জাপানীরা কেমন : পর্ব-২৮
তিন দশক আগের কথা। স্মৃতির পিঞ্জরে স্তরে স্তরে জমে আছে জাপান প্রবাস জীবনের অনেক স্মৃতিকথা। তিন দশক অতিক্রান্ত হয়েছে আমার প্রবাস জীবন। সুখ-দুঃখের জীবন প্রবাহে একে একে চলে গেছে প্রতিটি দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, দশকের পর দশক। সুখের কিংবা দুঃখের দিন হলেও যে বিশেষ দিনটি জীবনের পাতা থেকে চলে গেল সে দিনটিকে কিছুতেই ফিরে পাওয়া যাবে না। সকল অতীত স্মৃতি রুমন্থন করা যায় এবং সুখের স্মৃতিগুলিকে ভাবা যায় এবং ভাবতে ভাল লাগে। দুঃখের স্মৃতিগুলি যে চোখের পর্দায় ভেসে উঠে না তা নয়। কিন্তু অনেকেই দুঃখের স্মৃতিগুলি ভুলে থাকতে চায়। ব্যতিক্রম হল আমি আমার সুখ ও দুঃখ কোনটাই ভুলতে পারি নি।ভুলতে পারি না।
১৯৮০ সালের এপ্রিলে প্রথম জাপান পদার্পণ করে একটি মফঃস্বল শহরের সুন্দর আবাসিক এলাকার বাসাতে উঠলাম। জাপানের শিন্তোসি নামে একটি কোম্পানি প্রায় বিশেক উঁচু পাহাড়ের চূড়া কয়েক ডজন বুল্ডজার ও এস্কেভেটর দিয়ে কেটে খাঁদখোদ ভরাট করে সাত বৎসর পূর্বে তৈরি করেছে এই নান্দনিক আবাসিক এলাকাটি। এখানে এক সময় ছিল পাহাড় জঙ্গল এখন এখানে হাজার খানেক অত্যাধুনিক দুতলা বাড়ি তৈরি করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে। জাপানের ঘন বসতির এলাকা হল টোকিও। সেখানের লোকবহুল এলাকাতে থেকে নিরিবিলি থাকতে অনেক ধনী পরিবার বাড়ি কিনে এখানে এসেছে। এখান থেকে টোকিও যাওয়া আসা করতে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ঘন্টা লেগে যায়। গাড়ি বা রেলওয়ে সিস্টেম অত্যাধুনিক হলেই যে যাতায়াতের সুবিধা হয় তা এই শহরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

জাপানের প্রাকৃতিক দৃশ্য নান্দনিক। অপূর্ব সুন্দর। পাহাড় পর্বতে, বৃক্ষ-লতায়, ফুলে ফলে পরিপূর্ণ এই দেশটির বৈচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আরো মুগ্ধ হয়েছি সুন্দর এই আবাসিক এলাকাটির বাড়িগুলি দেখে। দু’তলা ঘর সবগুলি বাড়ি কাঠের তৈরী এবং ঘরের সামনে আছে সুন্দর একটি বাগান। প্রত্যেকটি বাগানে বিভিন্ন রকমের ফুল ফুটে রয়েছে। ঘরের সামনে প্রশন্ত সুন্দর রাস্তা। এখানে যারা বাড়ি কিনে এসেছে তাদের প্রায় সত্তর ভাগ টোকিওতে কর্মরত। তাদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাড়াও ছোট বড় ব্যবসায়ী আছেন। এই আবাসিক এলাকাটিতে কোন রেল ষ্টেশন নেই। তবে ছয় কিলোমিটার দূরের রেল ষ্টেশনে যাওয়ার জন্য নিয়মিত বাস চলাচল করে। অনেকে