রাজনীতিশিরোনাম

গণমানুষের নেতা এম, এ, রকীব

অ্যাড. মহসীন রেজা : ব্রিটিশ ভারত সরকারের অধীনে সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পিতা মো. তাহের উদ্দীন ফরিদপুর শহরে কর্মরত থাকাকালে পরিবারের দ্বিতীয় পুত্রসন্তান হিসেবে ঘর আলো করে ১৯২৯ সালের ১৮ নভেম্বর এম, এ, রকীব জন্মগ্রহণ করেন। পিতার বদলি চাকুরির কারণে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে এম, এ, রকীবের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। এম, এ, রকীবের বড় ভাই আ. রউফ ১৯৩৮ সালে সেন্ট গ্রেগরী স্কুল থেকে বাংলা ও ইংরেজিতে সর্বোচ্চ নম্বর লাভ করেন এবং পার্বতীচরণ গোল্ড মেডেল লাভ করেন। এম, এ, রকীব পিতার বদলির কারণে দিনাজপুরে আসেন এবং দিনাজপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। স্কুলে বিতর্ক, আবৃত্তি, খেলাধুলায় সাফল্য লাভ করেন এবং বড় ভাইয়ের মত তিনিও মেধার পরিচয় দিতে থাকেন। এম, এ, রকীবের পিতা মো. তাহের উদ্দীন কলকাতার পার্ক সার্কাসে একটি তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন এবং একটা পর্যায়ে পুরো পরিবার সেখানে পাঠিয়ে দেন। যার দরুণ এম, এ, রকীব কলকাতার স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন। বড় ভাই আ. রউফ ভুল চিকিৎসায় ১৯৪৩ সালে মারা গেলে এম, এ, রকীবের পিতা সরকারি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পারিবারিক সিদ্ধান্তে এম, এ, রকীব নওগাঁ আসেন এবং ১৯৪৫ সালে নওগাঁ কে, ডি, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে তিনি নওগাঁ কে, ডি, সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হতে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং পুনরায় কলকাতা ফিরে যান ও সেন্ট জেভির্য়াস কলেজে এইচ, এস, সি তে ভর্তি হন। এরপর বঙ্গবাসী কলেজে বি, এস, সিতে ভর্তি হন এবং পড়াশোনা চলাকালে দেশভাগ হলে সব ওলটপালট হয়ে যায়। পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে তৎকালীন পাকিস্তানে পুরো পরিবারের সঙ্গে তিনিও ফিরে আসেন। ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে বি, এ তে ভর্তি হন। এম, এ, রকীবের ছাত্রাবস্থায়ই পুত্রশোকে কাতর পিতা তাহের উদ্দীন তাকে সিরাজগঞ্জের অ্যাডভোকেট আমির হোসেনের কন্যা সদ্য মেট্রিকুলেশন পাস করা মেধাবী ছাত্রী উম্মে কুলসুমের সাথে ১৯৫০ সালে বিয়ে দেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে নওগাঁর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সিরিশ মৈত্রসহ অন্যান্যরা এবং আর, এম, পির মূল নেতা পৃর্থিস বাগচী ভারতে চলে যান। এর ফলে নওগাঁর রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
নওগাঁতে তখন মুসলিম লীগ আর কমিউনিস্ট পার্টি সক্রিয় থাকে। কুচবিহারের দেবী নিয়োগী নওগাঁতে তখন কমিউনিস্ট পার্টির নানা রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকেন। অপর দিকে মুসলীম লীগের সভাপতি মিরাজউদ্দীন উকিল আর সেক্রেটারি ফজলুর রহমান দেওয়ান বিশেষভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকেন। এমন সময় সারাদেশে নাচোল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের কারণে কমিউনিস্ট কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। লালু পাণ্ডেসহ ২/১ জন কমরেড ছাড়া অন্যান্য হিন্দু কমরেডরা ভারতে গমন করেন। রাজশাহী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি অরুণ চৌধুরীর স্ত্রী নওগাঁস্থ প্যারীমোহন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কমিউনিস্ট পার্টির নবগঠিত সেলের পরিচালক হন। অ্যাডভোকেট রেজাউন নবীর ছোট ভাই নুরুন নবী আবুল এবং পুরুষের পোশাক পরা রেখা চৌধুরী শহরের দুর্গাপুরে এক সন্ধ্যায় কৃষকদের নিয়ে সভার করার সময় পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন। পুলিশ থানার পরিবর্তে তৎকালীন মুসলিম লীগের অফিস কাম সেক্রেটারির সরিষাহাটির মোড়ের পূর্বদিকের দোকানে নিয়ে তোলে এবং মুসলিম লীগের নেতারা নুরুন নবী আবুলকে বেদম প্রহার করে। রেখা চৌধুরীকে পরদিন বাড়ি সার্চ করার নামে করনেশন স্কুলের মাঠের ওপর দিয়ে তার শ্বশুড়বাড়ি অ্যাডভোকেট