জাপানের স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সময়কাল : দ্বিতীয় পর্ব
আরশাদ উল্লাহ্
জাপানে শিশুদের স্কুলে পাঠানো বাধ্যতামূলক। একদিন স্কুল কামাই দিলে মাতাপিতাকে লিখিত ভাবে জবাবদিহি করতে হয়। প্রাথমিক স্কুলগুলি সরকারী এবং এক একটি স্কুলের আয়তন অনেক বড়। ফুটবল খেলার মাঠ, ব্যায়ামাগার, সুইমিং পুল এবং বেসবল খেলার মাঠ ছাড়াও ছোট পল্ট্রি ফার্ম থাকে। অনেকে জেনে বিস্মিত হবেন যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ঘরের চেয়ে স্কুলে থাকতেই বেশি ভালবাসে। কারণ, দুপুরের লাঞ্চ স্কুল থেকেই দেওয়া হয়। অবশ্য এই জন্য মাসে মাসে যৎসামান্য টাকা দিতে হয়। খাবার সরবরাহ করে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোন কোম্পানি। ছাত্রছাত্রীরা কেন স্কুলকে ঘরের চেয়ে বেশি ভালবাসে তার প্রধান কারণ হল – স্কুলে বিভিন্ন স্পোর্টস ক্লাবে যোগদান বাধ্যতামূলক। সব রকম স্পোর্টস এর ব্যবস্থা স্কুলে আছে। ছাত্ররা ইচ্ছামত কোন ক্লাবে যোগদান করতে পারে। যে ছাত্র বেইসবল ভালবাসে সে বেইসবল ক্লাবে, যে ফুটবল ভালবাসে সে ফুটবল ক্লাবে, যে টেবিল টেনিস ভালবাসে সে টেনিস ক্লাবে, যে সাঁতার ভালবাসে সে সুইমিং ক্লাবে, যে পর্বত আরোহণ পছন্দ করে সে পর্বতারোহি ক্লাবে, এমনতর অনেক ক্লাব রয়েছে যেমন, জুডো ক্লাব, বেডমিন্টন ক্লাব সবই আছে। শিক্ষকেরা ছাত্রদের ইচ্ছামত ক্লাব গঠন করতে সাহায্য করেন। প্রতি ক্লাবে একজন ক্যাপ্টেন থাকে। কোন ছাত্র অনুপস্থিত থাকলে ক্যাপ্টেনকে জবাবদিহি করতে হয়। যারা স্পোর্টস এ ভাল করে। শিক্ষকরা তাদের নাম লিখে নেন এবং যথাসম্ভব উৎসাহিত করেন।
আমাদের শহরের কাছে একটি প্রাথমিক স্কুলের একটি ছাত্র সাঁতার পছন্দ করত। জুনিয়ার হাই স্কুলে গিয়ে সে অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ মেডাল এবং এশিয়ান সাঁতার প্রতিযোগিতায় যোগদান করে স্বর্ণ পদক অর্জন করেছে। সে কারণে তার প্রাথমিক স্কুলের নাম এখন সারা জাপানের মাস-মিডিয়াতে প্রচার করেছে। শহরের মেয়র স্পেশ্যাল উৎসবের আয়োজন করে লক্ষ টাকার রকমারি রঙ্গিন বাজি রাতের অনুষ্ঠানে ফুটিয়ে ছোট শহরটির আকাশ আলোকিত করেছে। এই ভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই স্পোর্টস এ যারা ভাল করে তাদের নাম শিক্ষা ও স্পোর্টস মন্ত্রণালয়ে রেকর্ড করা হয়। তাদের জন্য কোচ সহ প্রয়োজনীয় সবকিছু করে। এই কাজটির পিছনে কিন্তু তার পিতামাতার অবদান কম নয়।
লেখাপড়ার ফাঁকেফাঁকে সুইমিং পুলে নিয়ে গিয়ে তাঁদের সন্তানকে সাঁতরাতে উৎসাহ দিতেন তার মাতাপিতা।
ছাত্ররা স্কুলে খেলাধূলা এবং ক্লাব একটিভিটি ছাড়াও দৈনিক হোম-টাস্কের কাজগুলিও স্কুলেই করে ফেলে। ঘরে ফিরে এসে স্নান সেরে টিভিতে কার্টুন দেখে। তারপর খাওয়া দাওয়া করে ঘুমায়। তাদের স্কুল ব্যাগের পকেটে ছোট একটি ডায়েরি থাকে। ছাত্রটির মা সেটি প্রথমে বের করে পড়ে। তাতে শিক্ষকের উপদেশ এবং আগামীকালের করণীয় কথাগুলি লেখা থাকে। উদাহরণঃ তাতে যদি লেখা থাকে যে আগামিকাল কোন নদীর পাড়ে গিয়ে ছবি আঁকা শিখাবে। তখন তার মা ড্রয়িং বা স্কেচ করার খাতা ও পেন্সিল কিনে এনে ব্যাগে রেখে দিবে।