বাসে করে রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেনে টোকিও ও অন্যান্য শহরে কাজ করতে যায়। আবাসিক এলাকাটির বাড়িগুলির দাম অনেক বেশি। এক কথায় বলতে গেলে – যোগাযোগ ব্যবস্থা তেমন সুবিধার নয় অথচ প্রতিটি বাড়ির দাম ত্রিশ মিলিয়ন থেকে সাড়ে ত্রিশ মিলিয়ন ইয়েন! টাকাতে আড়াই কোটি থেকে তিন কোটি; তবে ৯০% বাড়ি কিস্তি লোনে বিক্রয় হয় এবং মেয়াদ পঁচিশ থেকে পয়ত্রিশ বৎসর পর্যন্ত। কিন্তু এমন এলাকাতে কেনো তারা উচ্চমূল্যের বাড়ি কিনে থাকে তা প্রথমে বুঝতে পারিনি।
জাপানিদের চরিত্র এক কেন্দ্রিক। তারা কর্মস্থলের কাছাকাছি বাড়ি ঘর করতে চায়না তাদের প্রাইভেসি রক্ষা করার জন্য। অন্য আরেকটি কারণ হল ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা জাপানীদের পছন্দ নয়। তাই দূরে বাড়ি কিনে নিরিবিলিতে থাকতে ভালবাসে! কর্মস্থলে যাওয়া আসা করতে অফিস টাইমে বাদুর ঝুলা হয়ে বাস ও ট্রেন ব্যবহার করে। সবার প্রাইভেট কার আছে। কিন্তু কার নিয়ে টোকিওতে গেলে অফিসে টাইম মতো পৌঁছা যায় না। ট্রাফিক জ্যামের জন্য দেরি হয়। তাই অনেকে তাদের গাড়ি নিকটস্থ রেল স্টেশনের সামনে পার্ক করার স্থান ভাড়া নিয়ে সেখানে গাড়ি রেখে ট্রেনে অফিসে যায়। শনি রবিবার তাদের অফিস ছুটি। এই ছুটির দিনে ভালমত ঘুমিয়ে তাদের শ্রমক্লান্তির ষ্ট্রেস কিছুটা কমিয়ে নেয়। পাশাপাশি একই এলাকাতে বছরের পর বছর থাকার পরও প্রতিবেশির সাথে তাদের তেমন সম্পর্ক গড়ে উঠে না। অথবা তেমন ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠুক তা তারা চায় না। এটাও জাপানিদের কারেকটারের অন্যতম একটি দিক। বিদেশিদের প্রতি তো আনফ্রেন্ডলি বটেই, স্বদেশিদের প্রতিও ঘনিষ্ট হওয়ার ইচ্ছা তাদের মাঝে লক্ষ করি নি। মিঃ ইশিদা ও মিঃ কজিমা ছাড়া তৃতীয় জাপানি কোন বন্ধু প্রথম কয়েক মাস আমার ছিল না।

আমার বাসাটির নিচ তলাতে একটি কাফে রেষ্টুরেন্ট আছে। তাতে দুটি বিবাহিতা ফিলিপিনো যুবতি পার্ট টাইম কাজ করে। একদিন সকালে দেখলাম স্যুট-টাই পরা একজন যুবক এসে রেষ্টুরেন্টের শাটার খুলতে তাদের সাহায্য করছে। তাকে দেখে বললাম,‘ আপনি তো কাষ্টমার, শাটার খুলার কাজে তাদের কেনো সাহায্য করছেন!’
মেয়ে দুটি বলল, ‘তিনি সাপ্তাহে তিন দিন আসেন এবং শাটার খোলার কাজে আমাদের নিষেধ থাকা সত্ত্বেও সাহায্য করেন!’
এবার যুবকটি কথা বলল, ‘ আমার নাম মিঃ কাতো। আমি নিজের ইচ্ছাতেই তাদের সাহায্য করি এবং আনন্দ পাই। তারপর কফি ও স্যান্ডউইচ খেয়ে কাজে যাই!’
