অর্থনৈতিক সংবাদ

খেলাপি ঋণ আদায়ে দুদকের সহযোগিতা চাওয়ার নির্দেশ

ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না খেলাপিরা। মোট খেলাপি ঋণের ১ শতাংশও আদায় হচ্ছে না।
এতে সরকারি ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতির মুখে পড়েছে। কমে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর আয়। দায় ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে কোনো কোনো ব্যাংকে। এমনি পরিস্থিতিতে খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহযোগিতা চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
একই সাথে প্রতি তিন মাসে কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় করা হবে তার লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায় হচ্ছে না এমন শীর্ষ ২৪ ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে জরুরি বৈঠকে এমন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠক সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত কয়েক বছরে বিশেষ ব্যবস্থায় পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুবিধা দেয়া হয়েছে। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমার কথা। কিন্তু ফল উল্টো হচ্ছে। সুবিধা নেয়ার কিছুদিন পর পুনঃতফসিল করা অনেক ঋণ আবার খেলাপি হয়ে পড়ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব সুবিধা নিয়েছে তারাও এখন আবার পুনঃতফসিল করতে আবেদন করতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে এ ধরনের বেশ কিছু আবেদনও এরই মধ্যে জমা পড়েছে। এতেই বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণ।
গতকাল ব্যাংকারদের সাথে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ নিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক প্রতিবেদন তুলে ধরে। সেখানে খেলাপি ঋণ আদায় কম ও ব্যাংকিং খাতে সর্বাধিক খেলাপি ঋণ ও অবলোপনকৃত ঋণ রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতি ভাগে শীর্ষ ১০টি ব্যাংককে নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতে প্রতি তিন মাসে খেলাপি ঋণের বিপরীতে আদায় কম এমন শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিকেবি, ইসলামী, ন্যাশনাল, পূবালী ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)।
অবলোপনকৃত ঋণের ক্ষেত্রে সমগ্র ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, বিডিবিএল, ন্যাশনাল, সিটি, প্রাইম, আইএফআইসি, ব্র্যাক ও সাউথইস্ট ব্যাংক।
শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে আদায়ের হার ১ শতাংশের কম এরূপ ১০টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- এইচএসবিসি, ঢাকা ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও এবি ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের বিপরীতে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের দখলে রয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৮০ হাজার ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে আলোচ্য ১০ ব্যাংকেই রয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ের হার খুবই নগণ্য। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেশি এমন ১০ ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ১৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকের ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ১০ দশমিক ২২ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের সাড়ে ৫ শতাংশ, বিকেবির ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংকের ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের ২ দশমিক ২০ শতাংশ এবং ইউসিবির ২ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। এসব ব্যাংক খেলাপি ঋণও আদায় করতে পারছে না। ইসলামী ব্যাংক বাদে বাকি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে শূন্য থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। অর্থাৎ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বেশির ভাগই ফেরত দিতে পারছে না।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, এমন একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, যেসব ঋণখেলাপি ঋণ পরিশোধ করছেন না তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে দুদকের সহযোগিতা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুদকে ঋণখেলাপিদের নাম দিতে বলা হয়েছে। এতে বাধ্য হয়ে ঋণ পরিশোধ করবেন ঋণখেলাপিরা। একই সাথে খেলাপি ঋণ আদায়ে তিন মাসভিত্তিক সারা বছরের কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণসংক্রান্ত যেসব মামলা রয়েছে সেগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় কিভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায় সে দিকে মনোযোগ দিতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। প্রয়োজনে গ্রাহকের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে এর সুরাহা করা যায় কি না তা বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button