sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-১৫

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালে কমরেড অমল সেনের ভূমিকা :

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকবাহিনী বাঙ্গালি জাতি ও জনগণের উপর আক্রমণ শুরু করলে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী লেনিনবাদীর যশোর জেলা কমিটির সম্পাদক মÐলীর সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল :
১.পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোল।
২.গ্রামাঞ্চলে শ্রেণীশত্রু খতমের লাইনকে ত্বরান্বিত কর।
৩.মুক্তাঞ্চল গড়ে তোল।

সম্পাদক মÐলীর সভায় উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক কমরেড হেমন্ত সরকার, সম্পাদকমÐলীর সদস্য কমরেড সুধাংশু দে ও কমরেড শামসুর রহমান। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী লেনিনবাদীর কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মÐলীর ২রা এপ্রিলের সভায় প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল :
১.পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় প্রতিরোধ গড়ে তোল।
২.গ্রামাঞ্চলে পাক-বাহিনীর দালালদের খতম করে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তোল।
৩. পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোল।
৪. আওয়ামী লীগের সঙ্গে সাময়িক মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে তোল।
৫. পার্টির প্রভাবিত মুক্তাঞ্চল গড়ে তোল।
(উজান স্রোতের যাত্রী, বিমল বিশ^াস, ১৫৫ পৃষ্ঠা)

সম্পাদক মÐলীর সভায় উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, সম্পাদক মÐলীর সদস্য কমরেড তোয়াহা ও কমরেড আব্দুল হক। কেন্দ্রীয় সম্পাদক মÐলীর এই প্রস্তাব তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শৈলকুপা থানার ও ঢাকার শ্রমিক নেতা কমরেড হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে ৪ঠা এপ্রিল তারিখে যশোর জেলা কমিটির হাতে পৌঁছায় । মাগুরার তৎকালীন পার্টির নেতা অধ্যাপক কমরেড মো. মাহফুজুল হক নিরোর মাধ্যমে এই চিঠি পৌঁছেছিল তৎকালীন যশোর জেলা পার্টির হেডকোয়ার্টার নেতা কমরেড শামসুর রহমানের গ্রাম ঘোষগাতিতে। ১৯৭১ সালের ১১ই এপ্রিল তারিখে পুলুম থানার কাটি গ্রামে তৎকালীন পার্টি সদস্য কমরেড আবুল কালামের বাড়িতে জেলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই জেলা কমিটির সভায় কমরেড অমল সেনকে বিশেষ ভাবে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। জেলা কমিটির সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন কমরেড হেমন্ত সরকার, কমরেড সুধাংশু দে, কমরেড শামসুর রহমান, কমরেড খবির উদ্দীন ও আমি। বিশেষ ভাবে উপস্থিত ছিলেন কমরেড অমল সেন। জেলা কমিটির সদস্য কমরেড মহিউদ্দীন আলী আখতার অনুপস্থিত ছিলেন।

কমরেড অমল সেন অক্টোবর মাসে গ্রেফতারের আগে খুলনা জেলার কমরেড শচীন বসুকে শ্রেণীশত্রু খতমের লাইনের বিরুদ্ধে লেখা কমরেড অমল সেনের লিখিত বক্তব্যটি পাঠিয়েছিলেন। পুলুম পার্টি হেডকোয়ার্টার থেকে খুলনায় পার্টির ডাক ব্যবস্থা ছিল যথাক্রমে পুলুম, ডুমুরতলা (কখনো কখনো), গোবরা, অভয়নগর, ফুলতলার পাশে দামোদর গ্রমে প্রয়াত কমরেড কামরুজ্জামান লিচুর বাসায়। কমরেড শচীন বোসের সাথে কমরেড অমল সেনের সম্পর্ক ছিল সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগঠন অনুশীলন সমিতির সময়কাল থেকে। পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট পার্টির আমলেও কারাগারের বাইরে থাকাকালীন সময়ে কমরেড শচীন বোসের সাথে চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গী ও পদ্ধতিতে মিল ছিল এবং ছিল গভীর সম্পর্ক। কমরেড অমল সেনের কমরেড শচীন বোসকে পাঠানো এই চিঠি দামোদর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। গোবরা অঞ্চলে পার্টির এই যোগাযোগ রক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করতেন এগারোখানের বাকড়ি গ্রামের গোবরা পার্ব্বতী বিদ্যাপীঠের বিজ্ঞানের শিক্ষক কমরেড সন্তোষ মজুমদার। কমরেড সন্তোষ মজুমদার জেলা কমিটির সদস্য হিসাবে আমাকে ঐ চিঠি দিলে খাম না খুলেই আমি পাঠিয়ে দিলাম জেলা কমিটির সম্পাদক কমরেড হেমন্ত সরকারের কাছে। ১১ এপ্রিলের জেলা কমিটির সভায় তৎকালীন পরিস্থিতি ও করণীয় সম্পর্কে জেলা সম্পাদকমÐলীর তিন দফা প্রস্তাব ও কেন্দ্রীয় সম্পাদক মÐলীর পাঁচ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।