এই কাফে রেষ্টুরেন্টে স্প্যাগিটি, স্যান্ডউইচ,জাপানি নুডল, চা আর কফি ছাড়া অন্য কোন আইটেম নেই।
কাতোর সাথে পরিচয় হওয়ার পর আমি তাকে ‘মিঃ কাতো’ বলে ডাকি। জাপানীরা তাদের নামের সাথে ‘সান’ কথাটি ব্যবহার করে। কিন্তু আমি তার নামের আগে মিস্টার ব্যবহার করি। প্রথমে ভেবেছিলাম যে সম্ভবত মেয়ে দুটির কোন একটির প্রতি তার দুর্বলতা আছে। কিন্তু পরে জেনেছি আমার সে ধারণা ঠিক নয়। সে আসে তাদের সাথে ইংলিশ কনভারসেশন প্র্যাক্টিস করতে এবং বিদেশিদের চালচলন ব্যবহার ও মন-মানসিকতা জানতে। ফিলিপিনো ছেলে কিংবা মেয়ে গ্রাম্য হোক বা শহুরে হোক হাইস্কুল পাশ না করেই ইংরেজি বলা শিখে নেয়। সদা বন্ধুবৎসল এবং হাস্যোজ্জ্বল ফিলিপিনো মেয়েরা সহজেই জাপানী পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বন্ধু হয়। এই রেষ্টুরেন্টের দুটি মেয়ের স্বামি জাপানী। তাদের একজনের বয়স পঁচিশ এবং অন্যজনের বয়স কুড়ি বৎসর।
মিঃ কাতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে এবং তাকে বেশ ভদ্র এবং মেধাবি মনে হল। কথায় কথায় বলল, “আমি ইংলিশ লেখার বেলায় তেমন ভুল করি না। কিন্তু স্পিকিং এবিলিটি এবং হিয়ারিং এ আমি দুর্বল। তাই তাদের সাথে কথা বলে এবিলিটি বাড়াবার চেষ্টা করছি!”
মেয়ে দুটি ডিশ ওয়াশিং করতে করতে কাতোর সাথে কথা বলে। দেখতে খাটো হলেও স্লিমদেহি যুবক কাতোর সারা মাথায় ঝাঁকড়া চূল। চেহারা অন্যান্য জাপানীদের মতো নয়। বাঙ্গালি ছেলেদের সাথে কিছুটা মিল রয়েছে। একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করে তার গার্লফ্রেন্ড আছে কি না জানতে চাইলাম। জবাব দিল, ‘সিনিয়ার হাইস্কুলে যখন পড়তাম একটি মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মেয়েটি আমাকে বঞ্চিত করেছে!’
বললাম, ইচ্ছা থাকলে তো অনেক গার্ল ফ্রেন্ড পেতে পারেন। জাপানে গার্ল ফ্রেন্ড ছাড়া কোন যুবক আছে কি?’
বললেন, ‘হ্যাঁ, অনেকের আছে। আবার নেই এমন ও আছে। তবে আমি আর গার্ল ফ্রেন্ড চাই না।’
‘বিয়ে করে সংসার-ধর্ম করবেন না!’
‘না, আমি চীরকুমার থাকব’! কাতো সরাসরি উত্তর দিল।
মিঃ কাতো এই কথা অনেকবার বলেছে। কিন্তু তা আমি বিশ্বাস করি নি। ভেবেছি সময়ে তার মনের পরিবর্তন হবে এবং পছন্দের মেয়ে পেলে বিয়ে করবে। সেই থেকে কাতোর সাথে প্রতি সাপ্তাহে আমার সাক্ষাত হয়। তাকে প্রশ্নকরে তার পিতামাতা ও ভাইবোনদের উপর ধারণা কিছুটা নিয়েছি। কাতোর বাবা এখন একজন রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক, মাতা একটি কনভিনিয়েন্স ষ্টোরে পার্ট টাইম কাজ করেন। কাতোর ভাইবোন পাঁচজন। তার ছোট ভাই বিয়ে করেছে। বাকি ভাইবোনদের আর কেউ বিয়ে করেনি। কাতোর গাড়িতে কতোবার যে তার শহরে গিয়েছি। তাকে অনুরোধ করেছিলাম তার বাড়িতে নিয়ে যেতে কিন্তু আমাকে সে নিয়ে যায় নি! এটা কি তার ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত তা প্রথমে বুঝতে পারিনি। তা বুঝেছি দীর্ঘ কুড়ি বৎসর পর। আমি এমন এক প্রকৃতির মানুষ কাউকে কোন ব্যাপারে অনুরোধ বার বার করতে পারি না। কিন্তু সেই কথাটি অন্তরে গেঁথে রাখি এবং তা বুঝতেও দেই না।তা মনে রেখে দিয়ে সে বন্ধুটির বন্ধুত্বের পরিমাণ কতোটুকু তা নির্ধারণ করি। যখন নির্ধারণ করতে সক্ষম হই তখন মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করে তাদের অন্তরের রহস্য উদঘাটন করতে আরো বেশি মনোযোগী হই। সত্য বলতে কি মানুষের চেয়ে রহস্যজনক ও জটিল কোন প্রাণী পৃথিবীতে নেই।

একদিন কথায় কথায় কাতো বলল যে তার একটি ছোট বোন আছে, সাইকেলে স্কুলে যাওয়ার পথে গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসা করানোর পর ভাল হয়েছে কিন্তু এখন সে মানসিক রোগে আক্রান্ত এবং একজন প্রতিবন্দী! কাতোর বোনটি একটি মানসিক হাসপাতালে থাকে। সেদিন তার মুখে এই কাহিনী শুনে মর্মাহত হলাম। কাতোকে কি বলে সান্তনা দিব ভাবতে লাগলাম।
বললাম,’আপনার বোনটিকে একদিন দেখাতে নিয়ে যাবেন কি? তাকে কিছু কেক এবং কার্টুন বই কিনে দিতে চাই!’