হেম চৌধুরীর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। তাকেও একইভাবে পিটিয়ে থানায় নেওয়া এবং কোর্টে তোলা হলে জেলহাজতে পাঠানো হয়। ছয় মাস পর দুইজনেরই দুই বছর করে জেল হয়। সেই সময় রেখা চৌধুরী অন্তসত্তা ছিলেন। তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পুত্র সন্তান প্রসব করেন। এম, এ, রকীবের পৈত্রিক বাসভবন চকদেব পাড়াস্থ দ্বীন মঞ্জিলে ভাড়া থাকতেন নুরুল ইসলাম মোহাম্মদ তাহের। সঙ্গে থাকতেন পুত্র খালেক তাহের মুকু। সেই সূত্রে এম, এ, রকীব যখন নওগাঁতে এসে কেডি উচ্চ বিদ্যালয় ভর্তি হন তখন থেকে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার শুরু হয়। এম, এ, রকীব যখন কলকাতায় পড়াশোনা করেন স্কুলে, খালেক তাহের মুকু তখন নওগাঁয় দেবী নিয়োগীসহ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যান্য নেতাদের নিয়ে সমর্থন গড়ে তোলেন। কলকাতা থেকে চলে আসার পর এম, এ, রকীব এর সাথে খালেক তাহের মুকুর বন্ধুত্ব আরও নিবিড় হয়। যে কয়জন কমিউনিস্ট নেতা নওগাঁয় ছিলেন হীরেন ঘটক তাদের অন্যতম। হীরেন ঘটক কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। তিনি খালেক তাহের মুকুকে ডাকেন এবং কয়েকজনকে নিয়ে একটা সেল গঠনের কথা বলেন। ১৯৫১ সালে এম, এ, রকীব, খালেক তাহের মুকু, মনোয়ার হোসেন, বোয়ালিয়ার সিরাজুল ইসলাম, শ্যামপুরের তুমিজ উদ্দিন, বক্তার পুরের মোসলেম সর্দার ও তার চাচাতো ভাই গোলাম রব্বানী প্রমুখদের নিয়ে সেল গঠন করেন। গোলাম রাব্বানী হাজার ১৯৪৮ সালে অরুণ চৌধুরীর সেলেও ছিলেন। কিন্তু সদস্যপদ না পাওয়ায় এই সেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু পার্টির কাজকর্ম পরিচালনা করা খুব দুরূহ ছিল। হীরেন ঘটক পেছন থেকে কাজকর্ম পরিচালনা করতেন, খুব একটা সামনে আসতেন না। কারণ তার এবং ছোট ভাই শংকর ঘটকের প্রতি পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরদারি ছিল। এরমধ্যে বর্ষাইল গ্রামে হীরেন ঘটক গ্রাম্য মিটিং করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাকে চোর-ডাকাতের মত মারপিট করা হয়। জামিন নিয়ে সম্ভবত ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে হীরেন ঘটক ভারতে চলে যান। কমিউনিস্ট পার্টি কাণ্ডারিবিহীন নৌকার মত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। তেমন কোনো কাজকর্ম ছিল না। কোনো সদস্যদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় কমতি ছিল না। ঢাকায় ইতোমধ্যে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এম, এ, রকীব, খালেক তাহের মুকু ও কোনো সেলের অন্যান্য সদস্যগণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বলিরঘাটের আফজাল হোসেন সান্তাহারে একটি ঘর ভাড়া করে হোমিও চিকিৎসা শুরু করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আফজাল হোসেন এর ঘনিষ্ঠতা ছিল। আফজাল হোসেন ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি সান্তাহারে একটি মিটিং করে দিতে বলেন। ১৯৫৩ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী সহ সান্তাহারে উপস্থিত হন। নওগাঁর বিশিষ্ট আইনজীবী মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ (রেজাউন নবীর পিতা) পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ খেলাফত আন্দোলন ও কৃষক প্রজা পার্টি করেছেন। খবর পেয়ে তিনি তার ভাইয়ের একটি মোটর গাড়ি নিয়ে সান্তাহারে যান। সান্তাহারে মিটিং শেষে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে নওগাঁয় আসতে বললে শেখ মুজিবুর রহমানকে তিনি নওগাঁ পাঠান। মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে চকদেব পারাস্থ নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। লোকজনকে ডাকহাক করে খানবাহাদুর বদির উদ্দিনের পুত্র আফতাব চৌধুরী, বক্তারপুরের গিয়াস উদ্দিন, ভারত থেকে আগত মহিউদ্দিন, নওগাঁ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এর পশ্চিম পাশের বাড়ি বালুরঘাটের ইমাম উদ্দিন মুক্তার এবং এম, এ, রকীব। শেখ মুজিবুর রহমান প্রস্তাব করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি কমিটি করার। মফিজ উদ্দিনকে সভাপতি করা হয় সর্বসম্মতিক্রমে। সেক্রেটারি হিসেবে এম, এ, রকীবের নাম প্রস্তাব করা হলে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন- ‘বয়স খুব কম হয়ে যায়। বয়স একটু বেশি হলে ভালো হয়’। শেষে ইমাম উদ্দিন মোক্তারকে সেক্রেটারি করা হয়। যুগ্ম-সম্পাদক হোন এম, এ, রকীব। পরবর্তীতে এই কমিটিতে যুক্ত করা হয় সদরের কছিম উদ্দিন আহাম্মেদ ও ধামুরহাটেরর ওয়াছিম উদ্দিনকে। সরকারের বিরুদ্ধে তখন মানুষের ক্ষোভ এবং কমিটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। এইভাবে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন চলে এলে পূর্ববঙ্গে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হল। নির্বাচনে এম, এ, রকীব ও তার সঙ্গীদের সক্রিয়তায় মফিজউদ্দিনসহ নওগাঁ মহকুমার প্রার্থীরা বিজয়ী হলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার ষড়যন্ত্রের যুক্তফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে বরখাস্ত করা হয়। এম, এ, রকীব, খালেক তাহের মুকুসহ অনেকেই গ্রেপ্তার হন। ৮ থেকে ৯ মাস কারাভোগের পর মুক্ত হয়ে এম, এ, রকীব, কছিম উদ্দিন আহম্মেদ ও খালেক তাহের মুকু তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে নওগাঁ মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলন হয় করনেশন হলে। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে মফিজউদ্দিন আহম্মেদ সভাপতি এবং সেক্রেটারি হিসেবে এম, এ, রকীব নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। মাওলানা হামিদ খান ভাসানী দাবি তুললেন পাক-মার্কিন সেন্ট সিয়াটো চুক্তি বাতিল করতে হবে। সোহরাওয়ার্দী উক্ত দাবি উপেক্ষা করলেন। তখন কমিউনিস্ট পার্টি ২৬/২৭ জন এমএলএ। কেউ গণতন্ত্রী পার্টির নামে কেউ আওয়ামী লীগের নামে এমএলএ ছিলেন। সকলেই সোহরাওয়ার্দীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ১৯৫৭ সালে ২৬/২৭ জুন রূপমোহন সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হয়। নওগাঁ থেকে এম, এ, রকীব, কছিম উদ্দিন, তুমিজ উদ্দিন, আনোয়ার হোসেনসহ বিপুলসংখ্যক কর্মী যোগ দিয়েছিলেন। এম, এ, রকীব ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নওগাঁ মহকুমার সেক্রেটারি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। আইয়ুব খানের অধীনে বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনে এম, এ, রকীব মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময়ে এম, এ, রকীবের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ উত্তাল হয়ে উঠলে রাজনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। নওগাঁ মহকুমায় এম, এ, রকীব, কছিম উদ্দিন আহম্মেদ, খালেক তাহের মুকু প্রমুখের তৎপরতায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বিভক্ত হলে এম, এ, রকীবসহ বেশিরভাগ কর্মী রিকুউমিশনপন্থি ন্যাপে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে ৬ দফা, ১১ দফা আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানের পতন হলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক শাসক ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা দখল করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭৯ সালে জাতীয় নির্বাচন দিলে এম, এ, রকীব জাতীয় পরিষদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং পরাজিত হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা অর্পণ না করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পূর্ববঙ্গের জনতার ওপর লেলিয়ে দেয়। শুরু হয় গণহত্যা লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগ নারী ধর্ষণের মতো নারকীয় তাণ্ডব। এই বর্বরতার অভিযানকে প্রতিহত করতে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। নওগাঁতে ইপিআরের উইং কমান্ডার নাজমুল হক ও ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। ২৬ মার্চ সকাল ১১টায় নওগাঁ উকিল বারে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত এমএলএ আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ বায়তুল্লাহকে আহ্বায়ক করে ও এম, এ, রকীব ও মোজাহারুল হককে দুই সদস্য করে কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী) এই তিন পার্টি থেকে সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের আধুনিক সমর অস্ত্র সজ্জিত প্রশিক্ষিত সৈন্যদের সাথে অসম লড়াইয়ে প্রতিরোধ ভেঙে যায়। ২২ এপ্রিল নওগাঁ শহরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রবেশ করে। এম, এ, রকীব, কছিম উদ্দিন আহম্মেদ ও খালেক তাহের মুকু তাদের কর্মী বাহিনীকে নিয়ে এপ্রিলের শেষে ভারতে প্রবেশ করেন। ৬ মে কলকাতায় ন্যাপসহ বামপন্থি নেতাকর্মীদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন স্বতন্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী প্রতিষ্ঠা করে তরুণদের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত করতে থাকে। এম, এ, রকীব তার পরিবার নিয়ে প্রথমে বালুরঘাটে সিপিআই নেতা তপন চৌধুরীর বাসায় উঠেছিলেন। পরে সেখান থেকে দ্রুত বালুরঘাটের চকভবানী, পরে বোয়ানদার মালদার শহরে, বহরমপুরে ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেন। ওইসব ক্যাম্পের মাধ্যমে মালদার বৃন্দাবন তলা থেকে দুই দফায় ৫ হাজারের বেশি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। ক্যাম্পের পরিচালক ছিলেন এম, এ, রকীব। দেশ স্বাধীন হলে এম, এ, রকীব তার দলের লোকদের নিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে এগিয়ে যান। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসে। এম, এ, রকীব, কছিম উদ্দিন আহমেদ ন্যাপেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন ও খালেক তাহের মুকু কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্য কাজ শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলে ১৯৭৬ সালে এম, এ, রকীবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এক বছরের অধিককাল যাবৎ তিনি কারাগারে ছিলেন। পরবর্তীতে ন্যাপের মধ্যে ভাঙন শুরু হলে এম, এ, রকীব রাজনৈতিক তৎপরতা কমিয়ে দেন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নির্বাচন করেন। এরপর থেকে এম, এ, রকীব বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এম, এ, রকীব নওগাঁ ব্লাড ব্যাংক, নওগাঁ ডায়াবেটিক সমিতি, আস্তান মোল্লা কলেজ, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, একুশে উদযাপন পরিষদ (বর্তমানে একুশে পরিষদ) সহ শতাধিক সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এম, এ, রকীব একজন সুবক্তা ও পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। তার নিকট বিভিন্ন সামরিক সরকারের আমলে মন্ত্রীসহ বিভিন্ন পদের প্রস্তাব এলেও তিনি তার আদর্শকে জলাঞ্জলি দেন নাই। আমৃত্যু মানবিক, সামাজিক সমতাভিত্তিক সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলে গেছেন। এম, এ, রকীবের স্ত্রী উম্মে কুলসুম বিবাহের পর সংসার পরিচালনার পাশাপাশি পড়াশোনাও করেন। তিনি নওগাঁ সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। উম্মে কুলসুম ২০১৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এম, এ, রকীব তিন পুত্র ও দুই কন্যার জনক ছিলেন। পুত্র-কন্যারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশ ও বিদেশে অবস্থান করছেন। সহকারীদের নিয়ে নিজ বাড়িতে অবস্থানকালে বার্ধক্যজনিত কারণে ৯২ বছর বয়সে গত ২৬ জুন ২০২০ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন এই আমৃত্যু বিপ্লবী। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নওগাঁ পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য রাজনৈতিক ও স্থানীয় সমস্যাভিত্তিক বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। আমৃত্যু তিনি এদেশের গরিব-মেহনতি মানুষের কথা চিন্তা করেছেন। তাদের লড়াই-সংগ্রামকে আকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন। নওগাঁর এক কিংবদন্তির নাম এম, এ, রকীব। নওগাঁর মানুষ যুগ যুগ ধরে তাঁকে স্মরণ করবে।
তথ্যসূত্র: অধ্যাপক কবি আতাউল হক সিদ্দিকী, সাবেক সভাপতি, নওগাঁ মহকুমা ছাত্র ইউনিয়ন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button