রাজনীতিশিরোনাম

গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরে পেতে স্বজনদের আকুতি

রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর উদ্যোগে ‘মায়ের ডাক’ ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।আজ রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর উদ্যোগে ‘মায়ের ডাক’ ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বিশ্ব মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরে পেতে তাদের স্বজনরা আকুতি জানিয়েছেন। আজ রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর উদ্যোগে ‘মায়ের ডাক’ ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু হৃদি চার বছর ধরে বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মাঝে মধ্যেই অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাবার ছবির দিকে। স্কুলের বন্ধুরা যখন ছুটির পর বাবার হাত ধরে বাড়িতে ফেরে, তখন হৃদির চোখ প্রায়ই সেখানে আটকে যায়। মায়ের কাছে কোনো কিছুর বায়না করে না পেলে সে বলে উঠে- বাবা থাকলে আমাকে এটা এনেই দিত।
গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয় দিয়ে রাজধানীর শাহবাগ থেকে ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ হোসেনসহ চারজনকে। দীর্ঘ চার বছরেও সন্ধান মেলেনি তাদের। পারভেজ যখন নিখোঁজ হন তখন তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার অন্ত:সত্ত্বা ছিলেন। কয়েক মাস পরেই পৃথিবীর আলো দেখে পারভেজ-ফারজানা দম্পতির ছেলে আরাফ হোসেন। তাদের বড় মেয়ে আবিদা ইসলাম হৃদি এবার ক্লাস ওয়ানে উঠবে। আর আরাফের বয়স সাড়ে তিন বছর।
পারভেজের স্ত্রী ফারজানা বলেন, বাবার জন্য খুব কষ্ট পায় হৃদি। বাবাকে সে খুব মিস করে। মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন করে বাবাকে কবে খুঁজে পাবে, বাবা কেন ফিরে আসে না। ওর এসব প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারি না। চোখে পানি চলে আসে। তখন হৃদিই আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে- কেঁদো না মা, বাবা ফিরে আসবে।
তিনি বলেন, আমার স্বামীর তো কোনো দোষ ছিল না। সে রাজনীতি করতো এটাই কি তার অপরাধ? এটা যদি তার অপরাধ হয় তাহলে আমি বলতে চাই- তাকে ফিরিয়ে দেয়া হোক, তিনি আর কখনো রাজনীতি করবেন না। আমরা শুধু চাই- যে কোনো অবস্থায় তিনি আমাদের মাঝে ফিরে আসুক।
পারভেজের মতো আরেক দুর্ভাগার নাম মফিজুল ইসলাম রাশেদ। তিনি দারুসসালাম থানা ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল মিরপুর মাজার রোড থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাকে তুলে নেয়া হয়। এরপর আর ফিরে আসেননি রাশেদ। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেও কোনো কাজ হয়নি বলে জানান তার স্ত্রী রুমা বেগম।
রুমা বলেন, আমার স্বামীই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। বড় ছেলে রিমনের স্কুলের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে চলছি। আমার একটাই প্রার্থনা এই দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া হোক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনকেও তুলে নেয়া হয়। সুমনের বড় বোন মারুফ ইসলাম ফেরদৌসী বলেন, আমাদের স্বজন হারানোর দায় কি কেউ নেবে না? কেউ কি তাদের খোঁজ দিবে না? চার বছরে অন্তত ২০ বার ভাইকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছি। আমরা আর পারছি না, আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়ান।
সুমনের আরেক বোন সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ভাইয়ের সন্ধানে যখন প্রশাসনের কাছে গেলাম, তখন তারা প্রশ্ন করেছিল- আপনার ভাই কি রাজনীতিতে জড়িত ছিল। প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে তারা কিভাবে এই প্রশ্ন করেন তা আমার বোধগম্য নয়। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর ফেরার উপায় নেই।
তিনি বলেন, প্রতি মুহূর্তে ভয়ে থাকি আমার ভাই কোন টর্চার সেলে আছে! তাকে না জানি কত টর্চার করা হচ্ছে! এটা কোনো মগের মুল্লুক না যে, যখন যাকে ইচ্ছা ধরে নেয়া হবে, পরে লাশ মিলবে। এই অন্যায়ের প্রতিবাদে এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
নিখোঁজ সূত্রাপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহানা বানু মুন্নি বলেন, আমরা পুলিশের কাছে গিয়েছি কিন্তু ভাইয়ের কোনো সন্ধান পাইনি। মামলাটি এখন সিআইডিতে আছে, তারাও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। এখন শুধু প্রধানমন্ত্রীই পারেন আমাদের সাহায্য করতে। তাই তাকে বলতে চাই- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি মাদার অব হিউম্যানিটি, আমাদের কান্না দেখুন।
সংবাদ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্যে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনিও স্বজনদের হারিয়েছেন। তাই স্বজনহারাদের কষ্ট আপনারই সবচেয়ে ভালো বোঝার কথা। কিন্তু আপনি কেন তাদের কান্না শুনতে পাচ্ছেন না? মানবতার নেত্রী হিসেবে আপনি পরিচিতি পাচ্ছেন। তাই এই স্বজনহারা মানুষগুলোর কষ্ট লাঘবে আপনাকেই উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনি দয়া করে এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ান। তাদের কান্না শোনার চেষ্টা করুন।
সরকারের উদাসীনতায় গুম-খুন বন্ধ হচ্ছে না- এমন দাবি করে জাফরুল্লাহ বলেন, কোনো কথা বলেই এই স্বজনহারাদের কান্না থামানো যাবে না। এত কিছুর পরও দেশে গুম-খুন বন্ধ হচ্ছে না, যার জন্য এই সরকারই দায়ী। আর এর আরেকটি কারণ হচ্ছে বিচার বিভাগের নিস্ক্রিয়তা।
কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহারের অপহরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফরহাদ মজহার ভাগ্যবান যে তিনি ফিরে আসতে পেরেছেন। পুলিশ-র‌্যাব সক্রিয় ছিল বলেই তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তারা যদি সক্রিয় না থাকতো তাহলে হয়তো আজ মজহারের লাশ মিলতো, নয়তো তাকেও পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে পাওয়া যেত।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাসহ নিখোঁজ ১৪ জনের পরিবারের সদস্যরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button