কাতো বলল, ঠিক আছে একদিন আপনাকে নিয়ে যাবো!
জানতে চাইলাম, ‘সে কোন অস্বাভাবিক আচরণ করে কি?’
বলল, ‘হ্যাঁ, কখনো কখনো কোন কারণ ছাড়াই হাসতে থাকে। কখনো কেউ কাছে না থাকলেও কথা বলতে থাকে, আবার কখনো শুধু কাঁদতে থাকে!’
একথা শুনে আরো খারাপ লাগল। সিনিয়ার হাই স্কুলের একজন ছাত্রীর সড়ক দুর্ঘটনায় মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়াটা বড় দুঃখজনক। কেন জানি এই ছাত্রীটির এমন দুর্ভাগ্যকে মেনে নিতে পারছিলাম না।
তারপর অর্ধ বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আমি সেকথা কাতোকে কয়েকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। ছুটির দিনে তার বোনকে দেখতে মানষিক হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলেছিল। তারপর বছর ঘুরে এল মিঃ কাতো আমাকে নিয়ে যায়নি। সে বেশ ভদ্র ও মার্জিত তাতে কোন ভুল নেই। কিন্তু তার মনের যে জটিলতা রয়েছে তার কিছুটা আভাস পেলাম। আমি ধরে নিলাম যে কাতো তার শুধু বোনকে নয়, তার পরিবারের কাউকে আমাদের নিকট পরিচয় করিয়ে দিতে কোন কারণ বশত সংকুচ বোধ করছে। তার বাড়ি আমার শহর থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রোজ বাড়ি থেকেই আমাদের শহরে তার কর্মস্থলে গাড়িতে আসা যাওয়া করে।
একদিন রেষ্টোরেন্টের মেয়ে দুটি তাকে বলল, ‘আপনি ইংলিশ কথোপকথন করতে আসেন ভাল কথা। কিন্তু আমাদের তো কিছু গিফষ্ট করলেন না!’
তাদের অনুযোগ শুনে মিঃ কাতো মনে হয় লজ্জা পেল। সে প্রতিজ্ঞা করে বলল, “এখন ডিসেম্বর মাস, তোমাদের আমি খৃষ্টমাস গিফ্ট দিবো!”

জাপানীরা খৃষ্টান না হলেও বড়দিনের উৎসবও তারা জাকজমকের সাথে পালন করে। সেদিন তারা বন্ধুবান্ধবদের ও নিজের সন্তানদের কিছু কিনে উপহার দেয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে জাপানীদের ধর্ম ‘চলন ধর্ম’ তাই তারা অন্যান্য ধর্মের কৃষ্টি-কালচারও নিজেদের করে নিতে পারে। এতে তারা কিছু মনে করে না। খৃষ্টমাস উৎসবের জন্য জাপানে কোন সরকারী ছুটি নেই। তবু তারা নববর্ষের কার্ড, যা তারা আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবকে দেয়, তাতে ‘খৃষ্টমাস ও নববর্ষের শুভেচ্ছা’ লিখে অভিনন্দন জানায়। ভিন্ন ধর্মের আঁচার অনুষ্ঠান নিজেদের মধ্যে প্রচলন করে তারা বরং সমৃদ্ধ হয়েছে।
হ্যাঁ, মিঃ কাতো অবশ্য বড়দিনের উৎসবে মেয়ে দু’টিকে কথা মতো উপহার দিয়েছিল।
কাতো মাঝেমাঝে বলতো, ‘আমার বাবা পাঁচটি সন্তান জন্ম দিয়ে ভাল করেন নি!’
