জাপানীরা কেমন : পর্ব – ২৯
“মিঃ কিমুরা বললেন, “মিঃ কাতো, কিছু যাচাই না করে কথা বলা ঠিক নয়। নিজের ভ্রান্ত ধারণাকে যত্রতত্র বলে চালাতে পারবেন না, বোকা বনে যাবেন। আপনি একজন ভীতু মানুষ!”
একথা শুনে মিঃ কাতো লজ্জা পেলেন। কিমুরা অনেক বছর যাবত ইন্দোনেশিয়াতে জাপান সরকারের প্রজেক্টগুলিতে কাজ করেন। বছরে তিন মাসের জন্য জাপানে তার পরিবারের নিকট ফিরে আসেন। তার দুটি কন্যা সন্তান আছে। তারা হাই স্কুলের ছাত্রি। আমার শহর থেকে পনের কিলোমিটার দক্ষিণে একটি শহরে তার বাড়ি। ইন্দোনেশিয়ার ভাষার উপর তার ব্যাপক দখল রয়েছে। তিনি তার পি এইচ ডি থিসিসটি সম্পূর্ণ ইন্দোনেশিয়ান ভাষাতে লিখেছেন। মিঃ কিমুরার জ্ঞান ও ধ্যানধারণা অনেক উচু স্তরে প্রসারিত। কাতোর মতো সীমাবদ্ধ নয়।
সেদিন রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা চলেছিল। কাতো তার নিজের ধারণার পক্ষে কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু মিঃ কিমুরা তার অনুরোধ প্রত্যাক্ষাণ করলেন। কিমুরা ও কাতোর পরিচয় সেদিন প্রথম আমার বাসাতেই হয়েছে। সেদিন কিমুরা তার নামের কার্ড কতোকে দিয়ে পরিবার সহ তার বাসাতে চলে গেলেন।
মিঃ কাতো যখন আসেন এবং সেদিন আমার সাথে যদি তার দেখা হয়, তখন তার মনের অজান্তে কিছু কথা বলে ফেলেন। তার একটি বাতিক আছে, যখন সে কথা বলতে থাকবে – অনবরত বলতে থাকবে। একদিন কথায় কথায় বললেন যে ভূমিকম্প থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ ফুট সাইজের দু’টি কন্টেনার কিনেছেন। সেগুলি তার বাড়ির ঘরটির পাশে ভালোমতো পাকা ভিটির উপর কারিগর এনে স্থাপন করেছেন। একটিতে সে ঘুমাবে আর অন্যটিতে তার ষ্টাডি রুম করবেন। এখন তিনি হীট রেজিষ্টেন্ট তাপরোধী কার্পেট কিনে কন্টেনারের ফ্লোরে ওয়াল টু ওয়াল সেট করবেন। আমাদের শহরের একটি কোম্পানী বাংলাদেশ থেকে আদমজি জুট মিলের কিছু পাটের কার্পেট আমদানি করেছিল। পাটের কার্পেট যে তাপরোধী কার্পেট তা সে জানে। গরমে লোহা কিংবা এলোমিনিয়ামের কন্টেনারের ভিতরে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উপরে উঠে। আর কন্টেনারের ইন্টেরিয়ার ওয়ালে যদি প্লাইউঠ লাগিয়ে ওয়াল পেপার লাগানো না হয় – তখন কারো সাধ্য নেই যে ভিতরে থাকবে। কারিগর ডেকে ওয়াল কেটে জানালা করা যায়। কিন্তু তাতে তাপের তেমন ব্যতিক্রম হয় না। এয়ার কন্ডিশন সিস্টেম করলে অবশ্য থাকা যাবে। গ্রীষ্মকালে জাপানের তাপমাত্রা চল্লিশ ডিগ্রীর উপরে উঠে। আবার শীতকালে উত্তরাঞ্চলে মাইনাস পঁচিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা থাকে।