আমার যতদূর মনে পড়ে এসব আলোচনায় কমরেড অমল সেন নির্বাক ও নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি কেন পার্টি শৃঙ্খলার বাইরে পাশের জেলার কমরেড শচীন বোসকে কমরেড অমল সেনের কৌশলগত বক্তব্যের কপি পাঠালেন? এই আলোচ্যসূচি যখন আলোচনার জন্য উত্থাপন করা হলো তখনো কমরেড অমল সেন ছিলেন নিশ্চুপ। জেলা কমিটির অন্য সদস্যরাও কমরেড অমল সেনকে কেউ কোনো সমালোচনা করেননি। শুধুমাত্র কমরেড শামসুর রহমান বলেছিলেন কমরেড অমল সেনের কাছ থেকে এধরনের কাজ প্রত্যাশিত ছিল না। জেলা কমিটির ওই সভা থেকে কমরেড অমল সেনকে শালিখা থানার ছাবড়ি গ্রামে বিশ্রামের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখানে জেলা নেতৃবৃন্দের কারোরই কমরেড অমল সেনের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধার ঘাটতি আমি দেখি নাই। কমরেড অমল সেন ১৯৭১ সালের ১৩ই জুন তৎকালীন পার্টির কাউকে কিছু না জানিয়ে ভারতে চলে যান। এখানে এ বক্তব্য বলার বিশেষ কারণ হলো পরবর্তীতে এধরনের কথা শুনেছি ওই সভায় কমরেড অমল সেনকে সাংঘাতিক ভাবে হ্যাকল করা হয়েছিল। যা সত্যের ধারে কাছেও না। কমরেড অমল সেনের সাথে জেলা কমিটির নেতৃবৃন্দের চিন্তার মৌলিক তফাৎ হতে পারে কিন্তু কমরেড অমল সেনের প্রতি পরবর্তীতেও আমি কোনো অশ্রদ্ধার কথা নেতৃবৃন্দের কারোর কাছ থেকে কখনো শুনি নাই।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলতে হয়, ১৯৭২ সালে বাকড়ির কমরেড ভূষণ রায়ের বাড়িতে এক রাজনৈতিক আলোচনায় কমরেড জাকির হোসেন হবি বলেছিল কমরেড অমল সেন তো নয়া সংশোধনবাদী। কমরেড হেমন্ত সরকার কমরেড জাকির হোসেন হবিকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন, কমরেড অমল সেন বাসুদা’কে কী চেন? এসব কথা আমার সামনে কখনোই উচ্চারণ করো না।
১৩ই জুন কমরেড অমল সেন ভারতে চলে যাওয়ার খবরে এবং বিশেষ করে না বলে যাওয়ার জন্য মনে মনে বেশ কষ্ট পেয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের ৬ই নভেম্বর মহেশপুর থানার গরীবপুর বর্ডার পার হই। বীড়গ্রামের কমরেড বিষ্টু দর্জি আমাদের চারজনকে নিয়ে নদীয়া জেলার এক গ্রামে দরিদ্র এক পরিবারের বাড়িতে উঠেন। ভারতে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু পরামর্শই নয় উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন কমরেড বিষ্টু দর্জি। বিষ্টু দা’ আমাকে বলেছিলেন, কমিউনিস্ট আন্দোলনে যশোর জেলার কোনো বীজ রাখতে চাইলে আমার কথা শোন ও আমার সাথে চল্। যে বাড়িতে গিয়ে আমরা উঠলাম তাদের আন্তরিকতা ও আতিথেয়তার কোনো ঘাটতি ছিল না। ভাত আর মুলো ছেচকি খেয়েই আমরা দুইদিন ওই বাড়িতে ছিলাম। ৭ই নভেম্বর তারিখে কমরেড অমল সেন ওই বাড়িতে এসে হাজির। কিভাবে খবর পেলেন তা বলতে পারবো না। তিনি কিছু খোঁজ-খবর নিয়ে ও আমাদের কথাবার্তা শুনে চলে যান। আমরা চারজন ছিলাম কমরেড নুর মোহাম্মদ, কমরেড আবু বকর জাফরুদ্দৌলা দীপু, আমি ও শুধাংশু রায়। নদীয়া থেকে আমি ও নুর মোহাম্মদ ভাই পশ্চিম বাংলার কংগ্রেস নেতা প্রয়াত সৌমেন মিত্রের কাকা ডুন মিত্রের গড়িয়াহাটের বাসায় গিয়ে উঠলাম। ওই বাসায় যাওয়ার কারণ ছিল আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ডুন মিত্রের ছোট ভাই বিনয় মিত্র তাঁর পরিবারসহ ছিলেন। বিনয় মিত্রের মেজো ছেলে মিহির মিত্র, মেয়ে লতু, শীতু এরা ছিল পার্টির প্রতি সহানুভূতিশীল। আমাকেও যথেষ্ট মাত্রায় হৃদয় দিয়ে শ্রদ্ধা করতো। বিনয় মিত্রের বড় ছেলে অপূর্ব মিত্র ছিল আমার স্কুলজীবনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কমরেড আবু বকর জাফরুদ্দৌলা দীপু চলে যান নারিকেল ডাঙায় তার খালাতো বোনের বাসায়। কমরেড শুধাংশু রায় চলে যান তার শরণার্থী মা-বাবার কাছে।
চলবে/

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button