
কামরুল ইসলাম, রাঙামাটি প্রতিনিধি: গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারের প্রতিবাদে রাঙামাটিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার সকালে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে সচেতন ছাত্র–জনতার ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। কমিশনের প্রতিবেদনে এ শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।
পৌরসভা প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই বিভিন্ন স্থান থেকে মিছিল নিয়ে জড়ো হয় শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনগণ। ব্যানার,প্ল্যাকার্ড হাতে তাদের স্লোগান ছিল, রাষ্ট্র বাঁচাতে আদিবাসী শব্দ মুছতে হবে, সংবিধান মানো, ষড়যন্ত্র রুখো” ইত্যাদি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) রাঙামাটি জেলা সভাপতি তাজুল ইসলাম তাজ। সঞ্চালনা করেন সাংগঠনিক সম্পাদক পারভেজ মোশাররফ হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের (পিসিএনপি) চেয়ারম্যান কাজী মজিবর রহমান। প্রধান বক্তা ছিলেন সমঅধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন পিসিএনপির রাঙামাটি জেলা সভাপতি মোহাম্মদ সোলায়মান, সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম, সহসভাপতি কাজী জালোয়া, পিসিসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আসিফ ইকবাল, যুগ্ম সম্পাদক হাবীব আল মাহমুদ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন, জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেন ও দপ্তর সম্পাদক ইসমাঈল গাজী প্রমুখ।
বক্তারা অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের ১৯৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনের ১১৩, ১৪৬, ১৪৭ ও ১৪৮ নম্বর পাতায় ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ সরকারের একাধিক প্রজ্ঞাপন ও সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, আছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি।
তাদের মতে, একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শক্তির মদদে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা পূর্ব তিমুর, দক্ষিণ সুদান বা জিবুতির মতো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র করছে।
কাজী মজিবর রহমান বলেন, আদিবাসী শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের অখণ্ডতার ওপর আঘাত করা হচ্ছে। এটি নিছক ভুল নয়, সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত।”
কামাল উদ্দিন বলেন, “আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই। কিন্তু কুচক্রী মহল বারবার আদিবাসী ইস্যুতে বিভাজনের চেষ্টা করছে।
সমাবেশে বক্তারা ঐতিহাসিক দিকও তুলে ধরেন। তাদের দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী স্থানীয় নয়; তারা ইতিহাসে বিভিন্ন সময় মিয়ানমার, ত্রিপুরা, মিজোরাম, চীন–তিব্বত অঞ্চল থেকে এসে বসতি গড়েছে। ফলে তারা ভূমির আদি সন্তান নন, ‘আদিবাসী’ হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
একজন বক্তা বলেন, কাক যেমন ময়ূরের পেখম লাগালে ময়ূর হয় না, তেমনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আদিবাসী হতে পারে না। আদিবাসী হতে হলে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও ভূমির সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক থাকতে হয়।
সমাবেশে কয়েকজন বক্তা অভিযোগ করেন, কিছু বামপন্থি নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং পাহাড়ি নেতারা একযোগে আদিবাসী স্বীকৃতির নামে ষড়যন্ত্র করছেন। তাদের উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক মহলে ইস্যুটি তুলে ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে জোরদার করা।
সরকারি অবস্থান, ২০০৫ সাল থেকে বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক প্রজ্ঞাপন জারি করে বলা হয়েছে— বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। আন্তর্জাতিক আদিবাসী অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রেও বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেনি। অথচ কমিশনের প্রতিবেদনে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সমাবেশকারীরা।
বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রতিবেদন থেকে বিতর্কিত শব্দ প্রত্যাহার না হলে তিন পার্বত্য জেলা অচল করে দেওয়া হবে। তাদের প্রত্যাশা, দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় প্রধান উপদেষ্টা ও সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।