মিঃ কাতোর মাথায় এই পরিকল্পনা অনেকদিন আগে থেকেই ছিল মনে হয়। কিন্তু এতোদিন প্রকাশ করেনি। এখন সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। কাতো ভূমিকম্পে মরতে চান না বলেই এই ব্যবস্থা করছেন। তার বাবা ও মা যে ঘরে থাকেন সেটি পুরানো কাঠের ঘর হলেও মজবুত। কিন্তু বড় ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়লে চাপা পড়ে মৃত্য হবার সম্ভাবনাও আছে। এমন এক ধারণা তার মনে অনেক আগে থেকেই আছে। আবার ঘরে থাকার চেয়ে গাড়িতে ঘুমালে আরো নিরাপদ। তাই লেপতোশক গাড়িতে রেখেছেন। দূরে কোথাও আড্ডা দিতে গিয়ে অধিক রাত হয়ে গেলে গাড়িতে রাত কাটিয়ে দেন। অনেক বছর পরে বুঝতে পারলাম যে কাতো বন্ধু খুঁজে নিয়ে বন্ধুর বাসাতে আড্ডা দিতে যান। কিন্তু নিজের বাড়িতে কাউকে যেতে বলেন না। আর তার বন্ধুদের সবাই প্রবাসী। জাপানী বন্ধুর সাথে খুব একটা উঠাবসা করেন না। সেদিন মিঃ কিমুরার সাথে কাতোর আমার বাসাতেই পরিচয় হয়েছিল। একদিন কিমুরার স্ত্রী এসে আমার স্ত্রীকে বললেন যে মিঃ কাতো মাঝেমাঝে তাদের বাসাতে আড্ডা দিতে যান!
মিসেস কিমুরার স্ত্রীর নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন এক অধ্যাপকের সাথে গোপন প্রেম আছে। সে কথা আমার স্ত্রীকে বলেছিলেন। একথা শুনে মিসেস কিমুরাকে আমার স্ত্রী তিরস্কার করেছিল। তা ঐ পর্যন্তই। আমি সেকথা জানতাম। জাপানে পরকীয়া কোন ব্যাপার নয়। মিসেস ছাছাকির স্বামি একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক। জাপানে সবাই তাঁকে চিনে। অথচ ছাছাকি তার স্বামির সাথে না থেকে বছরের পর বছর নারিতার একটি অভিজাত হোটেলে থাকেন। আর, তার স্বামিটি ভিন্ন একটি হোটেলে চল্লিশ কিলোমিটার দূরত্বের অন্য একটি হোটেলে থাকেন। এক কথায় মিসেস ছাছাকি একজন মধুকরী। প্রচুর টাকার মালিক এমন একটি পরিবার। তাই বাড়ি থাকা সত্বেও বাড়িতে না থেকে হোটেলে দিন যাপন করছেন বছরের পর বছর।
মিসেস কিমুরা মাসে একবার আড্ডা দিতে আসেন। যখন তার স্বামি ইন্দোনেশিয়া চলে যান তখন। এই পরিবারটি একবার আমাদেরকেও তার বাসাতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। সেদিন সে এসে আড্ডা দিয়ে বাসাতে ফিরে যাবার সময় আমি তাকে রেল ষ্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিয়েছি।যখন ড্রাইব করে যাচ্ছিলাম – তখন হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “আচ্ছা, বলুন তো মিঃ কাতোর ‘চিঞ্চিন’ (পুরুষাঙ্গ) আছে কি নাই ?”
মহিলার এমনোতর প্রশ্ন শুনে বড় বিস্মিত হলাম। তার পূর্ব ইতিহাস তো আমার জানা আছে। আমিও যথাযথ উত্তর দিলাম, বললাম, ‘সে তো আপনাদের বাসাতে যায় বলেছিলেন, আপনি তো নিজেই জিজ্ঞাসা করতে পারতেন!’
বললেন, ‘ ছিঃ ছিঃ, এমন কথা জিজ্ঞাসা করা কি সম্ভব?’
