প্রবাস

জাপানীরা কেমন পর্ব – ১৮

এই পৃথিবীতে প্রত্যেকটি নরনারী জন্মের পর বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে একটির পর একটি রোগে আক্রান্ত হন। মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে নবজাতকের দেহে বিভিন্ন বিষাক্ত ব্যাক্টেরিয়া এবং ভাইরাস প্রায় ছয় মাস যাবত আক্রমণ করতে পারে না। কেন পারেনা সে ব্যাখ্যা দিতে হলে প্রথমে সহজ কথায় বললে অর্থ হবে “তা হল বিধি প্রদত্ত এক অলৌকিক বিধান!” যদি এ বিধান না থাকতো, অনেক বেশি সংখ্যক শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর মৃত্যু হত। ইংরেজীতে body Immunity বা ‘শরীরের অনাক্রম্যতা শক্তি। অর্থাৎ ‘বীজানু প্রতিরোধ শক্তি’ মানব হে প্রকৃতি থেকেই হয়। প্রথম ছয়টি মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর শিশুটির সর্দি-কাশি সময়ে সময়ে হয়। এতে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে দেহে বিজানুর প্রতি দেহের প্রতিরোধ শক্তি সৃষ্টি হয়। শিশুটি বড় হতে হতে তার দেহে এমন ভাবেই বীজাণু প্রতিরোধে অনাক্রম্যতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রতির বদৌলতে অনেক দুরারোগ্য রোগ থেকেও রোগী আরোগ্য লাভ করেন। তন্মধ্যে ‘দেহের অনাক্রম্যতা’র ক্রিয়া যথাযথ হলে আরোগ্য লাভ করতে তেমন বেশী সময় লাগে না। যে সকল রোগীর ‘দেহে immunity বা অনাক্রম্যতা শক্তি’ কম থাকে তারা রোগের সাথে দীর্ঘদিন লড়ে আরোগ্য লাভ করে।। আবার তার চেয়েও কম প্রতিরক্ষা শক্তি যাদের রয়েছে তাদের অকালে মৃত্যু বরণ করতে হয় প্রকৃতির শক্তির নিকট পরাজয় হলে। এ হল মানুষের নিয়তি।
আমি সেই নিয়তির শিকার হয়েছিলাম এবং তা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একটি শিক্ষা। তা থেকে আমি জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেছি।
২০১২ সালের আগষ্ট মাসের কথা। জন্মের পর অনেক রোগের সাথে লড়ে আজ পর্যন্ত সুন্দর এই পৃথিবীতে বেঁচে রয়েছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য অথবা ভাগ্য ভাল বলে। আমার মত অনেকে নতুন রোগে আক্রান্ত হয়ে কষ্ট পেয়েছেন। অনেকে আরোগ্য লাভ করেছেন, অনেকে মৃত্যু বরণ করেছেন। এদিকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে বায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন, বার্ড ফ্লু এবং এবোলা ভাইরাস, ডেঙ্গু বীজানু, চিকনগুনিয়া নামক মারাত্মক রোগ নতুন ভাইরাসের কারণে হচ্ছে। এমন ভাইরাস পূর্বে ছিল না। গেল বছরে এবোলা ভাইরাসের আক্রমণে আফ্রিকায় সাত হাজার লোকের অধিক মৃত্যু হয়েছে। নতুন এসব ভাইরাসের কার্যকর প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি। উন্নত দেশগুলিতে অবশ্য প্রতিষেধক বের করার জন্য ব্যাপক গবেষণা চলছে। জাপানের জনগণের গড়পড়তা হায়াত ৮৪ বৎসর। তাদের হায়াত বৃদ্ধির মূল কারণ হল দেশটিতে উপযুক্ত এবং সুন্দর চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। তদুপরি এদেশে ‘স্বাস্থ্য বীমা’ থাকার কারণে কম খরচে চিকিৎসা নেয়া সবার পক্ষে সম্ভব হয়। এমন ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই বলে অসংখ্য রোগী কতিপয় বিজনেস ক্লিনিক বা তথাকথিত মেডিক্যাল হাসপাতালে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত টাকা দিয়েও জীবন রক্ষা করতে পারে না। আর, ডাক্তারদের অপচিকিৎসায় যে সকল রোগীর মৃত্যু হচ্ছে, সে ব্যাপারে সরকারি তদন্তও হয় না। তাই, রোগী মারা গেলে ডাক্তারদের কিছুই হয় না। অথচ, জাপানে এমন কোন অঘটন অর্থাৎ অপমৃত্যু যদি হাসপাতালে হয়, তদন্ত করা হয়। ডাক্তারের কোন গাফেলতি থাকলে ডাক্তারের লাইসেন্স ক্যান্সেল করা হয়। এমন কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে বলেই তো জাপানের চিকিৎসা ব্যবস্থার এত উন্নতি হয়েছে। আয়ু বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষিত লোক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, রোগাক্রান্তও কম হয়।
জন্মের পর আমার জীবনের ভয়াবহ একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছি ২০১২ সালের ২৮ আগষ্টে। তখন জাপানে ব্যাপক তাপদাহ চলছিল। যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন, “গ্লোবাল ওয়ার্মিং!” জাপান শীত প্রধান দেশগুলির অন্তর্ভুক্ত হলেও গ্রীষ্মকালে কিন্তু বিশ্রী ধরণের গরম পড়ে। টিভি ও অন্যান্য মাস মিডিয়াতে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেয়া হয়। তাপপ্রবাহে জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে জাপানীতে ‘নেৎচুশো’ বলে। টিভিতে বলছে অতিরিক্ত গরমে মাথা চক্কর দিলে হাসপাতালে রিপোর্ট করতে। আমার ভাগ্যে যে এর পরণতি মারাত্মক হবে তা কখনো ভাবিনি। সেদিন শুক্রবার ছিল। জুম্মার নামাজ পড়ার সময়ে অস্বস্তি বোধ করলাম। মসজিদটিতে এ/সি আছে। কিন্তু সেদিন লোক জমায়েত বেশি ছিল।গরম বোধ করছিলাম। বাসায় ফিরার পর জ্বরে আক্রান্ত হলাম। আমার স্ত্রী বরফ জলে কয়েকটি টাউয়েল ভিজিয়ে জ্বরের তাপ কমাতে চেষ্টা করল। জাপানে জ্বরের তাপ ‘ফারেনহাইট থার্মোমিটারে’ মাপে না। এদেশে ‘সেন্টিগ্রেড পদ্বতির থার্মোমিটার’ ব্যবহার করে। সন্ধ্যা সাতটায় আমার তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রীতে উঠল দেখে গাড়িতে করে আমাকে সে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমারজেন্সি ওয়ার্ড এ নিয়ে গেল। ডাক্তার তড়িৎ গতিতে এক্সরে করে দেখে বললেন, “এ জ্বর ‘নেৎচুশো, বা তাপদাহ জনিত জ্বর। এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনেক রোগী আসছে’ আমি ঔষধ দিলাম, ঘরে ফিরে গিয়ে ঔষধ সেবন করলে জ্বর নেমে যাবে!”
কিন্তু ডাক্তারের কথায় আমি সন্তুষ্ট হলাম না। কারণ, আমার মনে হচ্ছিল এ জ্বর নেৎচুশো নয় এবং এই ঔষধে আমার জ্বর কমবে না। আমার স্ত্রীকে বললাম, “আমি হুইল চেয়ারে এখানেই বসে থাকবো, বাসাতে ফিরে যাবো না!”
সে ডাক্তারকে আমার বক্তব্য বলল। ডাক্তার বললেন, “অবশ্যই এই ঔষধে জ্বর নেমে যাবে। ঘরে নিয়ে যাওয়া উচিত!”