উত্তরে বললাম, ‘কেনো, তিনি তো সবাইকে শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে মানুষ করেছেন। অসুবিধা কোথায়। জাপান দেশটির জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে। লোকসংখ্যা কম হলে ইয়াং পাওয়ার অর্থাৎ ম্যান পাওয়ার কমে যায়, তা জানেন? তাতে দেশের প্রগতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং রাষ্ট্রের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়!’
কাতো বলল, ঠিক বলেছেন, “বর্তমান জমানার জাপানীরা বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিলেও একটি বা দুটি সন্তানের বেশি নয়!”
বললাম, “আর আপনি তো বলছেন বিয়েই করবেন না!”
তখন তড়িৎ গতিতে জবাব দিলো সে, ‘হ্যাঁ, আমি কখনো বিয়ে করবো না!’
হেসে বললাম, এদেশে আপনার মতো রোগী অনেকেই আছে। তারাও হয়তো বিয়ে করবে না!
‘আমাকে আপনি রোগী বলতে চান?’কাতো ক্ষোভ প্রকাশ করল।
বললাম, ‘আমার দৃষ্টিতে কিছুতেই বিয়ে না করা প্রকৃত মানুষের প্রকৃতি হতে পারে না। ফুটপাতের পাশে বড় বৃক্ষগুলির গোড়া লক্ষ করে দেখবেন।শক্ত পাথুরে পাকা ফুটপাত হলেও বৃক্ষের শিকড় যখন বাড়তে থাকে তখন সেই পাকা ফুটপাতে ফাটল সৃষ্টি হয়। এমন কখনো দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ, অনেক দেখেছি। কাতো জবাব দিলেন।
তা থেকে কী প্রমাণ পেলেন?
‘প্রকৃতির শক্তি!’
বললাম, ‘মিঃ কাতো, এই প্রকৃতি কিন্তু মানুষ, জীব জানুয়ারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ঠিক নয় কি? আপনি সুস্থ-সবল হলে অবশ্যই বিয়ে করবেন। যাদের মাঝে খুঁত রয়েছে, তারাই বিয়ে করতে ভয় পায়। হয়তো দেখেছেন যে দুর্বল বৃক্ষ বাড়তে পারে না, মরে যায়!’
সেদিন কাতো কথা বাড়ায় নি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘না, আমার ব্যাপার আলাদা ও ভিন্ন!
তার মাঝে সে ভিন্ন জিনিষটি কি হতে পারে তাও ভেবে দেখেছি। তখন তার প্রতিবন্ধী বোনটির কথা মনে পড়ল।
রেষ্টুরেন্টে কর্মরত মেয়ে দু’টির একটির নাম ডোরি। সে বলল, ‘মিঃ কাতো, আমি আপনাকে ফিলিপাইন নিয়ে যাবো, যদি আপনার ইচ্ছা থাকে। অনেক সুন্দরী এলিগেন্ট মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো। তাদের একজনকে অবশ্যই আপনার পছন্দ হবে!’
ডোরির কথা শুনে মনে হল কাতো ভয় পেয়েছে। তা তার চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম। সে দ্রুত উত্তর দিল, ‘ আমি প্লেনে করে কোথাও যেতে ভয় পাই!’
ডোরি জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কখনো প্লেনে করে কোথাও যান নি?’
কাতো সহজ উত্তর দিলো, ‘না, কখনো আমি প্লেনে করে কোথাও যাই নি, ভয় পাই!’
কাতোর কথা শুনে ডোরি ও তার সঙ্গি মেয়েটি হা হা হা হা শব্দ করে হাসল।
আমি বললাম, ‘তাহলে বিদেশ ভ্রমন কেমনে করবেন?’
‘কেন, বই পড়ে সবকিছু জানা যায়!’

মিঃ কাতোর এই কথার কি জবাব দিবো কিছুক্ষণ ভেবে নিলাম। তারপর বললাম, ‘তাহলে বিদ্যালয়ে ছাত্রদের জন্য প্র্যাক্টিকেল ক্লাস থাকতো না মিঃ কাতো। আপনি অবাস্তব কথা বলেন। বই যতই পড়ুন তা হবে শিক্ষার পঞ্চাশ ভাগ আর বাকিটা প্রেক্টিক্যালি হাতে কলমে বা দেশ ভ্রমনে। প্রভুর সৃষ্ট বিস্ময়কর এই পৃথিবীতে কতোকিছু দেখার আছে, যা দেখে শিক্ষার বাকীটুকু পূর্ণ করতে হবে!’