বললাম, ‘আমাকে যখন তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে পারলেন, তাকেও করতে পারতেন, নয় কি?’ একথা বলে হাসলাম।
আমার হাসি দেখে মহিলা লজ্জা পেয়েছেন মনে হল। বয়স তার চল্লিশ হলেও সুন্দরীদের পর্যায়ে তাকে ফেলা যায় না। খাটো এবং বর্ণও তেমন উজ্জ্বল নয়। কিন্তু তার কথাগুলি শুনতে বেশ ভালই লাগে। তাই তার সঙ্কুচ কাটাবার জন্য বললাম, ‘ আগামিতে সে যখন যাবে তখন সরাসরি জিজ্ঞাসা করবেন!’
মহিলা হেসে ফেললেন, বললেন, ‘আমার স্বামি ইন্দোনেশিয়া চলে যাবার পর সে আর আসে না!’
একথা শুনে অবাক হলাম। মিঃ কিমুরার ওখানে মিঃ কাতো যেত শুধু ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে জানার জন্য। এখন তার উপর আমার পুরানো ধারণা আরো পরীষ্কার হল!
কারণ, কাতো ইন্দোনেশিয়ার উপর অভিজ্ঞ নয়।তাই দেশটির উপর ধারণা নিতে যেত। তখন হয়তো মহিলা ভেবেছিলেন যে কাতো আবার যাবে।তার সাথে বন্ধুত্ব করবে এবং আড্ডা দিতে যাবে। তার মেয়ে দুটি স্কুলে চলে গেলে মিসেস কিমুরা বাসাতে থাকেন না। মাঝেমাঝে রেল ষ্টেশনের কাছের রেষ্টুরেন্টে গিয়ে কফি ও লাঞ্চ খান। অথবা টোকিও গিয়ে ঘুরাঘুরি করেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে কাতো তার বাসাতে যাওয়া বন্ধ করবেন না। তাই আজ আমাকে তিনি এই প্রশ্নটি করলেন। বললাম, ফোন করেন নি কেন?
মহিলা কিছুক্ষণ নীরব। তারপর বললেন, ‘একদিন করেছিলাম। কিন্তু আসে নি!’ সেদিন আমি শতভাগ সিউর হলাম যে মিঃ কাতো আসলেই মহিলাদের সাথে কোন সম্পর্ক স্থাপন করতে চান না। কোথায় যেনো অস্বাভাবিক কিছু তার মাঝে রয়েছে যা সে প্রকাশ করছে না। সেই মুহূর্তে তার প্রতিবন্ধী বোনটির কথা মনে পড়ল। মিঃ কাতো কথা দিয়েও এক বছর হয়ে গেল অথচ আমাকে তার বোনের হাসপাতালে নিয়ে যায় নি। কাতো তার ভাই বোনদের আড়ালে রাখতে চায়। কয়েক বছর পরে তার প্রতি এমন একটি ধারণা হল।
আমার শহরে ছিল কাতোর অফিস। চার বছর পর তার অন্যত্র পোষ্টিং হয়। কিন্তু তৎসত্তেও যতো দূরই হোক না কেন – সময় পেলে ছুটির দিন ড্রাইভ করে এসেছে। সন্ধ্যার পর অনেক রাত পর্যন্ত গপ্পগোজব করে অধিক রাত্রে বাসাতে ফিরে গিয়েছে। তাই তার সাথে আমাদের সম্পর্ক বিগত তিন দশক যাবত বজায় রয়েছে। যেখানে বিদেশি শ্রমিক এসে কাজ করে সেখানে তার যাতায়াত রয়েছে। তাদের কাছে গিয়ে আড্ডা দিয়ে তাদের চালচলন সংস্কৃতির উপর ধারণা নেয়ার জন্যই যায়। সম্প্রতি ব্রাজিলের শ্রমিক জাপানে অনেক এসেছে। তাদের সাথে গিয়েও আড্ডা দেয়। কাতোর বাহ্যিক জীবনযাত্রা আমরা জানি। কিন্তু তার পরিবার পরিজনদের সাথে সে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। তবে একদিন এক নববর্ষের পার্টিতে সে তার বাবাকে এনেছিলেন। সেদিন পার্টিতে গল্পগুজব ছাড়াও যারযার জীবনের অভিজ্ঞতার উপর বক্তব্য রাখলেন। সে পার্টিতে আমরা বার জন ছিলাম। কাতো মাঝেমাঝে বলতো যে তার বাবা একজন ফিলোসোফার এবং তার বাবা মাঝেমাঝে এমন জটিল কিছু কথা বলেন যার অর্থ কাতো নিজেও বুঝে না!