ্যায় লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে বরিশাল পর হয়ে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলাধীন দপদপিয়া এলাকায় সুগন্ধা নদীতে আসলে বৃহস্পতিবার সাড়ে তিনটার
দিকে ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুন লাগে বলে জানা গেছে। জেলা প্রশাসক মো.জোহর আলী এ পর্যন্ত ৪০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানালেও স্থানীয় বিভিন্ন বিশ^স্ত সূত্রে লাশের সংখ্যা আরো অনেক বেশি দাবী করা হচ্ছে। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, র্যাব ডিজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল ইসলাম বাদল, ডিআইজি আক্তারুজ্জামান সহ সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দগ্ধদের সঠিক চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। হেলিকপ্টার যোগে র্যাব, বিআইডবিøউটিসি, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বেচেঁ যাওয়া যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,ঢাকা থেকে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে বরগুনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল এমভি
অভিযান-১০ যাত্রীবাহী লঞ্চটি। রাতে ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুন লাগে। এ সময় কেবিন ও ডেকের বেশীরভাগ যাত্রীরা ঘুমিয়ে ছিলেন। লঞ্চটি বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে তিনটার দিকে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া এলাকায় পৌছালে ইঞ্জিন কক্ষে আগুন ধরে যায়।
বেচেঁ যাওয়া যাত্রী বামনা উপজেলার মোঃ আবদুল্লাহ জানান, আগুন দেখে নিচতলার ডেকের যাত্রীরা দোতলায় অবস্থান নেয়। লঞ্চের স্টাফরা কেবিনের
যাত্রীদের কেবিন থেকে বের হতে নিষেধ করে । আবদুল্লাহ আরও জানান আগুন লাগার পরও লঞ্চটি প্রায় ৩০/৪০ মিনিট চালিয়ে প্রথমে ঝালকাঠির
বিষখালী-সুগন্ধ্যা-ধানসিড়ি নদীর মোহনায় মোল্লাবাড়ি তোতা শাহর মাজার এলাকায় থামিয়ে দেয় । সেখানে লঞ্চের সকল স্টাফসহ তিনশাতাধিক যাত্রী নেমে যেতে সক্ষম হয় ।

যাত্রী মোঃ বাচ্চু মিয়া জানান, বেশীরভাগ যাত্রী ও স্টাফরা মাজার এলাকায় নেমে গেলেও লঞ্চে আটকা পড়েন কেবিন ও ডেকের ঘুমন্ত যাত্রীরা । এখান থেকে লঞ্চটি ভাসতে ভাসতে ঝালকাঠির দিয়াকুল গ্রামে সুগন্ধ্যা নদীর তীরে আটকে যায় । এখানেও বেশ কিছু যাত্রীকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা । অনেকে লঞ্চ থেকে লাফিয়ে নদীতে পড়েন । ভোর পাচটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ নদীর তীর থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করে হাসপাতালে প্রেরণ করেন । উদ্ধারকৃত লাশ ঝালকাঠি পৌর মিনি পার্কে এনে রাখা হয় । এখানে সুরতহাল তৈরি করে লাশ ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে ৬০ জনেরও বেশি যাত্রী দগ্ধ হয়। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। দগ্ধ যাত্রীদের উদ্ধার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে উদ্ধার কাজে
সহযোগিতা করেন।
এদিকে লঞ্চে আগুনের খবর শুনে বরগুনা ও এর আশেপাশে এলাকা থেকে স্বজনরা ঝালকাঠি লঞ্চঘাট এলাকায় ছুটে এসেছেন। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে গেছে ঝালকাঠির বাতাস। হারানো স্বজনদের খোজে আসা বরগুনার মোঃ হারুন বলেন, তার মেয়ে রিমু বেগম (২১) নাতি লিমা(১১) নিখোজ রয়েছে । একই এলাকার স্বজন আল-আমিন বলেন, তার বড় ভাই ইদ্রিস (৬০) নিখোজ । স্বজন ফোরকান বলেন বোন রিনা (২৮) ভাগ্নি নুসরাত (১০) এর কোন খোজ পাওয়া যাচ্ছে না ।

ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মোঃ জোহর আলী জানান, উদ্ধারকৃত ৩৬ লাশের মধ্যে ৫ জনের লাশ সনাক্ত করা হয়েছে , সকল লাশেরই পোস্ট মর্টেম সম্পন্ন করে তারপর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে । তিনি আরও জানান ঘটনা তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ সদস্য বিশিস্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে । নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হবে। এছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে একলাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।
ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিস এর উপপরিচালক কামাল উদ্দিন ভুইয়া জানান, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ৩০টি লাশ উদ্ধার করেছে । বাকি লাশ কোস্ট গার্ড উদ্ধার করেছে। ফায়ার সার্ভিস ও কোস্ট গার্ডের ডুবুরী দল সুগন্ধ্যা ও বিষখালী নদীতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। দুর্ঘটনার কারন সম্পর্কে উপপরিচালক কামাল ভূইয়া বলেন, তদন্ত ছাড়া এটি পুরোপুরি বলা সম্ভব না। তবে লঞ্চের যাত্রীরা বলছেন, ইঞ্জিনরুমে বিকট শব্দর পর পুরো লঞ্চে আগুন ধরে যায় । লঞ্চের আহত যাত্রী রাসেল মিয়া বলেন, আগুন লাগার পর লঞ্চের চালক ইচ্ছে করলে লঞ্চটি অনেক আগে থামাতে পারতেন আগুন লাগার পরও তিনি লঞ্চটি অনেক্ষন চালিয়েছেন । সর্বশেষ লঞ্চের সকল স্টাফ যাত্রীদের মৃত্যুর মুখে রেখে পালিয়ে গেছে।
এদিকে আগুনের ঘটনায় দগ্ধ ৮০জন ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গুরুতর দগ্ধদের বরিশাল শেরই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের বার্ন ইউনিট না থাকায় সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, ঢাকা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় মেসার্স নেভিগেশন কোম্পানীর এমভি অভিযান-১০ (এম-০১-২৩৩৯) লঞ্চটি ২৫জন স্টাফসহ ৩১০জনের ভয়েস ক্লিয়ারেন্স দিয়ে টার্মিনাল ত্যাগ করে। লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা দিনে ৭৬০জন হলেও রাতের ধারণ ক্ষমতা ৪২০জন। তাছাড়া লঞ্চটির লাইসেন্সের মেয়াদও ছিলো গত জানুয়ারী পর্যন্ত। সনিয়াসহ যাত্রীদের অভিযোগ ঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ার সময়েই লোক ভর্তি ছিলো। চাঁদপুরে থামালে সেখানে থেকে এতো পরিমাণে লোক উঠে যাতে লঞ্চে তিল ধারণের ঠাইও ছিলো না।
নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চটি পরিদর্শন কালে বলেন, একটি লঞ্চে আগুন লেগে পুরো লঞ্চ ভস্মিভুত হবার পিছনে কোন রহস্য থাকতে পারে। নয়তো এভাবে দ্বিতীয় ঘটনা আর বাংলাদেশে ঘটেনি। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে একজন যুগ্মসচিবকে প্রধান করে ৭সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭দিনের মধ্যে কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমাদিলে সে অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, লঞ্চে অগ্নিকান্ডে মৃতদের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা করা হবে।
নৌপ্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের হিসাবমতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে পুড়ে যাওয়া লঞ্চে ৩৫০ জনের মতো যাত্রী ছিল। এর বেশি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। এছাড়া লঞ্চের ফিটনেস ঠিক ছিল বলে জানতে পেরেছি। লঞ্চে অগ্নিকান্ডে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা এখনই বলতে পারছি না।




