
কমিউনিস্ট নীতি ও কৌশল :
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বের মূল অংশ বা কেন্দ্রীয় কমিটি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি কমরেড অমল সেন নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অংশের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন। বাম-ডান বিচ্যুতি যে যাই করি না কেন ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের জন্য বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের ধারায় এগিয়ে যেতে পারবোÑএই ছিল বিশ্বাস। পার্টি ঐক্যের আগে যেসব মূল বিষয়ে আমরা ঐক্যমত হয়েছিলাম তা বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।
১. বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট বাস্তবতায় মার্কসবাদ লেনিনবাদের সৃজনশীল প্রয়োগ।
২. মার্কসবাদ লেনিনবাদ হবে পার্টির মতাদর্শগত ভিত্তি। কমরেড মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারা থেকেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে হবে।
৩. বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের বিকল্প শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
৪. শ্রেণী গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে ব্যাপকতর ঐক্যের লাইন অনুসরন করতে হবে।
৫. লেনিনীয় নীতিমালার ভিত্তিতে পার্টি গড়ে তুলতে হবে ও পার্টি পরিচালনা করতে হবে।
১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি অংশগ্রহণ করেছিল। এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিল। ফলে যে মতপার্থক্য ছিল তা ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ পার্টি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবেÑএটাই ছিল তখনকার দুই পার্টির সিদ্ধান্ত। বিশেষভাবে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ১৯৮৬ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৯৮৭ সালে এরশাদ সরকারের ৭ম সংশোধনীকে বিরোধিতা করার জন্য বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ এটাকে ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে নিয়েছিল। বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কমরেড অমল সেন এটাকে সঠিক মনে করেননি বিধায় একদিকে পার্টির সিদ্ধান্ত মেনেছেন। অন্যদিকে নড়াইল লোহাগড়ার ২নং আসনে শেখ হাফিজুর রহমানকে প্রার্থী করে ঘড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের মধ্যে আমরা যেমন নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করাকে যথার্থ মনে করতাম না কিন্তু বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের মধ্যেও কেউ কেউ নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের পক্ষে ছিলেন।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যশোর শহরের বেজপাড়ায়। এই সম্মেলনের ব্যবস্থাপনায় ছিল যশোর জেলা কমিটির নেতা কমরেড মাহবুব আলম। ওই সম্মেলনেই কমরেড অমল সেনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যদিও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের পক্ষ থেকে আমাকে সাধারণ সম্পাদক করার ব্যাপারে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল জোরে শোরে। আমি ওই প্রস্তাবকে তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছিলাম। সমঝোতা হয়েছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের ৬জন ও বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির ৩জনকে নিয়ে মোট ৯জনের পলিটব্যুরো গঠিত হবে। সেদিন যে উপলব্ধি থেকে কমরেড অমল সেনকে সাধারণ সম্পাদক করেছিলাম তার মূল দিক ছিল কমরেড অমল সেন মার্কসবাদী আদর্শে অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ চিন্তার যোগ্যতা রাখেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ। কমরেড অমল সেনের নেতৃত্বে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ বিপ্লবী শ্রেণীসংগ্রামের কাজকে ভিত্তিমূলক কাজ হিসাবে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। সেই সম্ভাবনাকে শেষ করে দেওয়া হলো কমরেড হায়দার আকবর খান রনো ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে একপার্টি গঠনের মধ্য দিয়ে। ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের পক্ষ থেকে ঐক্যের উদ্যোক্তা ছিলেন কমরেড টিপু বিশ্বাস, কমরেড আব্দুল মতিন (রাষ্ট্রভাষা), কমরেড আব্দুল মতিন মুনির, কমরেড শাহ আলম মোল্লা, কমরেড আনিসুর রহমান মল্লিক, কমরেড নুরুল হাসান, কমরেড ফজলে হোসেন বাদশা। কমরেড অমল সেন, কমরেড নজরুল ইসলাম, কমরেড সুশান্ত দাস ও আমিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কমরেড রাশেদ খান মেনন ও কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বে পরিচালিত ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে একপার্টি গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলাম। কমরেড আজিজুর রহমান ও বর্তমান বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের নেতা অধ্যাপক আব্দুস সাত্তারও ঐ ঐক্যের বিরুদ্ধে ছিলেন। শুধু তাই নয় ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে ঐক্যের আগে রাজবাড়ীতে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের বিশেষ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষ কংগ্রেসেও ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে ঐক্যের ব্যাপারে অনেকের তীব্র বিরোধিতা ছিল। কমরেড সত্যমৈত্রের সাথে কমরেড টিপু বিশ্বাসসহ অন্যদের তখন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরে শুনেছি কমরেড সত্যমৈত্রও এই ঐক্যের বিরুদ্ধে ছিলেন। উল্লিখিত ব্যাপারে জীবদ্দশায় অনেক মিথ্যাচার অসত্য কথা শুনি তাই প্রকৃত সত্য ঘটনা উল্লেখ করলাম। ক্ষতি-লাভের কোনো কিছুরই আর উপশম হবে না জেনে-শুনেই মিথ্যাচারের জবাবে ইতিহাসের অংশ হিসাবে উল্লেখ করছি। আমার ভুল যেমন অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে কখনোই আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বন করি না, মিথ্যার আশ্রয় নেই না তেমনি ভাবে কোনো মিথ্যাকে আশ্রয় প্রশ্রয় জীবনে দেইনি এবং এখনো দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই। নবম শ্রেণী থেকেই উপলব্ধি করতাম মিথ্যা, সম্পদ আভিজাত্য ও সম্প্রদায় আভিজাত্যের কাছে জীবনেও মাথা নত করবো না।
কমরেড অমল সেনের নিজহাতে গড়া লেনিনবাদী পার্টি ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টিতে আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় উপরে উল্লিখিত কমরেড অমল সেনের লেখা বিশ্বাস করেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োগের চেষ্টা করেন এমন কাউকে খুঁজে না পেয়ে হতবাক হয়েছি। আবারও উল্লেখ করছি কমরেড অমল সেন তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, “সাধারণত কমিউনিস্ট হয়ে উঠার ধারা দুইটি। একটি হচ্ছে, বাস্তব জীবনের তাগিদে শ্রেণী সংগ্রামে নেমে কমিউনিস্ট আদর্শ গ্রহণ করা এবং তাকে জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে কমিউনিস্ট হয়ে ওঠা। দ্বিতীয় ধারাটি হচ্ছে, প্রধানত: আদর্শের টানে (জীবনের বাস্তব কারণও অবশ্য থাকে) শ্রেণীসংগ্রাম ও অন্যান্য বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে কমিউনিস্টে পরিবর্তিত করে তোলা।”
(সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি, পৃষ্ঠা-১৩৪)
যেহেতু এ সংক্রান্ত অন্যান্য বক্তব্য উপরে উল্লেখ করেছি তাই সেসব বক্তব্য পুনরুল্লেখ করতে চাই না। ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে সম্পদ আভিজাত্য ও শ্রেণী আভিজাত্যের কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাফালা হয়ে যেত। কত সব প্রতিভাবান ব্যক্তি কতোই না ত্যাগ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন? উপরোক্ত লেখার ১৩৫ পৃষ্ঠায় কমরেড অমল সেন লিখেছেন,“তার কাছে (কমিউনিস্টের) পাপ-পূণ্য নেই, পরকাল নেই, পরজন্ম নেই, অথচ তার এইসবের চাইতে প্রিয় জীবনটি দিয়ে দেওয়ারও ঝুঁকি নিয়ে সে এগিয়ে চলে।” কিন্তু আমি তো অধিকাংশকে দেখলাম কমরেড অমল সেনের এসব চিন্তার ধারে কাছে (অতীতে কেউ থাকলেও) তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তাহলে আমার এ প্রশ্ন অতীতেও ছিল বর্তমানেও থাকছে। কমরেড অমল সেনের মার্কসবাদী তত্ত¡গত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে রচিত তাঁর চিন্তার অনুসারী হিসাবে বলিষ্ঠ কণ্ঠের দাবিদার যারা আছেন তারা কেন কমরেড অমল সেনের দৃষ্টিভঙ্গীতে পার্টি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছেন? অথবা এই মূল্যায়নে কী যাবো, তারা কমরেড অমল সেনের আদর্শবাদী চিন্তার ধারে কাছে কেউ নন? আমার সত্য বলতে দ্বিধা নেই আমি কমরেড অমল সেনের অনেক বক্তব্যকে অনেক ক্ষেত্রে বিলম্বে উপলব্ধি করেছি এখনো উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি।
চলবে/