যে সময়ে পার্টিতে এসে কাতোর বাবা বক্তব্য রাখলেন। তখন তাঁর বয়স সত্তর বৎসর। দশ মিনিট কথা বললেন তিনি। আমার পাশে মিঃ কিমুরা বসেছিলেন। তিনি বললেন, “তাঁর কথার কিছুই তো বুঝলাম না!” সেদিনও কিমুরার কথা শুনেও আবার কাতোর প্রতিবন্ধী বোনটির কথা স্মরণে এল। এই প্রশ্ন মনে আমার বারবার জেগেছে এবং সন্দেহ আরো বেড়েছে।
আমাদের আরেক জন বন্ধু আছে। তার নাম মিঃ ইছোয়ে। সম্প্রতি মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশকরে ডাক্তার হয়েছেন। তাকে এখন আমরা ডাঃ ইছোয়ে বলে ডাকি। মিঃ কাতোর সাথে ডাঃ ইছোয়েকে আমি পরিচয় করিয়ে দিয়েছি। ইছোয়ের মাঝে ব্যতিক্রম এই যে সে আমাকে বারবার বলেছে যে কখনো জাপানী মেয়ে বিয়ে করবে না। আরেকটি ব্যতিক্রম হল তার কিছু টাকা হলে স্পেন চলে যাবেন এবং স্প্যানিশ মেয়ে বিয়ে করবেন। সে জন্যে স্প্যানিশ ভাষা ভালোমতো শিখে ফেলেছেন তিনি। জাপানে একজন ডাক্তার প্রচুর রোজগার করেন। কিন্তু ডাঃ ইছোয়ে জাপানে থাকবেন না। যে মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করেছেন – সেটাতে ডাক্তার হয়ে জয়েন করে তিন বৎসর কাজ করেছেন। মিঃ কাতো একদিন বললেন যে একটি ফ্যাকটরিতে নাকি সাত জন ব্রাজিলের কর্মচারি কাজ করে। সেখানে গিয়ে সে আড্ডা দেয়। এই সাতজন কর্মচারির মধ্যে তিনজন সুন্দরী মহিলা আছেন। তাদের মধ্যে ছত্রিশ বৎসর বয়সের বিধবা একজন মহিলা আছেন এবং সে মহিলাটি সবার চেয়ে সুন্দরী। ডাঃ ইছোয়ে একথা শুনে আগ্রহ প্রকাশ করার পর কাতো তাকে সেই মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ডাঃ ইছোয়ের পছন্দ হল সে মহিলাকে। পরে তাকে বিয়ে করে ডাঃ ইছোয়ে ব্রাজিল চলে গেলেন।

পৃথিবীতে কতো যে বিচিত্র চরিত্রের মানুষ আছে। কারো সাথে কারো মিল নেই। যৌবন কালে অনেকেই জানেনা যে জটিল এই সময়ের সন্ধিক্ষণে কেমনে এবং কী করলে ও কোন পথ অনুসরণ করে হাঁটলে জীবনের উদ্দেশ্য সাধন হবে। সুখদুঃখ সবার জীবনে আছে। কেউ সুখি হতে চাইলে আকস্মিক ভাবে মনের অজান্তে সুখ এসে ধরা দেয়। আবার ভ্রান্তপথে গেলে আকস্মিক ভাবেই বজ্রপাতের মতো দুঃখ এসে জীবনের স্বপ্নগুলি বরবাদ করে দেয়। ডাঃ ইছোয়ে তার পেশা ছেড়ে দিয়ে ব্রাজিল গিয়ে ভাল কি খারাপ করেছেন তখন আমরা ভাবতে পারিনি। কিন্তু আমি কেনো জানি তাকে সমর্থন দিতে পারলাম না। তার মা বাবার কথা ভেবে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
ডাঃ ইছোয়ে জবাবে বললেন, ‘তাঁরা বলেছেন, ‘সে পথে গিয়ে যদি তুমি সুখি হবে মনে কর – যেতে পার!’