অলিম্পিকে জাপান অনেক স্বর্ণ, রূপা ও ব্রোঞ্জ পদক পায়। তাতে রাষ্ট্রের সন্মান বাড়ে। একটি ছাত্র জুনিয়ার ও সিনিয়ার হাই স্কুল থেকে অলিম্পিকে গোল্ড মেডাল পেলে রাতারাতি সে কোটিপতি হয়ে যায়। এ টাকা সরকার নয়। বিভিন্ন কোম্পানি থেকে পায়। সে সকল কোম্পানি তার স্পন্সার হলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সে কোম্পানির তৈরী দ্রব্যাদি, খেলনা, গাড়ি ও পোশাক, ব্র্যান্ড এর জুতা, গাড়ি ইত্যাদি তৈরি করে বাজারে ছাড়ে। কিছুদিন হল ওসাকা নাওমি নামে ২০ বৎসর বয়সের এক যুবতি টেনিস খেলাতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হল। নিসান গাড়ি কোম্পানি তার স্পন্সার হয়। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কোন গাড়ি সে পছন্দ করে। নাওমি বলল, সবচেয়ে দামি একটি নিসান গাড়ির কথা। গাড়িটির মূল্য প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা। কোম্পানি তাকে গাড়িটি উপহার দিয়ে বলল, আর কোন গাড়ি পছন্দ?
তখন বলল, নিসান স্কাইলাইন GTR স্পোর্টস কারটির কথা। কোম্পানি সেটাও ফ্রীতে দিয়ে দিল। শুধু তাই নয়, নগদ টাকা দিল প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এই টাকা ও গাড়ি দিয়ে নিসান কারের জনপ্রিয়তা বিশ্বব্যাপি বেড়ে গেল। নাওমি এখন নিসান গাড়ির ‘ট্রেড মার্ক’ হয়ে গেল। শুধু নিসান গাড়ি কোম্পানি নয়। বিশ্বের অন্যান্য কোম্পানি, যেমন, স্পোর্টস জুতা ও জামা-কাপড়ের কোম্পানি এবং আরো অনেক বিখ্যাত কোম্পানি কোটি কোটি টাকা দিয়ে তার নাম কিনে নিবে। একজন সার্থক স্পোর্টস ম্যান বা উম্যান এর সার্থকথা এখানেই। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তারা নিজেদের গড়ে নেয়।
দারিদ্রতার জন্যে অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ চালাতে না পারলে স্কলারশিপের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়াও কিছু কোম্পানি পড়াশুনা চালিয়ে যাবার জন্যে লোন দেয়। যে ছাত্র লোন নিবে। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে যখন চাকুরীতে যোগদান করে তখন তার বেতন থেকে মাসে মাসে লোনের টাকা কেটে নেয়।
বিশ্ব বিখ্যাত নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক জাপানে অনেক আছে। তাদের ভীত কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। শিক্ষকেরা তাদের গ্রেড দেখে আগাম বলে দিতে পারে আগামিতে সে ছাত্র বা ছাত্রীটি জাপানের মুখ উজ্জ্বল করবে কি না। তবে আমি লক্ষ করেছি যে পিতামাতার উৎসাহ শিশুকাল থেকেই ছাত্র বা ছাত্রীটিকে সার্থকতার পথে এগিয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দেয়।
লেখক : জাপান প্রবাসী লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক




