sliderরাজনীতিশিরোনাম

জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করুন-এবি পার্টি

পতাকা ডেস্ক : ডেঙ্গু ও হামের বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা বন্ধ, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা কার্যকর এবং স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির নেতারা বলেছেন, প্রতিরোধযোগ্য রোগে মানুষের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি চলতে পারে না।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসাইন মানিক মিয়া হলে এবি পার্টি ডক্টরসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. (অব.) মেজর ওহাব মিনার। ডা. রাশেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. মোজাহেরুল হক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল, ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. মো. আবদুল আহাদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. আরিফুল মোরশেদ খান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ, লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক ডা. সাইফুদ্দীন কিসরু, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) নেতা নেতা ডা. মারুফ শাহরিয়ার এবং এবি পার্টি ডক্টরসের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. শওকত আরমান।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. ওহাব মিনার বলেন, হাম ও রুবেলার টিকাদানে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেড়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার আওতা ৯২ শতাংশ থাকলেও ২০২৪-২৫ সালে তা ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। টিকা সংগ্রহ ও বিতরণে অব্যবস্থাপনা, টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং সময়মতো ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন না হওয়াকে তিনি বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধন কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই, নির্মাণাধীন ভবন ও ড্রেনে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারকপ হামের টিকাদান সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিলেও আরও আগে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।

অধ্যাপক মিনার বলেন, আজ আমরা এখানে সরকারকে দোষারোপ করতে আসিনি, আমরা এসেছি মানুষকে বাঁচাতে। সরকার ব্যর্থ হলেও আমরা আমাদের পরিবারকে ব্যর্থ হতে দিতে পারি না।” তিনি প্রতি শুক্রবার অন্তত ১০ মিনিট বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, শিশুদের বয়স ও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করা এবং জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. মোজাহেরুল হক বলেন, ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোকে কার্যকর করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর পেটে ব্যথা, বারবার বমি, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, বমির সঙ্গে রক্ত আসা কিংবা অস্বাভাবিক আচরণের মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। তিনি সব শিশুর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করে টিকাদানের আওতা অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবায় অনিয়ম ও অপচিকিৎসার অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ বলেন, ডেঙ্গু ও হামের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং চিকিৎসক-নার্সের সংকট রোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতাল বা পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা, রোগের মৌসুম শুরুর আগেই প্রস্তুতি নেওয়া এবং স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সংকটকে কেবল চিকিৎসকদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। হাসপাতালের অবকাঠামো, পরিবেশ, জনবল ও ব্যবস্থাপনার দায় রাষ্ট্রেরও রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান বাড়াতে নীতিনির্ধারক ও সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা চালুর প্রস্তাবও দেন তিনি।
হামের টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, টিকাদান কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেকাংশে সম্ভব। নিয়মিত টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব ডা. মো. আবদুল আহাদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নজরদারি বাড়ানো জরুরি। মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সংকট তৈরি হওয়ার পর তৎপরতা নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি ও পরিকল্পিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, ডেঙ্গু ও হামে প্রাণহানির ঘটনায় যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খাল বন্ধ হয়ে যাওয়া, পানি নিষ্কাশনে বাধা এবং অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

লন্ডনপ্রবাসী চিকিৎসক ডা. সাইফুদ্দীন কিসরু বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ দেশের সব মানুষ এর সুফল পাবে। রোগীকেই চিকিৎসাব্যবস্থার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ বলেন, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা এবং শিশুর পুষ্টি ও নিয়মিত টিকাদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. আরিফুল মোরশেদ খান বলেন, স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। মশক নিধনে ব্যবহৃত উপকরণ ও কীটনাশকের মান এবং কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করার দাবি জানান তিনি।

ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের নেতা ডা. মারুফ শাহরিয়ার বলেন, ডেঙ্গু ও হামের বিষয়ে সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। রোগের কারণে মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় ও মানসিক চাপ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. শওকত আরমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সুসংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হতে হবে।

আলোচনা সভায় বক্তারা ডেঙ্গু ও হাম প্রতিরোধে টিকাদানের আওতা সম্প্রসারণ, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তদন্ত, মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং সরকার, চিকিৎসক, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে এবি পার্টির নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, সদস্য সচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক ও শাব্বির আহমেদ তামিম এবং সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু,নারী উন্নয়ন বিষয়ক সহ সম্পাদক আমেনা বেগম, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী ও বরিশালের নেতা জাকির হোসেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button