কাতো বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। ধর্মের উপর অনেক পড়াশুনা করেছেন। কথায় কথায় বৌদ্ধ ধর্মের শ্লোক বলে উদাহরণ দেয়। কিন্তু সে কয়েক দশকে একবারও মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেনি। তার গাড়িটি সাত সীটের ওয়াগন টাইপের। একজন লোকের জন্য এত বড় গাড়ির প্রয়োজন হয় না। একদিন লক্ষ করলাম গাড়িটির ভিতরে কয়েক ডজন বই রয়েছে। অফিসের কাজ শেষ করে গাড়িতে বসে বই পড়ে। বইয়ের মধ্যমে তার পৃথিবীকে জানার একমাত্র প্রচেষ্টা। আরেকটি জিনিষ দেখে বিস্মিত হলাম। ওয়াগনটির কোণায় লেপ-তোশক রাখা আছে। আমাদের আড্ডায় যারা আসেন কাতো রেগুলার মেম্বার না হলেও মাঝেমাঝে এসে যোগদান করেন। আড্ডাতে রাত হয়ে গেলে গাড়িতেই ঘুমিয়ে রাত কাটায়। একদিন বলল, ‘এতে আমার সুবিধা হয়; সকালে উঠে সাড়ে আটটায় অফিস করতে পারি!’
সেদিনের আডায় আলোচ্য বিষয় ছিল এভারেস্ট আরোহণ করতে গিয়ে কয়েজন জাপানী পর্বতারোহি তুষার ধ্বসে মৃত্যু বরণ করেছেন, তার উপর। যুগে যুগে পর্বতারোহী অনেক মৃত্যু বরণ করেছেন। তবুও পর্বতারোহীদের সংখ্যা তো কমেনি বরং কয়েকগুণ বেড়েছে। জাপানের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যায়ে ছাত্ররা পর্বতারোহী ক্লাব করে। পর্বতারোহণের কঠোর ট্রেনিং নিয়ে যায় বিশ্বের বড় বড় পর্বতে আরোহণ করতে। এটা হল মানুষের দুর্গম এলাকায় যাওয়ার দুঃসাহসিক প্রবণতা। মৃত্যুকে পরোয়া না করে দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় গিয়ে অনেকে প্রাণ দিয়েছে। মানবকুলে এই প্রবণতা রয়েছে বলেই বিশ্বকে জয় করতে পেরেছে। সেদিন আমরা যখন এই বিষয়ে কথা বলছিলাম তখন মিঃ কাতো বললেন, “এটা বড় বোকামি, দুর্গম পথে গিয়ে প্রাণ দেওয়ার কোন মানে হয় না!”
সেদিন আড্ডায় কিমুরা নামে এক ভদ্রলোক তার কথা শুনে প্রশ্ন করলেন, “তাহলে এভারেষ্ট দেখার ইচ্ছা যদি কারো মনে থাকে, কি ভাবে যাবে!”
মিঃ কাতো জবাব দিলো, “হেলিকপ্টারেও যেতে পারে!”
তখন প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি তো প্লেনে উঠতে ভয় পান। এভারেষ্ট দেখতে কি হেলিকপ্টারে যেতে চান?’
“না, না, আমি যাবো কেন। হেলিকপ্টারে করে যেতেও আমি ভয় পাই!”
‘তাহলে কাদের যেতে বলছেন?’
‘যারা যেতে চায় তারা যাবে!’
বললাম, কিছুদিন পূর্বে একটি হেলিকপ্টার পতিত হয়ে কয়েকজন লোকের মৃত্য হয়েছে। এভারেস্ট দেখতে হেলিকপ্টারে গিয়ে যান্ত্রিক কারণে ভূপাতিত হয়ে যাত্রিদের মৃত্যু হতে পারে। সে জন্যকি মানুষের অভিযাত্রা থেমে যাবে!
মিঃ কিমুরা বললেন, “ মিঃ কাতো, কিছু যাচাই না করে কথা বলা ঠিক নয়। নিজের ভ্রান্ত ধারণাকে যত্রতত্র বলে চালাতে পারবেন না, বোকা বনে যাবেন। আপনি একজন ভীতু মানুষ!”




