প্রবাস

জাপানীরা কেমন : পর্ব – ১৯

গতকাল দিনের শেষে ক্লান্ত দেহে রাত দশটায় যখন বিছায় শুইলাম তখন টিভিতে একটি খবর শুনে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এমনটি সাধারণত ভূমিকম্পের সময় প্রবাস জীবনে বহুবার হয়েছে। কিন্তু আজকের এ খবরটি ভূমিকম্পের নয়। মাত্র সাত বৎসর বয়সের একটি বালকের উপর এক দুঃখজনক সংবাদ! টিভিতে বলছে, “এ সাত বছরের বালকটি ৬ দিন খাবার না খেয়ে পর্বতের উপর একটি কুটিরে ছিল।”
এমন কথা হয়তো অনেকে বিশ্বাস করবেন না। কিন্তু ঘটনা কিন্তু সত্য! টিভিতে ছেলেটিকে দেখলাম। তার পরনে একটি নীল রঙের টি শার্ট আর প্যান্ট। শুকিয়ে তার দেহ অর্ধেক হয়ে গেছে। বালকটি অবনত মস্তকে অতি ক্ষিণ কন্ঠে একজন লোকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, “হ্যাঁ, আমি ইয়ামাতো!”
যিনি প্রশ্ন করছেন তার পরনে সৈনিকের পোষাক। তিনি আবার বললেন, “ঠিক মতো বল, তোমার নাম কি? বালকটি আবার ক্ষিণ কন্ঠে বলল “ আমি ইয়ামাতো।”
যে স্থানে দাঁড়িয়ে বালকটি কথা বলছে সে স্থানটি জাপানের সর্বোত্তরে হোক্কাইদোর একটি পর্বতের উপর অবস্থিত। মে মাসের ২৮ তারিখে তার বড় বোন সহ তাদের মা বাবার সঙ্গে গাড়িতে পর্বতের উপর বেড়াতে যায়। কিন্তু ছোট এই বালকটি দুষ্টামি করে এদিক সেদিক এবং অন্যের গাড়ি লক্ষ করে ঢিলা মারাতে তার বাবা ফিরার পথে তাকে শাস্তি দেয়ার জন্যে রাস্তার উপর নামিয়ে দিয়ে ৫০০ মিটারের মতো ড্রাইভ করে এসে থামেন তারপর ফিরে গিয়ে তারা তাদের সন্তানকে সে স্থানে অনেক খুঁজাখুঁজি করেও পান নি। অনেক হয়রান হয়ে থানায় গিয়ে পুলিশকে জানালেন যে তারা তাদের সাত বছর বয়সের পুত্র সন্তানটিকে খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রথমে তারা ছেলেটিকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দ্যেশে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে সেকথা গোপন রেখে বলেন যে পার্বত্য সবজী সংগ্রহ করার সময়ে ছেলেটি কোনদিকে গিয়েছে খুঁজে পান নি। পরে সুর পাল্টিয়ে সত্য কথাই বলতে বাধ্য হন’ইয়ায়ামাতো’ র বাবা। কারণ, জাপানের পুলিশের নিকট মিথ্যা বলে পার পাওয়া যায় না! প্রচলিত কথা আছে যে জাপানের পুলিশ বিশ্বের সেরা। তাদের কথা শুনা মাত্র পুলিশ চারিদিকে মাইকে ঘোষণা করে দিল যে সাত বছর বয়সের একটি বালক অমুক পর্বতের উপর হারিয়ে গিয়েছে। তাকে খুঁজার জন্যে জনসাধারণের সাহায্য চাইছি!
একই সময়ে জাপানের সেনাবাহিনীর সাহায্যও চাইল। জাপানের সেনাবাহিনিকে GSDF ( Ground Self Defence Force ) বলে। অত্যাধুনিক সাজ সরঞ্জামে সজ্জিত সেনাবাহিনীর লোক, জনসাধারণ আর পুলিশের পাশাপাশি পর্বতটিতে চিরুনি অভিযান চালিয়েও বালকটিকে খুঁজে পেল না!

ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত পূর্ব হোক্কাইদো পর্বত মালা (ছবি : ওয়েবসাইট)

বলাই বাহুল্য যে হোক্কাইদোর প্রতিটি পর্বত ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। সে জঙ্গলে থাকে অনেক ভাল্লুক।
তবেকি বালকটিকে ভাল্লুক খেয়ে ফেলেছে? কিন্তু পরবর্তি দু’ তিন দিন শত শত লোক তল্লাশি চালিয়েও
বালকটির কোন সন্ধান পেল না।
পাঁচশত মিটার অর্থাৎ আধা কিলোমিটার দূরে গাড়িতে গিয়ে বালকটিকে যেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে সে স্থানে ফিরে আসতে ঘন্টায় চল্লিশ কিলোমিটার বেগে ড্রাইভ করলে পনর মিনিটের উর্ধে লাগার কথা নয়। কিন্তু এতো অল্প সময়ে বালকটি কতো দূর পর্যন্ত যেতে পারে? বালকটির বাবা ও মা আশে পাশের সরু রাস্তাতেও যতো দূর চোখের দৃষ্টি যায় খুঁজে দেখেছে। তারা তাদের সন্তানটিকে পায় নি!
যখন আমি সাত বছরের বালক ছিলাম তখনকার কথা স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। বালকটির মানষিক অবস্থা কেমন হতে পারে তা ভেবে দেখলাম। এ বয়সে একটি বালক যখন বুঝতে পারল তার বাবা তাকে জনশূন্য পার্বত্য পথে একা নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। তখন সে ভেবেছে তার পিতামাতা তাকে আর নিতে আসবে না। কারণ একান্ত আপন বলতে তো পিতামাতা। তারা যখন তাকে ত্যাগ করেছে তখন আর কে আসবে তাকে উদ্ধার করতে? তাই বালকটি মনে করল কোথাও গিয়ে আশ্রয়ের স্থান পাওয়া যায় কি না খুঁজে দেখবে। সে হয়তো ভেবেছে যে এখন সে তার পিতামাতা থাকা সত্ত্বেও একজন এতীম – পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই। বালকটি পর্বতের একটি সরু রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে দৌড়াতে কিছু দূরে গিয়ে দেখতে পেল গহীন জঙ্গলের মাঝে এক চিলতে স্থান পাকা করা আছে। পাশে ছোট একতি পাকা কুটির রয়েছে। আর এ স্থানটির চারিদিকে জালিতারের ফেন্স দিয়ে ঘেরা। প্রবেশ পথে তালা দেওয়া আছে। কিন্তু এর ভিতরে কোন লোকজন নেই। ছেলেটি জালিতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে ভিতরে গেল। ছোট কুটির ঘরটি পাকা হলেও তাতে কিছু ব্যবহৃত ভারি মেট্রেস ছাড়া আর কিছুই নেই। কুটিরটির দুটি দরজা রয়েছে। একটিতে তালা দেয়া আছে কিন্তু অন্যটি খোলা ছিল। সেই খোলা দরজা দিয়ে কুটির ঘরে প্রবেশ করে বালকটি প্রচন্ড শীতে মাঝে দু’টি ১০ সেন্টিমিটার প্রস্থের মেট্রেসের মাঝে ঢুকে শুয়ে পড়ল। সেদিন এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে তাতে তাপমাত্রা আরো নেমে গিয়ে রাতে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছে। বালকটির পরনের কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে। ভিজা কাপড়েই শীত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু’টি মেট্রেসের ভিতরে শুয়ে পড়ল। হয়তো কোন এক সময়ে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমিয়েছে। দেহের তাপে হয়তো তার পরনের প্যান্ট ও টি শার্টটি শুকিয়ে গেছে। কুটিরের ভিতরে বিদ্যুতের লাইন নেই। গভীর অন্ধকারেই বালকটি রাত কাটাল। এ বয়সে একটি বালক নির্জন এ স্থানে ভয়ে কাতর হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু শিশুটি কাতর হওয়ার পরে যদি পাথর থাকে এখন এই শিশুর মন হয়তো পাথর হয়ে গিয়েছিল! এই বয়সের শিশু এখানে এক ঘন্টাও নির্জনে কিছুতেই থাকতে পারবে না।
ইয়ামাতোকে উদ্ধারের জন্য জাপান সেনাবাহিনী পরিচালিত উদ্ধার অভিযান (ছবি : GSDF ওয়েবসাইট)

পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার কয়েকদিন উপর দিয়ে চক্কর দিয়ে গেছে। কিন্তু আবদ্ধ এ কুটিরে বালকটি থাকতে পারে তা আমলে দিল না। এ কুটিরটি হল সেনাবাহিনীর একটি ছোট ট্রেনিং কেন্দ্র। মাঝে মধ্যে কিছু সেনা সদস্য এখানে ট্রনিং নিতে আসে। এমন গভীর জঙ্গলে এ ট্রেনিং কেন্দ্রে ট্রেনিং শেষে সেনা সদস্যরা তাদের মূল ঘাটিতে ফিরে যায়। কদাচিৎ হয়তো কিছু সৈন্য থাকে তাই কিছু মেট্রেস রাখা আছে। কোন লেপ, চাদর এবং বালিশ কিছুই নেই।
হোক্কাইদো রাশিয়ার নিকটে অবস্থিত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে রাশিয়া জাপানের চারটি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে। সে দ্বীপগুলি ফেরত চেয়েছে জাপান কিন্তু বিগত ৭০ বছরেও রাশিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েও দ্বীপগুলি ফেরত দেয় নি। তাই রাশিয়ার সাথে জাপানের সম্পর্ক তেমন ভাল নয়। জাপান রাশিয়াকে বিশ্বাস করে না। তাই হোক্কাইদোতে জাপানের সেনাঘাটি অনেক রয়েছে। পর্বতের উপরেও এ কুটিরটির মত অনেক ট্রেনিং কেন্দ্র রয়েছে।
পরের দিন ভোরে পেটে ক্ষিদা নিয়ে উঠে বাহিরের একটি পানির টেপ দেখতে পেয়ে বালকটি শুধু পানি খেল। এরপর প্রতিদিন সকাল বিকাল রাতে ছেলেটি শুধু পানি খেয়েই বেঁচে আছে। প্রথম দিন থেকে ৫টি রাত সে এখানেই একা বসে থাকতো আর পানি খেতো। বালকটি হয়তো ভেবেছে তার পিতামাতা তাকে ত্যাগ করেছে তারা আর তাকে উদ্ধার করে নিতে আসবে না। এই ভাবে যতোদিন সম্ভব সে পানি খেয়েই বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া এই নির্বোধ বালকটি আর কী প্রত্যাশা করতে পারে? এই বয়সের বালক বালিকারা দুষ্টামি করে। তাই বলে তাদের এমন ভাবে শাস্তি দিবে তা কোন শিশুই তাদের মা বাবার কাছ থেকে প্রত্যাশা করে না!
বালকটি হারিয়ে যাওয়ার ছয় দিনের দিন সেনাবাহিনীর একটি দল সেখানে গিয়ে বালকটিকে দেখে বিস্মিত হল। তারা সেখানে রুটিন মাফিক ট্রেনিং এর জন্যে গিয়েছিল।
বালকটিকে একজন সৈনিক জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নাম কি বল?”
বলকটি জবাব দিল, “ইয়ামাতো!”
এই দলের সৈন্যরাও জানতো ‘ইয়ামাতো’ নামে একটি বালক হারিয়ে গিয়েছে। তাই তারা পুলিশকে ফোনকরে জানিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে বালকটিকে তুলে নিয়ে প্রথমে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তার বালকটিকে পরীক্ষা করে তার দেহে কিছু কাটা দাগ পেল। দীর্ঘ ছয়দিন উপোস থাকার কারণে তার ওজন কমে গেছে। তার দেহ জলশূন্য বা ডিহাইড্রেশন বুঝতে পেরে কয়েকদিন হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ করার জন্যে রেখে দেয়। ডাক্তার বলেছেন, “ভয়ের কোন কারণ নেই। সে সুস্থ হবে!”
কিন্তু এই কাহিনী এখানেই শেষ হল না। জার্নালিষ্ট ও টিভির লোকেরা জড়ো হয়ে ছেলেটির বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগল। তার বাবা তাকাইয়ুকি তানুওকা বার বার সবার নিকট ক্ষমা চাইলেন। আরো বললেন, “ আমি ইয়ামাতোকে শাস্তি দেয়ার জন্যে মাত্রাতিরিক্ত ব্যবস্থা নিয়েছি – আমার অপরাধ হয়েছে। আমার এ ভুলের জন্যে পুলিশ বাহিনি, সেনাবাহিনী ও নাগরীকবৃন্দ অনেক কষ্টকরে খুঁজাখুঁজি করেছেন। তার স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠিরা উৎকণ্ঠায় ছিল। তাদেরকে কষ্ট দেয়েছি আমার নিজের ভুলের জন্য। আমাকে ক্ষমা করে দিন!”
কিন্তু জার্নালিষ্ট ও টিভির লোকেরা শত রকমের প্রশ্ন করে তাকে এখনো বিব্রত করছে।
আগের একটি লেখাতে লিখেছিলাম, “ নিহন ওয়া হাজি নো কুনি!” অর্থাৎ লজ্জা দিয়ে চূড়ান্ত শিক্ষা দেওয়া হয় – এমন দেশ জাপান। বালকটির বাবাকে এখনো জার্নালিষ্টরা জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আজ ভোরেও টিভিতে ইয়ামাতোর একটি ডকুমেন্টারি দেখানো হয়েছে। কিন্তু তারপর কি হতে পারে!
ইয়ামাতোর বাবা হয়তো এই লজ্জা থেকে বাঁচার জন্যে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাবেন। এমনটি অনেকের বেলায় হয়েছে!

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button