জাপানীরা কেমন : পর্ব–২৬
জন্মের পর যখন সামান্য কিছু বুঝার জ্ঞান হয়েছে তখনকার কথা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে হাইস্কুলে যাওয়ার সময়ে মাথায় যতটুকু জ্ঞান ছিল – তখন পৃথিবীকে আমি অনেক বড় ভাবতাম। এক বৎসরকে এক যুগের সমান আর এক যুগকে শতযুগের সমান ভাবতাম। ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে থাকে এবং পৃথিবীর আকৃতি-প্রকৃতির উপরে আমার ধ্যান ধারণাও বদলাতে থাকে। একই সময়ে প্রকৃতির প্রভাবে মানুষের ধ্যানধারণারও পরিবর্তন হতে থাকে। এই সব পরিবর্তন অতিশয় আগ্রহের সাথে দেখে বুঝার চেষ্টা করতাম। আজকের পৃথিবী অনেক ছোট হয়ে গেছে। দূরের মানুষ কাছে এসেছে। আমাদের দৃষ্টি ভঙ্গিও পাল্টিয়েছে। বর্তমানে কি কেউ ভাবতে পারেন যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক বার জাপান ভ্রমনে এসেছেন এবং তাঁকে উচ্চস্তরের পন্ডিতগণ কর্তৃক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। এশিয়া মহাদেশের সর্বপ্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করা এবং তাঁর নিজস্ব দর্শন তখন জাপানীদের উল্লাসিত করেছিল। আমার জানামতে তিনি পাঁচবার জাপান ভ্রমন করতে এসেছিলেন। সর্বপ্রথম তিনি ১৯১৬ থেকে সর্বশেষ সালটি ছিল ১৯২৯ খৃষ্টাব্দ। কিসে করে তিনি এসেছিলেন হয়তো অনেকেই তা জানেন। তখন বিমান চলাচল ছিল না। তিনি জাহাজে করে বিশ্ব ভ্রমন করেছেন। বর্তমান কালের বিমানের মতো আধুনিক বিমান তখন ছিল না। জাপানীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাঝে কি দেখেছিল? জাপানী পন্ডিতগণ তাঁর মাঝে যে দর্শন, প্রজ্ঞা ও ধীশক্তি ছিল বুঝতে পেরে তা থেকে কিছু অন্বেষণ করার জন্য কবিকে এমন সংবর্ধনা দিয়েছিল।
জাপানীরা এমন এক জাতি – তারা যেখানে শিক্ষার এতটকু আলোকবর্তিকা দেখতে পেতো সেখানেই শিখার জন্য ছুটে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মাঝে ধীশক্তি ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা ছিল বলেই তাঁকে যথাযথ সন্মান দেখিয়ে আপ্যায়ন করা হয়েছে। একই সময়ে রবীন্দ্রনাথ জাপানীদের প্রগতির অংকুরটি কোথায় তাও দেখেছেন। জাপান ভ্রমনের উপর রবীন্দ্রনাথ যে বইটি লিখেছেন তা থেকে একথার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর লেখা সে বইটিতে জাতিগত প্রভেদের অন্তর দর্শন করে তা তিনি যথার্থ ভাবে ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে তৎকালীন খৃষ্টান ইউরুপ, মঙ্গোলিয়ান ও জাপানীদের অন্তর প্রভেদের কথা তিনি সুন্দর ভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি দু’রকম জাতীর মনের উল্লেখ করেছেন, প্রথমটি হল ‘স্থাবর’ আর দ্বিতীয়টি হল ‘জঙ্গম’। তাঁর লেখাতে স্থাবর-জঙ্গমতার প্রভেদ কোথায় তা দেখিয়ে ব্যক্ত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষাতে স্থাবর জাতির লোকেরা দায়ে পড়ে নড়েচড়েবসে। আর জঙ্গম জাতি দায়ে পড়ে উঠে দাঁড়ায়। জাপানীদের মনকে তিনি জঙ্গম জাতীর সাথে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষাতে,”এই জন্য তারা এক দৌড়ে দু-তিন শো বছর হু হু করে পেরিয়ে গেল। আমাদের মতো যারা দুর্ভাগ্যের বোঝা নিয়ে হাজার বছর পথের ধারে বটতলায় শুয়ে গড়িয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে, তারা অভিমান করে বলে, “ওরা বড় হালকা, আমাদের মতো গাম্ভির্য থাকলে ওরা এমন বিশ্রীরকম দৌড়ঝাঁপ করতে পারত না!”