ঘরে ফিরে ঔষধ খেলাম। মাথায় বরফ রাখা রাবারের থলে এনে কপালে রাখল। দুটো ফ্যান চালু আছে। এই গরমের দিনেও দুটি লেপের নিচে শুয়ে আছি। থার্মোমিটারে জ্বর মেপে দেখছে। রাত দশটা তখন – আমার জ্বর বিন্দুমাত্র কমল না। বরং সামান্য বেড়েছে।
ডাক্তারের দেয়া ঔষধে বিশ্বাস হারালাম। পরের দিন বিকালে টয়লেটে যাওয়ার সময় অর্ধপথে পড়ে গেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারালাম। আমার স্ত্রী কাছে থাকাতে রক্ষা। এবার এম্বুলেন্সে আবার সেই হাসপাতালের ‘ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে’ গেলাম। (তারপর আমি নাকি ১১ দিন অজ্ঞান ছিলাম।) আত্মীয় স্বজনের কান্নাকাটি চলছে। আত্মীয় বলতে আমার এক ভাগনি ও তার স্বামি। তারা দূরে থাকে। পরে খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। ইতোমধ্যে আমি এক আলৌকিক জগতে চলে গেলাম। অনেকের মতে অবচেতন অবস্থায় অনেক রোগী অলৌকিক জগতে বিচরণ করতে থাকে। অবচেতন অবস্থার আরেক নাম অজ্ঞান। কিন্তু অনেক রুগী অজ্ঞান হয়ে ভাল হওয়ার পর স্মরণ করে কিছুই বলতে পারে না। এখন আমার যে অবস্থা তাকে near to the death point বলে। আমি যখন মৃত্যুর সাথে লড়ছি এবং আই সি ইউতে ডাক্তারগণ আমাকে বাঁচাতে সংগ্রাম করছেন। অভিজ্ঞ নার্সগুলি বিদ্যুৎ বেগে কাজ করছেন। তখন অলোকিক জগতে অজ্ঞান অবস্থায় অনেক কিছু দেখেছি যা এতদিন মনে পোষণ করছি। কোন অতিরঞ্জিত কাহিনী এতে নেই। তবে যা লিখে যাচ্ছি তাতে অনেকে ‘পরকাল’ সম্পর্কে অথবা মৃত্যুর পূর্বক্ষণে যারা জ্ঞান হারায়–তখন তারা অজানা এক অস্থির জগতে বিচরণ করে! সেই রকম কিছু অবিশ্বাস্য রকম কিছু ধারণা আমার লেখা পড়ে পাঠকেরা পাবেন। আমার ভাগ্যেও তাই হয়েছিল – যা আজো স্মরণে আছে! এই স্মরণে থাকাও অবিশ্বাস্য একটি ব্যাপার। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমার মাথায় তা গেঁথে রয়েছে। ভুলি নি, ভুলতে পারি না। এই ব্যাপারে মনে হয় আমি আমার স্মরণ শক্তির মূল্যায়ন করছি।
এখন আমি সম্পূর্ণ অজ্ঞান। মনে হচ্ছে যে অজ্ঞান হওয়ার পরেই জাপানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ক্যানাডায় অবস্থিত একটি ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটি বৃটিশ কলাম্বিয়া ষ্টেটের ভ্যাঙ্কুভার সিটির অদূরে অবস্থিত। এই সিটির একটি আবাসিক এলাকায় বাড়ি কিনে আমার মেয়ে ‘সাকুরা’ তার স্বামির সাথে থাকে। মাত্র দশ মাস পূর্বে আমার একটি নাতনি হয়েছে যার ছবি দেখেছি কিন্তু বাস্তবে তাঁকে দেখিনি। অজ্ঞান অবস্থায় সে রক্তের টানেই হয়তো আমার এখানে আসা? নাকি অন্য কিছু (?) তা তিন বৎসর পরেও বুঝতে পারিনি।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের হাসপাতালটি দু’তলা। নিচের তলায় রোগী থাকে। এখানে ‘আই সি ইউ’ এর একটি বেডে শুয়ে আছি। এমন সময় একটি ব্ল্যাক ছেলে বৃষ্টিতে ভিজে এসে আমাকে ইংরেজীতে বলল, “ ক্যানাডার এই ষ্টেটে বৃষ্টি বেশি হয়। বাসা থেকে যখন আসছিলাম হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল! তাই ভিজে গেলাম।”
তার কথা শুনে হাসলাম। বললাম, “শুনেছি এখানে শীতও নাকি অন্যান্য অঞ্চল থেকে কম।”
ঠিক বলেছেন, “ ভ্যাঙ্কুভারে শীতের প্রভাব অন্যান্য ষ্টেটের চেয়ে কম!”