তাই ডাক্তার ইছোয়ে তার ইচ্ছার পথেই গেলেন। তিনি তার ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিলেন। মিঃ কাতো তার ইচ্ছা মতোই চলছেন। সে জন্য তার মা বাবা তাকে কিছু বলেন না। একদিন ব্রাজিলের শ্রমিকদের আড্ডায় যাবার সময়ে কাতো বেশ বড় ধরনের রোড এক্সিডেন্ট করল। দুটি গাড়ির সাথে হেড-অন কলিশন যাকে বলে। ভাগ্যক্রমে সে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে। কাতোর ভুল ছিল। আদালত তাকে এক মিলিয়ন ইয়েন ( সাতলক্ষ টাকা ) জরিমানা করেছে। তার ইন্স্যুরেন্স ছিল তাই অনেকটা রক্ষা হয়েছে। কাতোর সাথে পরিচয় হওয়ার পর বেশ কয়েকবার সে রোড এক্সিডেন্ট করেছে। আমি তাকে একদিন বললাম, ‘আমিতো একজন বিদেশি। প্রবাসে আমিও গাড়ি চালাই। কিন্তু আজ পর্যন্ত এক্সিডেন্ট করিনি। আপনি এতো এক্সিডেন্ট করেন কেন? কাতো বলল, “জানি না। মাঝে মাঝে ড্রাইভ করার সময় নিদ্রা আসে!”
বললাম, ‘নিদ্রা ভাব নিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করেছেন। তা যে বড় বিপদজনক তা জানেন। আপনি তো আড্ডাতে গেলে সকাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে কথা বলতে পারেন। ঘুমাবার সময় কোথায় আপনার?’
কাতো বলল, ‘কিছুটা নিদ্রা ভাব ছিল!’ আমার জানামতে কাতো গড়ে বছরে দুটি ছোটবড় রোড এক্সিডেন্ট করেন। সৌভাগ্যের কথা যে তার হাত পা ভাংগেনি! আরেকবার এক বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালে ধাক্কা মেরে এক্সিডেন্ট করলেন। সেটাও মনে হয় নিদ্রা ভাব থাকায় হয়েছে। একদিন আমরা সে রোড দিয়ে যাচ্ছিলাম। তাকে অনুরোধ করেছিলাম যে বাড়ির ওয়াল তার গাড়ির ধাক্কায় ভেঙ্গেছে সে বাড়িটি দেখাতে। ‘আচ্ছা’ বলেও সে পথে সেদিন আসা যাওয়া করলাম। কিন্তু বাড়িটি সে আমাকে দেখালো না! বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘সে বাড়িটি দেখালে কি কোন ক্ষতি হতো আপনার?’ কাতো চুপ করে রইল। কোন উত্তর দিল না। কেনো দিলনা তার এই মানে হতে পারে যে – সে ঐ বাড়িটির দিকে তাকাতেই হয়তো ভয় পায়। এমন একটা মানসিক দুর্বলতা বা অন্যকোন জটিলতা তার মনে ক্রিয়া করে। সে হয়তো ভাবে সেই এক্সিডেন্ট এর স্থান দেখালে তার ভুলগুলি আমি ধরে ফেলবো। সম্ভবত এমনতরো কোন জটিলতা তার মনে রয়েছে। সেটা তার একটি মানসিক রোগও হতে পারে।