উপমহাদেশশিরোনাম

করোনা ভাইরাস: পশ্চিমবঙ্গের কনটেইনমেন্ট জোনে কড়া লকডাউন শুরু

করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের কনটেইনমেন্ট এলাকাগুলিতে আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছেন আপাতত সাতদিনের এই লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

নতুনভাবে লকডাউনে কনটেইনমেন্ট এলাকাগুলিতে মুদি, মাছ-মাংস, দুধ আর ওষুধের দোকান ছাড়া অন্য কোনও দোকান খোলা রাখতে দেওয়া হবে না বলে প্রশাসন নির্দেশ দিয়েছে।

ওই এলাকায় সরকারি, বেসরকারি অফিস, কলকারখানা, যানবাহন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে।

কাউকেই ওইসব এলাকা থেকে বাইরে বেরতে বা ওই এলাকাগুলোয় ঢুকতে দেওয়া হবে না।

লকডাউন শুরুর আগে থেকেই চিহ্নিত এলাকাগুলিকে বাঁশ বা ট্র্যাফিক পুলিশের গার্ডরেল দিয়ে ঘিরে দেওয়া হচ্ছে।

পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই কনটেইনমেন্ট এলাকাগুলিতে ঘুরছেন ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে।

দিন দুয়েক সময় দেওয়া হয়েছে কঠোর লকডাউন শুরুর আগে। সেই সময়ে পুলিশ ব্যাপকভাবে প্রচার চালিয়েছে কড়া লকডাউনের ব্যাপারে।

বাজার এলাকায় ঘুরেও পুলিশকর্মীদের প্রচার চালাতে দেখা গেছে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই। ঘিঞ্জি বাজারগুলোকে কাছাকাছি খোলা ময়দানে সরিয়েও দেওয়া হচ্ছে।

কলকাতা, হাওড়া আর উত্তর ২৪ পরগণা জেলা মিলিয়ে ১৭০ টিরও বেশি কনটেনমেন্ট জোন আপাতত ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি জেলাগুলিতে কনটেইনমেন্ট জোন চিহ্নিত করার কাজ এখনও চলছে।

কলকাতা শহরে ২৫টি কনটেইনমেন্ট এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রাজ্য সরকার যে তথ্য দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে কলকাতাতেই সবথেকে বেশি সংক্রমণ ছড়িয়েছে।

এই শহরে মোট করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা আট হাজার ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে বিগত ২৪ ঘন্টায় ৩৬৬ জনের দেহে সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

রাজ্য সচিবালয়ের সংবাদসম্মেলনে মমতা ব্যানার্জী - মার্চ ২০২০
মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বলেছেন কনটেনমেন্ট জোনে সাতদিনের এই লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।

এখনও পর্যন্ত কলকাতায় ৪৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কলকাতায় আক্রান্তের বেশিরভাগই বহুতল আবাসনে

কলকাতার কনটেইনমেন্ট জোনগুলির যে তালিকা সরকার প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মাত্র ৫টি বস্তি এলাকা, আর বাকি অঞ্চলগুলি হয় বহুতল বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়ি।

কলকাতা কর্পোরেশন বলছে শহরের সিংহভাগ করোনা আক্রান্তই পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাট বাড়ি অথবা বহুতল আবাসনগুলির বাসিন্দা।

কলকাতা কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক বোর্ডের সদস্য অতীন ঘোষ বলছিলেন, “আমরা ডোর-টু-ডোর যে সার্ভেইলান্স চালাচ্ছি, তা থেকে দেখা যাচ্ছে করোনা পজিটিভদের মধ্যে ৮৫% পাকা বাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি বা বহুতলগুলির বাসিন্দা।

”অন্যদিকে মাত্র ১৫% বস্তি এলাকার মানুষ। বস্তি এলাকায় একজন করোনা রোগী পাওয়া গেলে, তার দুই তিন মাসের মধ্যে নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে পাকাবাড়ি বা বহুতলে একজন রোগী পাওয়ার পরে তা দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে,” বলছেন অতীন ঘোষ।

মহামারি এবং ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই তথ্য বিস্ময়কর বলে মনে করছেন। কারণ বস্তি অঞ্চলের বাসিন্দারা সাধারণত ছোট ঘরে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকেন, সাধারণ বাথরুম ব্যবহার করেন। তাই সংক্রমণ তাদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাই বেশি থাকে। উল্টোদিকে পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দাদের পরিচ্ছন্নভাবে বসবাসের সুযোগ থাকে।

লকডাউনে কলকাতার রাস্তায় এক দরিদ্র ব্যক্তি
বস্তিবাসীরা সাধারণত বেশি সতর্ক বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছে কলকাতা পৌরসভা

তাদের সংগৃহীত তথ্যের ব্যাখ্যায় মি. ঘোষ বলছেন বস্তিবাসীরা এসব ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক বলেই তারা অতীতেও দেখেছেন।