এমন সময় এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। আমার পাশের রুমের বা দিকের ওয়াল বদলে গিয়ে মোটা গ্লাসের ওয়ালে পরিণত হল! তার পাশে সামান্য খালী স্থান আছে। সেখানে কালো দাঁড়িওয়ালা দীর্ঘদেহি কৃষ্ণাঙ্গ একজন পুরুষ এসে প্রথমে ব্রডকাষ্টের জন্য একটি টিভি ডিশ এন্টেনা বসালেন। তার বয়স চল্লিশ-পয়তাল্লিশ হবে। ছোট একটি টেবিলে একটি মাইক ও ছোট একটি টিভি সেটার উপরে রাখলেন। আর, পাশের রুমের একটি ওয়ালে অর্থাৎ করিডোরের ওয়ালে তিন পিস A4 সাইজের ফাটো সেট করলেন। ফটোগুলি আমি দেখতে পাচ্ছি। সেগুলিতে চার কি পাঁচ বৎসর বয়সের তিনটি ছেলে শিশুর ছবি এবং শিশুগুলি হাসিমুখে রয়েছে। এই তিনটি শিশুর মধ্যে একটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু রয়েছে। যখন এসব দেখছি – এমন সময় পুরুষ লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। তার সঙ্গী দু’জন সাহকারীও রয়েছেন। প্রথমে তিনি একটি নার্সকে ডেকে বললেন, “আমরা জানতে পেরেছি” এই হাসপাতালে আপত্তিজনক বর্ণবৈষম্য রয়েছে। এখন আমরা এই বিষয়ে টিভিতে বিশ্বব্যাপী ব্রডকাষ্ট করবো!”
তার কথা শোনামাত্র একটি নার্স দৌড়ে গিয়ে হাসপাতালের প্রধান সেই ডাঃ মিসেস কিমুরাকে নিয়ে এলেন। ডাঃ কিমুরা লোকটিকে সরাসরি কিছু না বলে নার্সটিকে বললেন, “তারা হাসপাতাল সম্পর্কে কী প্রচার করতে চায় কাগজে লিখে জানাতে বল!”
নার্সটি গিয়ে টিভি টীম প্রধানকে সেভাবে বলল।
লোকটি একটি কাগজের পৃষ্ঠা পূর্ণ করে লিখে নার্সটির হাতে দিলেন।
ডাঃ কিমুরা সেটি দেখে বললেন, “না, আমাদের হাসপাতালের উপর এমন বক্তব্য প্রচার করা যাবে না!”
নার্স লোকটিকে একথা বলার পর তিনি জবাব দিলেন, “ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব। কারো বাঁধা মানব না বলে তিনি টেবিলের সামনে বসে মাইকে ইংলিশে বলতে লাগলেন, “ এই হাসপাতালে একজন ‘নন্‌ জাপানিজ’ আছেন। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি যে তিনি বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়েছেন। দিনের পর দিন তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে!”

ক্যাসল হেলথ হসপিটাল, ভ্যান্কুভার

এমন সময় লক্ষ করলাম মিসেস কিমুরার মুখাবয়ব বদলে ফ্যাঁকাসে হয়ে গিয়েছে। তিনি ওয়ালের পাশে রাখা একটি চেয়ারে বসে হাসপাতালের মেইন ক্যম্পাস সুদূর জাপানে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু জাপান এবং ক্যানাডার টাইমের ব্যতিক্রম হল ১২ ঘন্টা। এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মহিলার আত্মীয়। টাইমের ব্যবধানের জন্যে ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে মহিলা হতাশ হলেন। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে নির্বাক বসে রইলেন।
“আই সি ইউ” তে এখন আমরা দু’জন বেডে শুয়ে আছি। তানাকা বাম পাশের বেডে শুয়ে আছে। তাকে মাঝ খানের পর্দাটির জন্য দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার কন্ঠ শুনতে পাচ্ছি। মনে হল টিভি টীম আসাতে তিনি খুশি হয়েছেন। টীমটির বাকি দু’জন লোক ক্যামেরা দিয়ে তার এবং আমার ফটো তুলছেন। এমন সময় শুনতে পেলাম টীম প্রধান বলছেন, “লক্ষ করুণ, রোগীর হাত পা বেডের সাথে শক্ত বেল্ট দিয়ে বেঁধে লক্‌ করে রেখেছে। রোগী তার হাত পা নাড়াতে কষ্ট পাচ্ছেন।” তিনি আমার দিকে টিভি ক্যামেরা ঘুরিয়ে আমাকে ইঙ্গিত করলেন হাত উঠাবার জন্য। আমি চেষ্টা করলাম। হাত ১০ সেন্টিমিটারের উপর তুলতে পারলাম না। সরাসরি ব্রডকাষ্ট হচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, “ লক্ষ করুণ, হাসপাতালে রাখা আছে ডজন খানেক ডিনামাইট। এসব রাখার মানে কী হতে পারে?”