সে আমলেই রবীন্দ্রনাথ জাপানের অসাধারণ প্রগতি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তখন তিনি এই প্রগতির পিছনে কী ছিল তা বুঝতে পেরেছেন। তখন এশিয়া মহাদেশে একমাত্র জাপান ছাড়া অন্য কোন দেশে স্বাধীনতার পতাকা উড়তো না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,”জাপানীদের মধ্যে একটা প্রবাদ আছে যে, ওরা মিশ্র জাতি। ওরা একেবারে খাস মঙ্গোলীয় নয়। এমন কি, ওদের বিশ্বাস ওদের সাথে আর্য-রক্তেরও মিশ্রণ ঘটেছে!”
সুদীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বৎসর জাপানে থেকে তাঁর সে কথার প্রমাণ পেয়েছি। সত্যই তাদের সাথে আর্যরক্তের মিশ্রণ রয়েছে। খাঁটী মংগোলিয়ান তারা নয়। খাঁটী মঙ্গোলীয়ান পুরুষের দেহে অর্থাৎ বুক ও মুখে খুব কমই কেশ বা লোম থাকে। মুখে দাঁড়ি কম গজায়। আমি দেখেছি যে ৫০% জাপানীদের দেহে লোম-দাঁড়ি আর্য এবং ভারতীয়দের মতোই আছে। এ হল তাদের বাহ্যিক দিক। বর্তমান জমানায় ডি এন এ টেষ্ট করে সেকথার যথার্থতা প্রমাণ করা যাবে।
তবে অনেক শিক্ষিত কিছু জাপানি রয়েছে তারা নিজেদের single ethnic group বলতেও ভালবাসে। অনেকে বলে তারা মঙ্গোলিয়া থেকে এসেছে! রহস্যে ঘেরা দ্বীপের দেশ এই জাপান। অধিক ভূমিকম্প জাপানেই হয়। অথচ জাপানীরা কী ভূমিকম্প কী সুনামি কোনটাকেই পরোয়া করে নি। প্রগতি ও দুর্যোগ একই সাথে চলমান রয়েছে এ দেশটিতে। তৎসত্তেও তাদের প্রগতির দ্রুতি কমে নি। কিন্তু কেমনে? একথার সাধারণ উত্তর রয়েছে যা পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। তা হলো দেশপ্রেম।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ জাপানের জনগণের মাঝে অতিশয় দেশপ্রেমের স্তম্ভ কতো উঁচুতে তা লক্ষ করেছি। তারা দেশ এবং দেশের জনগণের সার্থে আত্মদান করতে দ্বিধাবোধ করে না। আর শিক্ষানুরাগী জাপানীরা আদিকাল থেকেই ভিন্ন দেশ থেকে নতুন কিছু শিখে দেশে ফিরে তারা তা নিজের দেশে প্রয়োগ করতে পেরেছে। হাজার বৎসর পূর্বে জাপান সরকার ছাত্রবৃত্তি দিয়ে মেধাবী ছাত্রদের চীনে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাতো। তখন বিশ্বে চীন ছিল শিক্ষা-দীক্ষায় সুউন্নত দেশ। সে জন্যই সম্ভবত হয়রত মোহাম্মদ(সাঃ) হাদিসে প্রত্যেক মুসলিম নরনারীকে প্রয়োজনে চীনে গিয়ে হলেও জ্ঞানার্জন করার কথা জোর দিয়ে বলেছেন।পৃথিবীতে জাপানীরা যা করে দেখিয়েছে অন্য জাতিরা তা করে দেখাতে পারে নি। জাপান যখন বুঝতে পারল যে পশ্চিমা দেশগুলির প্রগতির কথা – তখন তারা পশ্চিম মুখি হল। কিন্তু জাপানী বিজ্ঞ রাজনীতিবিদেরা যখন বুঝতে পারল যে তারা আগ্রাসী জাতি এবং ধর্ম প্রচারের নামে বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলিকে পরাভূত করে উপনিবেশ করে নিচ্ছে। তখন তাদের চিন্তাধারাতে আমূল পরিবর্তন আসে। জাপান সরকার দু’শত বৎসর দেশটিকে বহির্বিশ্ব থেকে ( ১৬৩০ সাল থেকে ১৮৬৬ সাল ) পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে রাখে। জাপানের ইতিহাসে সে আমলকে ‘এদো জমানা বলে’। আশ্চর্যের কথা যে সে আমলে জাপানের সুখ ও সমৃদ্ধি ছিল। যুদ্ধবিগ্রহও ছিল না। সুদীর্ঘ ২৫০ বছর যাবত জাপান সুখ ও সমৃদ্ধিতে ছিল।