রেগে গিয়ে সেদিন আমি অনেককিছু বলেছিলাম। কিন্তু কাতো রাগ করেনি! তার ভাল একটি গুণ হল সে ঝগড়া করা পছন্দ করে না। রাজনীতি, বিজ্ঞান, ধর্মের উপর তার বেশ জ্ঞান আছে। এক কথায় সাধারণ জ্ঞান অনেক ভাল। এতোকিছু থাকা সত্ত্বেও কেন সে নিজের ও তার পরিবারের ব্যাপারে কিছু বলতে সংকুচ বোধ করছে এবং সেজন্য আমরা এটাকে তার বড় রকমের জটিলতা মনে করেছি। সম্ভবত একথাটি তার অজানা ছিল। এখানেই বড় ব্যতিক্রম ছিল তার চালচলনে। কিন্তু তিন দশক এক সাথে চলেও আমি তাকে শতভাগ খাঁটি বন্ধু হিসাবে নিতে পারি নি। খাঁটি বন্ধুত্ব তখনই প্রমাণীত হয় যখন পরস্পরের দুঃখকষ্টে ছায়ার মতো কাছে থাকে। সত্যিকারের বন্ধুত্ব হল সেটাই – যখন একজন অন্যজনকে অন্তরে স্থাপন করে নেয়। বন্ধুত্বের প্রমাণ হয় প্রতিজ্ঞায় এবং সংকটমূহূর্তে – তখন দূরত্ব এবং সময় কোন ব্যাপার নয়।
গত দু’বৎসর যাবত মিঃ কাতোর খবর নেই। মেইল করেছি উত্তর পাইনি। ফোন করেছি রিসিভ করে নি। কারণ কি জানতেও পারি নি। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছে সে তার কন্টেনারের ভিতর। এখন তার ভূমিকম্পে মরণের কোন ভয় নেই! মিঃ কাতোর জন্ম সম্বদ্ধীয় জটিলতাই হয়তো ছিল চরম সত্য। যা সে সর্বত্র গোপন রাখার চেষ্টা করে নিজের পরিবারকে আড়ালে রাখতো। মাঝেমধ্যে একথার ছিটেফোঁটা অগুচরে বলেছে। কিন্তু পরীষ্কার ভাবে বলেনি। সে মনে করতো যে তার প্রতিবন্ধী বোনের নিকট আমাকে নিয়ে গেলে তার বংশানুক্রমিক ( genetically ) বৈশিষ্ট আমার নিকট উদ্ভাসিত হয়ে যাবে। এই বিষয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেছি – তা সে জানে। তার বোনটি জন্মগত অস্বাভাবিক। সাইকেল এক্সিটেন্টের কথাটি সত্য নয়। কাতোর পাঁচটি ভাই বোনের মধ্যে শুধু একটি ভাই বিয়েকরে সংসার গড়েছে। বাকী কেউ বিয়ে করেনি। এমন ক্ষেত্রে জাপানে ডাক্তার তাদের সাবধান করে দেয়। বলে দেয় যে এমন কিছু থাকলে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিলে এবনরম্যাল সন্তান হতে পারে। এই কমপ্লেক্স এর জন্য কাতো বিয়ে করে সংসার গড়েনি। সে অবশ্যই জানতো যে তার শরীরের রক্তে অস্বাভাবিক জিন রয়েছে।
যা নাকি বড় অস্বাভাবিক লেগেছে তা হলো – চাকুরী থেকে রিটায়ার্ড হওয়ার পর শুধু আমাদের সাথে নয়, যাদের সাথে এতোদিন তার সম্পর্ক ছিল – তাদের কাছ থেকেও সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আমার ধারণা যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে মিঃ কাতো সম্ভবত এখন একগাদা বই নিয়ে তার কন্টেনারে জীবন যাপন করছে।