ডিনামাইটের কথা শুনে পাশের কামরায় দেখতে পেলাম ওয়ালের পাশে লম্বা টেবিলের উপর অনেকগুলি ডিনামাইট রাখা আছে। সেগুলি দেখে আমি অবাক হলাম। কারণ, সেগুলি আমি আগে কখনো দেখিনি। অথবা সেগুলি হয়তো ছিল, আমার নজরে পড়েনি!
লোকটি বলে যাচ্ছে, “এসব ডিনামাইট নাকি হাসপাতাল প্রধানের শখের কালেকশন! বাহ, চমৎকার হবি বটে! রোগীরা রোগ যন্ত্রণায় কাৎরাচ্ছে আর তিনি তার শখের কালেকশন ডিমাইট ওয়ার্ডের ভিতরে এনে সাজিয়ে রেখেছেন!”
এমন সময় ডাঃ কিমুরা উঠে দাঁড়ালেন। তিনি নার্সগুলিকে ডেকে একত্রিত করলেন। তাদের মধ্যে সেই দজ্জাল নার্সটিও আছে।
ডাঃ কিমুরা তাদের বললেন, “ তোমরা সবাই গিয়ে টিভি ব্রডকাষ্টের সবগুলি এন্টেনা খুলে ফেল অথবা কেটে ফেল। তাহলে সে আমাদের হাসপাতালের বিরুদ্ধে কুৎসা রটাতে পারবে না!”
এই কথা বলামাত্র দজ্জাল নার্সটি ডিশ এন্টেনার সাথে যতগুলি এন্টেনার তার যুক্ত ছিল সেগুলি একটির পর একটি হাত দিয়ে খুলতে লাগলো।
মনে করেছিলাম যে টীম প্রধান দীর্ঘদেহি লোকটি নার্সটিকে বাঁধা দিবেন। কিন্তু তিনি কোন বাঁধাই দিলেন না। তিনি তার কথা অনবরত বলে যাচ্ছেন। তার সঙ্গীরা অন্যদিকে লাইন যুক্ত করে দিল। ব্রডকাষ্টের কাজ ঠিক মতোই চলছে।
বেডের পাশে স্যালাইন বেঁধে রাখার ষ্টীলের যে ষ্ট্যান্ডটি রয়েছে সেটি থেকে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ যাচ্ছে। ব্রডকাষ্টে বিপত্তি হচ্ছে না। সেটা থেকে ‘সি সি সি’ এমন একটি শব্দ বের হচ্ছে। সেখান থেকে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ যেদিকে ফাঁক পাচ্ছে সে পথে গিয়ে পাহাড়ের উপর স্থাপিত যে উঁচু টাউয়ারটি আছে সেদিকে ছুটে যাচ্ছে। বড় আশ্চর্যের ব্যাপার যে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ গুলিও আমি দেখতে পাচ্ছি। চিকন হালকা পাতলা রঙ্গিন রেশমি সূতার মতো ভিন্ন ভিন্ন রংগের এবং প্রস্থে ২০ সেন্টিমিটার হবে। একটি নার্স দৌড়ে এসে ষ্টীলের ষ্ট্যান্ডের মাথায় রাবারের ক্যাপ পরিয়ে দিল। তখন দেখলাম অন্য রোগীর ষ্ট্যান্ড থেকে ওয়েভ যাচ্ছে। তারা সেখানেও রাবারের ক্যাপ পরাচ্ছে। তখন ইলেক্ট্রিক বাল্ব যে ধাতব হোল্ডারে সেট করা হয়েছে সেখান থেকে ওয়েভ যাচ্ছে। নার্সগুলি লাফালাফি করে সর্বত্র গিয়ে রাবারের ক্যাপ লাগিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। অনবরত ব্রডকাষ্টিং চলছে!