জাপান সরকার তখন কেন এই বিচ্ছিন্নতা ঘটিয়েছিল? যে কারণে বিশ্বের স্বাধীন দেশগুলি পশ্চিমা বেনিয়া শক্তির হাতে পরাভূত হচ্ছিল। জাপান তখন আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে বুঝতে পারল যে দেশটির স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হলে পশ্চিমাদের জাপানের মাটিতে পা রাখতে না দেওয়াই উত্তম হবে। এই দু’শত বৎসরের বিচ্ছিন্নতা চলাকালে কোন বিদেশিকে তারা জাপানে প্রবেশ করতে দেয়নি। কোন জাপানীকেও তখন বিদেশে যেতে দিতো না। জাপান সরকারের অগোচরে কোন জাপানি যদি বিদেশে যেতো এবং পরে দেশে ফিরতো তখন তাকে হত্যা করার হুকুম ছিল। সম্ভবত এ কারণেই জাপান তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিল। এই সময়ে জাপান সরকার জাপানের প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন আনে এবং ভবিষ্যতে জাপান কোন পন্থা আবলম্বন করবে সে নীতি নির্ধারণ করে নিল।
জাপানীদের মন মানষিকতাও রবীন্দ্রনাথ তাঁর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন এবং বুঝেছেন। তাঁর কথায়, “জাপানীদের দেখলে মনে হয়, তারা এক ধাতুতে গড়া নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ জাতিই মিথ্যা বলে আপনার রক্তের অবিমিশ্রতা নিয়ে গর্ব করে; জাপানীদের মনে এই অভিমান কিছু মাত্র নেই। চিত্রকলা প্রভৃতি সম্বন্ধে ভারতবর্ষের কাছে তারা যে ঋণী সে কথা আমরা একেবারেই ভুলে গেছি, কিন্তু জাপানীরা এই ঋণ স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হয় না। বস্তুত, ঋণ তারাই গোপন করতে চেষ্টা করে, ঋণ যাদের হাতে ঋণই রয়ে গেছে, ধন হয়ে উঠেনি। ভারতের কাছ থেকে জাপান যদি কিছু নিয়ে থাকে সেটা সম্পূর্ণ তার আপন সম্পত্তি হয়েছে। যে জাতীর মনের মধ্যে চলন-ধর্ম প্রবল সেই জাতীই পরের সম্পদকে নিজের সম্পদ করে নিতে পারে। যার মন স্থাবর, বাইরের জিনিস তার পক্ষে বিষম ভারী হয়ে উঠে; কারণ, তার অচল অস্তিত্বই তার পক্ষে প্রকান্ড একটা বোঝা। কেবলমাত্র জাতীসংকরতা নয়, স্থান সংকীর্ণতা জাপানের পক্ষে একটা মস্ত সুবিধা হয়েছে। ছোট জায়গাটি সমস্ত জাতির মিলনের পক্ষে পুটপাটের কাজ করেছে। বিচিত্র উপকরণ ভাল মতো গলে মিশে বেশ নিবিড় হয়ে উঠেছে। চীন বা ভারতবর্ষের মতো বিস্তির্ণ জায়গায় বৈচিত্র কেবল বিভক্ত হয়ে উঠার চেষ্টা করে, সংহত হতে চায় না। প্রাচীনকালে গ্রীস রোম এবং আধুনিক কালে ইংল্যান্ড সংকীর্ণ স্থানের মধ্যে সন্মিলিত হয়ে বিস্তীর্ণ স্থানকে অধিকার করতে পেরেছে। আজকের দিনে এশিয়ার মধ্যে জাপানের সেই সুবিধা। একদিকে তার মানস প্রকৃতির মধ্যে চিরকালই চলন ধর্ম আছে, যে জন্য চীন কোরিয়া প্রভৃতি প্রতিবেশির কাছ থেকে জাপান তার সভ্যতার সমস্ত উপকরণ অনায়াসে আত্মসাৎ করতে পেরেছে; অন্যদিকে দিকে অল্পপরিসর জায়গায় সমস্ত জাতি অতি সহজেই এক ভাবে জড়িত হয়ে এক প্রাণে অনুপ্রাণিত হতে পেরেছে!”
