জাতীয়শিরোনাম

গুম হওয়া পরিবারের স্বজনদের কান্নার রোল প্রেসক্লাব হলরুমে

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০১৯ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্বজন হারানোদের সংগঠন “মায়ের ডাক এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় স্বজনরা কান্না জড়িত কণ্ঠে সরকার ও প্রশাসনের কাছে গুম হওয়াদের ফেরত দিতে দাবি জানায়।
শুক্রবার (৩০ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে স্বজন হারানোদের সংগঠন এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভায় তারা এ দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে গুম হওয়া সন্তানকে ফিরে পেতে মায়েরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্ত্রীরাও চান তাদের স্বামীর সন্ধান। এ সময় ছেলে মেয়েরা তাদের বাবার ছবি হাতে নিয়ে সরকারের কাছে আকুতি জানায়; গুম হওয়া বাবাকে যেন ফেরত দেয়।
প্রেসক্লাব মিলনায়তনের হল রুমে মায়েদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারি হয়ে যায়। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকুতির পরিবর্তে মায়েদের কান্নার রোল পড়ে যায় হলরুমে। এতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও বক্তব্য রাখেন, স্বজন হারানোদের প্রতি সহমর্মিতা জানান।
তেজগাঁও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন গুমের শিকার হন ২০১৩ সালে ৪ ডিসেম্বর রাতে। তার ছোট্ট শিশু কন্যা রাইসা বাবা সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্না উপস্থিত আলোচক ও শ্রোতাদেরও আবেগাপ্লুত করে। অনেকেই চোখ মুছতে থাকেন।
ছোট্ট রাইসা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, আমার বাবা যখন নিখোঁজ হয় তখন আমার বয়স ৭/৮ বছর ছিলো। আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। এখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। দীর্ঘ ৫ বছর আমি বাবাকে দেখি না। বাবাকে ছাড়াই কী আমি বেঁচে থাকব? আমি আমার বাবাকে ফেরত পেতে চাই। বাবার সাথে বেড়াতে যেতে চাই। আমি আমার বাবার বুকে নিয়ে ঘুমাতে চাই। রাইসা আরও বলেন, আমার বন্ধুর বাবারা যখন স্কুল ছুটির পর ওদের নিতে আসে তখন আমি একা একা বাবার জন্য কান্না করি। তখন বাবার অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি।রাইসা তার মতো যেসব শিশুর এই অনুষ্ঠানে এসেছে তাদের সবার বাবাকে ফিরিয়ে দিতে সরকারের কাছে আবেদন জানায়।
রাজধানীর রামপুরা থেকে নিখোঁজ ছাত্রলীগ নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন তপুর মা সালেহা বেগম বলেন, আমার ছেলে তিন বছর ৭ মাস ধরে নিখোঁজ। যুবলীগের স্থানীয় নেতারা প্রশাসনকে দিয়ে আমার ছেলেকে গুম করে। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে হাজারও মানুষের দুয়ারে দুয়ারে দৌড়াইছি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু আজও আমি আমার ছেলেকে ফিরে পাইনি। আর কতদিন আমি ছেলের অপেক্ষায় থাকবো, বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন সালেহা বেগম।
ফেনীর মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বলেন, আমার ছেলে ২০১৪ সালের মার্চের ২০ তারিখে রাতের আঁধারে আমার বাড়ি থেকে ঘরের দরজা ভেঙে কালো পোশাকধারীরা ধরে নিয়ে যায়। তারা আমার বাসা তল্লাশি করে আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। গামছা দিয়ে তাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। আমার ছেলে যুবদলের রাজনীতি করত। যখন রিপনকে ধরে নিয়ে যায়, তখন তার একটি শিশু বাচ্চা রয়েছে। মামলা করতে গিয়েছি। তারা মামলাও নেয়নি। আজও আমি ছেলেকে ফেরত পাইনি। কোনো বিচারও পাইনি।
২০১৬ সালের ১৮ জুন সাতক্ষীরার নিখোঁজ হোমিও চিকিৎসক মোখলেছুর রহমানের বাবা আবদুর রশীদ চিৎকার করে কান্না জড়িতকণ্ঠে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন করেন। তিনি বলেন, যেদিন তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্তা। আমার ছেলেকে তিন দিন থানায় আমি নিজের হাতে খাবার দিয়েছি। পানি খাইয়েছি। পুলিশ চারদিনের দিন আমাকে বলে, ‘ওই শুয়োরের বাচ্চা, তোর ছেলেকে আমরা যা বলতে বলি তা বলে না কেন?’ আমি ছেলেকে বলি বাবা তুমি যা জান, তা এদের বলো। শুনে পুলিশ বলে, ‘ওই শুয়োরের বাচ্চা, তোকে কি এ কথা বলতে বলেছি।’ এই বলে আমাকে ও আমার ছেলের বউকে থানা থেকে পিটিয়ে বের করে দেয়।
আবদুর রশীদ দাবি করেন, আমার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দলও করত না। আমি বিচার পাইনি। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দেই।
অনুষ্ঠানে ছোট ছোট শিশুরা তাদের বাবার ছবি তুলে ধরে। এতে লেখা ছিল ‘শুধু বাবাকে ফিরে পেতে চাই।’
পূর্বপশ্চিম

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button