মিসেস কিমুরা টেবিলের উপর রাখা টিভিটির দিকে তাকালেন। ছোট টিভিতে হাসপাতালের কোন কোন স্থানের দৃশ্য ব্রডকাষ্ট হচ্ছে তা দেখা যায়। আমিও দেখতে পাচ্ছি। টীম প্রধান টের পেয়ে স্ক্রিনে সেই শিশু তিনটির যে ফটো রয়েছে একটি টিভি স্ক্রিনে অভিনব ভাবে সেট করে ফেললেন। কী সুন্দর কিউট শিশু তিনটি। এই তিনটি কিউট শিশুর ফটো পাশের রুমের দেয়ালেও লাগানো আছে। চিন্তা করলাম এই শিশুগুলির ফটো রাখার কী অর্থ হতে পারে? অনেকক্ষণ চিন্তাকরে একটি জবাব পেলাম। কে যেনো এসে আমাকে কানে কানে বলল বর্ণবৈষম্য বিরোধী মানবাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামী দল। ঐখানে সাদা কালো শিশু তিনটি দিয়ে বুঝানো হচ্ছে যে পৃথিবীতে সব রঙের শিশুই ‘কিউট’, কাউকে খাটো করে দেখার কিছু নেই।
এখন আর বুঝার উপায় থাকে না যে তাতে কী ব্রডকাষ্ট হচ্ছে। এদিকে নার্সগুলি ব্রডকাষ্ট বন্ধ করতে লাফিয়ে লাফিয়ে ধাতব দন্ডগুলির মাথায় রাবারের ক্যাপ পরিয়ে দিচ্ছে। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু ব্রডকাষ্টের কাজ অলৌকিক ভাবে চলছে। আমার রুমের দরজা দিয়ে বের হয়ে ইলেক্ট্রিক ওয়েভ পাশের রুমের যে দরজাটি রয়েছে-সেটি ভিতরে আসা এবং বের হয়ে হবার জন্য রয়েছে, সে দরজাটি দিয়ে আঁকাবাঁকা ভাবে ‘বৈদ্যুতিক ঢেউ’ বের হচ্ছে!
তখন লক্ষ করলাম যে তিনজন জার্নালিষ্ট ওয়াল ভেদকরে আমার কামরায় একবার এসেছিলেন, তারাও এসে ইলেক্ট্রিক ওয়েব হালকা ভাবে হাত লাগিয়ে মেইন ফটকের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে যাতে ওয়েভ সহজে ব্রডকাষ্টিং টাউয়ারে চলে যায়। আরো দেখলাম সেই বৃদ্ধ জার্নালিষ্ট যার ক্যান্সার হয়েছিল, তিনিও তাদের সাথে যথাসম্ভব কাজ করে যাচ্ছেন। অবাক হলাম তাঁকে এখানে দেখে। আমি আশ্চর্য হলাম। তিনিও সেই টিভি টীমের সাথে যুক্ত! তখন আমার ভাগনী রোক্সানাকে দেখলাম তাঁদের পাশে একটি চেয়ারে বিমর্ষ মনে বসে আছে। তখন মনে করলাম যে জাহাঙ্গীর এ টীমটিকে খবর দিয়ে এনেছে। ( কিন্তু আমার সে ধারণা পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।)
এখন মনে হচ্ছে আমার এই ছোট “আই সি ইউ” তে ছোট একটি ভয়াবহ নাটক চলছে। নার্সগুলি লাফালাফি করছে টিভি ব্রডকাষ্টিং বন্ধ রাখতে। কিন্তু তারা কিছুতেই বন্ধ করতে পারছে না।
ব্রডকাষ্টিং ক্রমাগত চলছে। এমন সময় তানাকার কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম। সে বলছে, “চমৎকার, এখানে বৈষম্যমূলক কাজ হচ্ছে। তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও!”
