জীবন দিয়ে নারী ও শিশুকে বাঁচালেন রেলকর্মী

বেলা তখন ১টা। রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড রেললাইনে পাতের কাজ করছিলেন বাদল মিয়া ও সোহেল মিয়া। এ সময় বোরকা পরিহিত এক মহিলা ৫-৬ বছর বয়সী এক শিশুকে নিয়ে রেললাইন পাড় হচ্ছিলেন। মহিলা পাড় হলে গেলেও শিশুটি তখন রেললাইনের মাঝখানে। ঠিক এ মুহূর্তে সিলেট থেকে ঢাকাগামী সুরমা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুতগতিতে শিশুটির দিকে ধেয়ে আসছিল। এমন সময় রেললাইনে দৃষ্টি পড়ে রেল কর্মচারি বাদল মিয়ার। সময়ক্ষেপণ না করেই দৌঁড়ে গিয়ে শিশুটিকে ধাক্কা দিয়ে রেললাইন থেকে পাশে ফেলে দেন বাদল। ততক্ষণে ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। এভাবে নিজের জীবন দিয়ে এক নারী ও শিশুকে রক্ষা করেন বাদল মিয়া (৫৮)।
ঘটনাটি শুক্রবার দুপুরের।
নিহত বাদলের সহকর্মী সোহেল মিয়া বলেন, বাদল মিয়া ট্রেন লাইনে পাত বসানো কিংবা মেরামত করার কাজের তদারকি করতেন। প্রতিদিনের মতো আজও তারা দু’জনে কাজ করছিলেন। তাদের পাশ দিয়েই ওই নারী এক শিশুসহ রেললাইন পাড় হতে গিয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনার পর ওই নারী ও শিশুকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা রেলওয়ে থানার এসআই আলী আকবর বলেন, ট্রেনের ধাক্কায় বাদলের মাথা ৫-৬ ইঞ্চি পরিমাণ কেটে মগজ বের হয়ে গেছে। তার বাঁ পা ভেঙে গেছে, কপালসহ শরীরের বিভিন্ন স্থান থেঁতলে গেছে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহতের ভাই সিদ্দিকুর রহমান (আবুল) জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার সোনাতলা গ্রামে। বাদল পরিবার নিয়ে বিমানবন্দর এলাকার কাওলা রেলগেট সংলগ্ন একটি স্টাফ কোয়ার্টারে থাকতেন। তিন মেয়ে, পাঁচ ছেলের জনক তিনি। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আর পাঁচ ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বিয়ে করে, কিন্তু বেকার হওয়ায় বাদল মিয়ার সংসারে থাকছে। চার ছেলে লেখাপড়া করে। এদের সবার ভরণ-পোষণের একমাত্র উপার্জক্ষম ছিলো বাদল মিয়া।
আবুল জানান, বাদল মিয়া ১৯ বছর ধরে রেলওয়ে কর্মচারি হিসেবে কাজ করেছেন। এর আগেও তিনি ৮-১০ বছর মাস্টার রুলে বেসরকারি হিসেবে কাজ করেছেন। তখন রেললাইনের গেটম্যান ছিলেন। তার একার আয়ের টাকা দিয়েই এতোগুলো লোকের সংসার চলতো। তার স্ত্রী এখন কিভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে চিন্তিত তারা। ৪টা ছেলের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ব্যক্ত করেন আবুল।
তবে বাদল মিয়ার এরূপ মহত্ত্বপূর্ণ কাজের প্রশংসা সকলে করলেও তার পরিবারকে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা করা হয়নি।
জানা গেছে, লাশ ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যার পরপরই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রেলওয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা অংশ নেন। লাশটি গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছেন আবুল।