জাপানীদের মধ্যে এমন কিছু জিনিষ লক্ষ করেছি তা হয়তো বাংলাদেশের লোকজনের কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে। তা হল জাপানীদের সরলতা ও আত্মবিশ্বাস। যে জাতী আত্মবিশ্বাসি সে জাতি অতিশীঘ্র উন্নতির শিখরে আরোহণ করে। সব জাতীর মধ্যেই কিছু না কিছু ব্যতিক্রম থাকে। আমার আগের লেখায় উল্লেখ করেছিলাম যে পৃথিবীতে শুধু জাপানীরাই দুটি ধর্ম গ্রহণ করেছে, সিন্তো এবং বৌদ্ধ ধর্ম। কিন্তু জাপানীরা তাদের আদি শিন্তো ধর্ম প্রথা মতই অধিকাংশ অনুষ্ঠানাদি করে। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে দুটি ধর্মে বিশ্বাসী হল কেমনে এবং কি কারণে? একথার ব্যখ্যা দিতে আমার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যতোটুকু উপলদ্ধি করেছি – তা হল জাপানীরা প্রথমে ধর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় তথা জাতিগত সমস্যার উত্তরণ করা যায় কি না তা বুঝার চেষ্টা করেছে। এক সময় তারা খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণ করবে কি না সে কথাও ভেবেছিল। কিন্তু পরে তা থেকে বিরত রয়েছে।

তাদের অধিকাংশ বিবাহ অনুষ্ঠানের সম্পাদন হয় গীর্জাতে। তারপর শিন্তো মন্দিরে। বৌদ্ধ মন্দিরে বিবাহ অনুষ্ঠান হয়না বললে ভুল হবে না; তবে ০% নয়। বৌদ্ধ মন্দিরে মৃত্যুর পর শেষকৃত্যের কাজটুকু করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মমতে জীবহত্যা মহাপাপ। তাই তারা গরু, ভেড়া, ছাগল এবং মুরগিও হত্যা করে খায় না। যারা হত্যাকরে তারা ব্যবসায়ী। তারা সম্ভবত হত্যা করার সময় শিন্তো প্রথার কথা ভাবে। নতুবা কিছুই ধর্মমতে করে না। কিন্তু জাপানীরা খায়না এমন জীব জানুয়ার কমই আছে। তা তারা মার্কেট থেকে কিনে খায়।
গতসাপ্তাহে এক জাপানী কৃষকের বাড়িতে গিয়ে দেখলাম যে সে কৃষক দুটি বড় সাদা ছাগল পালে। জিজ্ঞাসা করলাম, ছাগল কি জবাই করে খাবেন?
জবাবে বলল, ‘এগুলি আমার পুষা ছাগল, বিক্রয় কিংবা খাবার জন্য নয়। আমরা জবাই করি না!
তাহলে কি জন্য পুষতেছেন?

বলল, ‘বাড়ির আশেপাশে অনেক ঘাস হয়। সেগুলি খেয়ে কমাবার জন্য পুষতেছি!’
জাপানীরা গরু, ভেড়া, ঘোড়া, শূকর ও তিমি মাছের মাংসও খায়। কিন্তু ছাগলের মাংশ খায় না। তাদের মতে ছাগল অত্যান্ত নিরিহ, নিরব ও শান্ত প্রাণী – দেখতেও সুন্দর তাই তাদের প্রতি তাদের অধিক মায়া।