তানাকার সাপোর্ট দেখে আমি অবাক হলাম। প্রথম থেকেই সে এই হাসপাতালের সিস্টেমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কমেন্ট করছে। ডাক্তার এবং নার্সদের সাথেও তর্কাতর্কি করেছে।
সম্পূর্ণভাবে ব্রডকাষ্টিং এর কাজ সেরে টিভি টীম চলে গেল। এখন এক অদ্ভুত আই সি ইউতে ভৌতিক নিরবতা বিরাজ করছে। তারা চলে গেলেও শিশু তিনটির যে ফটোগুলি ওয়ালে লাগিয়েছিল তারা সেগুলি নিয়ে যায়নি। আহা শিশুগুলির কী সুন্দর হাসিহাসি মুখ। কৃষ্ণাঙ্গ শিশুটি আর শ্বেতাঙ্গ ছেলে দু’টি মুখামুখি দাঁড়িয়ে আছে। আমি যখন তাদের ফটোগুলি দেখছি ঠিক সেই সময়ে লক্ষ করলাম যে পাশের রুমটিতে একজন পুরুষ আড়াআড়ি ভাবে বুকে দু’ হাত রেখে আমার দিকে চেয়ে আছেন। সে রুমে ক্যান্সার রোগীটি ছিল। এখন সে নেই। দেখা যাচ্ছে রুমে কিছু চেয়ার রাখা হয়েছে। তাঁর বয়স সত্তরের কাছাকাছি মনে হল। পরনে সাদা হাফহাতা শার্ট, গায়ের বর্ণ ফরসা এবং মাথার সবগুলি চূল সাদা। তিনি নিরবে আমাকে দেখছেন। পাশের কামরা আর আমার কামরার মাঝামাঝি মোটা গ্লাসের দেয়াল রয়েছে। তাই তাঁকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তিনি আমার দিকে চেয়ে আছেন কেন? চোখ বুঝে চিন্তা করতে লাগলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখি তিনি একই ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এক সময় তার সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল এবং ঠিক তখন তিনি মাথা নাড়িয়ে আমাকে ইশারা দিলেন কামরা থেকে বের হয়ে তাঁর নিকট যেতে। তারপর আরেক বার চোখাচোখি হল। এবারও তিনি মাথা নেড়ে একই ভাবে ইশারা করলেন। তখন ভাবলাম তাকে কি জবাব দেয়া যায়!
আমি আমার হাত সামান্য উপরে উঠিয়ে বাঁধা বেল্টগুলি দেখালাম। বুঝালাম যে আমি বন্দি, আমাকে বেঁধে রেখেছে, এমন অবস্থায় যাওয়া সম্ভব নয়!
তারপর বেশ কিছুক্ষণ বসে থেকে তিনি চলে গেলেন!
চলে যাওয়ার পর বড় ভাবনায় পড়লাম। তিনি আসলে কে? কেন আমাকে যেতে ইশারা করেছিলেন? আমি তো আমার বেডে বাঁধা অবস্থায় ছিলাম। ইচ্ছা করলে তিনি নিজেই তো আমার বেডের কাছে আসতে পারতেন এবং আমার বেল্ট খুলে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন! কিন্তু তিনি আমার বেডের কাছে আসেননি কেন? এমনতর অনেক প্রশ্ন মাথায় এসে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার বাবা বলেছিলেন, “ আজরাইল যখন কারো রুহ্‌ নিতে আসেন তখন জবরদস্তি করে রুহ নেন না। যার রুহ নিতে আসেন সে ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় তার রুহ না দেয় তখন তিনি চলে যান!”
এসব ভাবনাগুলি স্মরণে এসে আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। বারবার বাবার কথাগুলি স্মরণ করছিলাম। তিনি আরো বলেছিলেন যে এক পর্যায়ে রোগী নিজেই তার রুহ্‌ আজরাইলকে দিয়ে দেন। কারণ, রোগী রোগের কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে এক পর্যায়ে আজরাইলের সাথে স্বেচ্ছায় চলে যায়। আমি যখন হাই স্কুলে পড়ি তখন বাবা এসব কথা আমাকে বলেছিলেন। অনেক বছর আগের কথা। আজ কেন বাবার সেই কথাগুলি মনে আসছে কিছু বুঝতে পারলাম না! তবে এই ভদ্রলোক কি তাহলে সেই আজরাইল? তিনি আমাকে আমাকে ওপারে নিয়ে যেতে এসেছিলেন!
আমি যখন এসব কথা ভাবছি, এমন সময় শুনতে পেলাম। তানাকা নার্সকে বলছে তাকে তাঁর বাড়িতে পৌছে দিতে।
তিনি বললেন, “আজকেই আমি হাসপাতাল থেকে চলে যেতে চাই। আমার জন্য এম্বুলেন্স ডাক!”
নার্সটি বলল, “ঠিক আছে। আমি ডাক্তার আসলে বলব।” (চলবে)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button