বিবিধশিরোনাম

কেন ছ’বছর ধরে শেকলে বেঁধে রাখা হল ফাতেমাকে

ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের একটি ২১ বছরের মেয়ের মানসিক ভারসাম্যহীন আচরণের কারণে তাকে প্রায় ছবছর শিকল দিয়ে বেঁধে বাড়িতে বন্দী করে রেখেছিল তার পরিবার – এমন এক ঘটনার কথা সংবাদমাধ্যমে বেরুনোর পর তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
ফাতেমা আক্তার নামে মেয়েটির বাবা মহিবুর রহমান নিজেই বিবিসিকে বলেছেন, ২০১১ সালে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করার কারণে এসএসসি পরীক্ষা দিতে না পেরে ফাতেমার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
ফাতেমার বাবার বক্তব্য অনুযায়ী অনেক চিকিৎসার পরও ফাতেমার সেই মানসিক সমস্যাগুলো ভালো হয়নি।
ফাতেমার আচরণ উগ্র হয়ে উঠলে এক পর্যায়ে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত হয় বলে তার পরিবার জানাচ্ছে।
তবে সংবাদ মাধ্যমে এ খবর বেরুনোর পর ফাতেমাকে এখন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য আনা হয়েছে।
ফাতেমা আক্তারের চাচাতো ভাই অপু সরদার বিবিসি বাংলার পুলক গুপ্তর কাছে বলছিলেন কীভাবে ফাতেমার এ সমস্যার শুরু।
“২০১১ সালে যখন ফাতেমা এসএসসি পরীক্ষা দিতে পারল না, তখন থেকেই ওর মন ভেঙে যায়। সব সময় বলত, বন্ধুরা পরীক্ষা দিচ্ছে – কিন্তু আমি দিতে পারলাম না। আস্তে আস্তে তারপর থেকেই ও বিগড়ে যেতে শুরু করে।”
“অথচ কী দারুণ ভদ্র মেয়ে ছিল ফাতেমা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, আরও কত কিছু করত। সেই মেয়েটাই ধীরে ধীরে একেবারে পাল্টে গেল। বাড়ির লোকজনকে মারধর করতে লাগল, একা একা চুপচাপ বসে থাকত।”
প্রতিবেশীরা তখন অনেকেই বলতেন ফাতেমাকে ‘শয়তানে ধরেছে’। সে জন্য কবিরাজি চিকিৎসাও করানো হয়েছিল। পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ হওয়া সত্ত্বেও দেখানো হয়েছিল ডাক্তারকেও।

এই মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই এখন ভর্তি আছেন ফাতেমা আক্তার

কিন্তু অপু সরদার বলছিলেন, শেষমেশ কিছুতেই কিছু করা যায়নি। ফাতেমার অবস্থা দিন-কে-দিন ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। টাকাপয়সার টানাটানিতে বছরদুয়েকের পর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও অসম্ভব হয়ে ওঠে।
কিন্তু তাই বলে তাকে শেকলে বেঁধে রাখার মতো নির্মম সিদ্ধান্ত পরিবার কীভাবে নিতে পারল? ফাতেমার যে তাতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল সেটা কি তারা বোঝেননি?
“কষ্ট হলেও বা আমরা কী করতে পারতাম বলেন? মেয়েমানুষ, গায়ে কাপড় রাখছে না – পরিবারের মানসম্ভ্রমেরও তো একটা ব্যাপার থাকে। এলাকার মানুষেও সবাই বলল, মেয়েমানুষ, আপনেরা ওকে বাইন্ধেই রাখেন!” অসহায় গলায় বলেন অপু সরদার।
ফাতেমা নিজে অবশ্য কখনওই শেকলে বাঁধা এই বন্দীজীবন মেনে নিতে পারেনি। সে চিৎকার-চেঁচামেচি করত, বারবার শেকল ছেঁড়ারও চেষ্টা করত।
তবে বছরের পর বছর ফাতেমা-কে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার খবর মিডিয়াতে বেরোনোর পরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। ফাতেমার বাড়িতে ভিড় করে আসেন সাংবাদিকরা, কিশোরগঞ্জ হাসপাতাল থেকে প্রাইভেট গাড়ি পাঠিয়ে তাকে পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।
তবে ফাতেমার চিকিৎসার উপযুক্ত অবকাঠামো বা বিশেষজ্ঞ কিশোরগঞ্জ হাসপাতালে নেই বিধায় তাকে ময়মনসিং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঢাকা থেকে আসা বিশেষজ্ঞরাও একই রায় দেন।
স্থানীয় প্রশাসনের তরফে এই আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে যে ফাতেমার চিকিৎসার সব খরচ সরকারই বহন করবে। আপাতত এক মাস তাকে ময়মনসিংয়ে রেখে চিকিৎসা করানো হবে বলেও স্থির হয়েছে।
এর পরই এখন নতুন করে আবার আশার আলো দেখছে ফাতেমার পরিবার। শেকল থেকে মুক্ত করে ফাতেমা-কে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে, তার আব্বু-আম্মু ও পরিবারের অন্যরাও সঙ্গেই আছেন।
অপু সরদারের কথায়, “এখন ও একটু ভাল আছে। একটু স্বাভাবিকই বলব আগের তুলনায়। আবার ওর ঠিকমতো চিকিৎসা হবে শুনে ফাতেমা যেন একটু ভরসাও পেয়েছে। হাসপাতালের বিছানায় শান্তভাবে শুয়ে আছে।”

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button