“আমি দীর্ঘদিন কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে আছি। এর আগে ডেঙ্গির সময়েও দেখেছি, বস্তিবাসীরা যতটা সতর্ক থাকেন, আমাদের নিয়ম নির্দেশগুলি যতটা কঠোর ভাবে পালন করেন, আমাদের কর্মীদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন, সেটা কিন্তু বহুতল আবাসন বা ফ্ল্যাটবাড়ি বা পাকা বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকে আমরা পাই না। করোনার ক্ষেত্রেও তাই দেখছি,” বলছিলেন মি. ঘোষ।

“বস্তির মানুষদের মধ্যে করোনা রোগী পাওয়া গেলেই আমরা তাদের চিহ্নিত করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। রোগীদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের আমরা কোয়ারেন্টিন সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছি। অন্যদিকে যারা পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন, তাদের মধ্যে করোনা রোগী পাওয়া গেলে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে চান। বাড়িতে থাকলেও যে কড়া নিয়মের মধ্যে থাকা উচিত, সেগুলো তারা মানছেন না।”

তিনি বলছেন পাকাবাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে রোগী থাকা স্বত্ত্বেও তারা মাস্ক ছাড়াই থাকছেন এবং এর থেকেই এই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে রোগটা ছড়াচ্ছে বেশি।

কলকাতা কর্পোরেশনের এই যুক্তি যে সিংহভাগ করোনা আক্রান্ত উচ্চ বা মধ্যবিত্ত – এবং তারা পাকা বসতবাড়িতে থাকেন, তার উত্তরে মহামারি এবং ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ডা. অমিতাভ নন্দী বলছেন, বসতবাড়ি আর বস্তির মানুষদের মধ্যে করোনা পরীক্ষা কী সংখ্যায় হয়েছে, সেটার তুলনা দরকার।

“এই তথ্য কি কোনও বিজ্ঞানভিত্তিক সমীক্ষা করে পাওয়া গেছে? আমার তো মনে হয় না! আর যদি তথ্যটা আমরা ফেসভ্যালুতেও নিই, তারা যেটা বলছেন, সেটাই বিশ্লেষণ করি, তাহলেও কতগুলো প্রশ্ন থাকে। বস্তিবাসী আর বহুতল আবাসন বা পাকাবাড়িতে মোট কতজনের পরীক্ষা করা হচ্ছে? আর তার মধ্যে কত শতাংশ বস্তির মানুষ আর বহুতল ফ্ল্যাটের বাসিন্দার শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটার তুলনা করা যেতে পারে।

”দুই শ্রেণীর মানুষদের মধ্যে সমপরিমাণ পরীক্ষা করালে তবেই এধরনের তুলনা করা চলে। এরকম বিশ্লেষণ একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। কারণ বস্তিতে একটা ঘরে ৫-৭ বা দশ জন থাকেন, যেখানে ফ্ল্যাট বাড়ি বা আবাসনে হয়তো একেক জনের জন্য একটা করে ঘর বরাদ্দ থাকে,” বলছেন ডা. নন্দী।

ডা. নন্দী আরও বলছিলেন উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের মধ্যে যেহেতু সচেতনতা বেশি, তাই তারা নিজের উদ্যোগেই পরীক্ষা করাতে আসছেন। অন্যদিকে জ্বর বা কাশি – যেগুলো করোনার উপসর্গ, সেগুলো থাকা স্বত্ত্বেও বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের মানুষ নিজেরাই ওষুধ খেয়ে নিচ্ছেন।

কলকাতার কফি হাউসে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে ঢোকানো হচ্ছে- ২রা জুলাই ২০২০ 
কোন শ্রেণীর মানুষের কতটা করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে সেটা তুলনা করা দরকার বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিয়ান পাবলিক হেল্থ এসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ বলছিলেন, কোন শ্রেণীর মানুষের কতটা করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটা যেমন তুলনা করা দরকার, তেমনই এই বিচারটাও করা দরকার যে বসত বাড়ি আর বস্তিবাসী – এই দুই শ্রেণীর মানুষ কে কতটা টাকা দিয়ে নিজের থেকেই করোনা পরীক্ষা করাতে পারছেন।

“এটা দেখা দরকার যে কোন শ্রেণীর মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা নেওয়ার আর্থিক ক্ষমতা আছে। বস্তিবাসী আর পাকা বাড়ি বা আবাসনগুলির বাসিন্দাদের মধ্যে কার কতটা পরীক্ষা করানো হচ্ছে, বা কারা নিজেরাই পরীক্ষা করাতে সক্ষম – সেটাও বিচার্য। আপেল আর লেবু – দুটোর মধ্যে কী তুলনা চলে? যার যেটা মনে হচ্ছে বলে দিচ্ছেন।

“এই মহামারির সময়ে অনেকবারই আমরা এধরণের অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য বা তথ্য সামনে আসতে দেখেছি। এই জন্যই এক অদ্ভুতভাবে মহামারি মোকাবিলা করা হচ্ছে,” বলে অভিযোগ করেন ডা. ঘোষ।

ডা. ঘোষ আরও বলেন এরকম একটা তথ্য যদি দেওয়া হয় যে বস্তিবাসীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ কম হচ্ছে, তাহলে তারা একটা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়বেন, যে তাদের মধ্যে করোনা ছড়াবে না। আর তার ফলে তাদের সতর্ক হওয়ার মানসিকতাও কমে যাবে, যেটা বিপজ্জনক।

সুত্র : বিবিসি

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button