sliderমতামতশিরোনাম

কমরেড অমল সেন, তেভাগার লড়াই ও কমিউনিস্ট আন্দোলন : পরিচ্ছেদ-১১

বিমল বিশ্বাস

“সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি” অমল সেনের ভাবনা :

কমরেড অমল সেনের “সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও জনগণের বিকল্প শক্তি” বইয়ে যেভাবে উল্লেখ করেছেন তা নিম্নরূপ :

পূর্ব পাকিস্তান পার্টির প্রথম বিভক্তি :

(১) ১৯৪৭ সালের রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর ভারতীয় উপমহাদেশের মেহনতি মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি আনে। আবার সাম্প্রদায়িক দেশ বিভাগ জনগণের মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম মেহনতী মানুষের উপর, সাময়িকভাবে হলেও, সাম্প্রদায়িক ভাবধারার একটি বিজয় সৃষ্টি করতে পারে। ব্যাপক মুসলিম জনগণ পাকিস্তানকে তাদের নিজেদের সংগ্রামে অর্জিত মুসলমানদের মুক্তি অর্জনের রাষ্ট্র বলে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

জনগণের চেতনার এই নাজুক অবস্থায় যেখানে অতি সতর্ক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল, সেখানে ১৯৪৮ সালে পার্টি সংকীর্ণতাবাদী অতিবাম হঠকারী নীতি গ্রহণ করায়, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে এক বীভৎস বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। দমনের স্টীম রোলার চললো; এলাকাগুলি তছনছ হয়ে গেল; অনেক কর্মীর দীর্ঘ কারাবাস ঘটল। দেশ বিভাগ কালে পাকিস্তান অংশের পার্টির ক্যাডার ফোর্সের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আগত। এদের একটি বড় অংশ দেশ ত্যাগ করলেন। পার্টির একটি ক্ষীণ কাঠামো কোনক্রমে টিকে থাকলো।

চিত্রের অপর দিকটি হচ্ছেÑ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের, বিশেষ করে তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলন সৃষ্ট বিভ্রান্তি দ্রæত কেটে যেতে শুরু করে। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের চেতনা দ্রæত মাথা চাড়া দিতে থাকে। সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিজয় এবং ভারত উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐতিহ্যের প্রভাবে তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে ক্রমাগত ব্যাপক হারে মার্কসবাদের দিকে আকৃষ্ট হয়ে আসার ঘটনা।

কিন্তু এদিকে ১৯৪৮ সালের অতিবাম হঠকারী লাইনের প্রতিক্রিয়া হিসাবে পূর্বপাকিস্তান পার্টি নেতৃত্ব আত্মরক্ষার নামে গ্রহণ করেন দক্ষিণপন্থী লেজুড়বাদী এক লাইন। পার্টির স্বতন্ত্র একটি গোপন কাঠামো রইলো ঠিকই কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির নিজস্ব মৌলিক কাজ, শ্রেণীসংগ্রামের কাজ শিকেয় তোলা রইলো। বিরোধী পেটিবুর্জোয়া পার্টির অঙ্গীভূত থেকে কিছু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পূর্বে শ্রেণী সংগ্রামের কাজে হাত দেওয়া যাবে না এই হল যুক্তি।

বিপ্লবে আগ্রহী, মার্কসবাদের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপকভাবে পার্টির পতাকাতলে আসতে থাকলেন, কিন্তু তাদের শ্রেণী সংগ্রামে পোড় খেয়ে সত্যিকারের কমিউনিস্ট হয়ে উঠার ব্যাবস্থা থাকল না। ১৯৫৮ সাল নাগাদ এসে পার্টির চেহারা দাঁড়াল কর্মীদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ কমিউনিস্ট হয়ে উঠতে পারেন নি। একটি কমিউনিস্ট পার্টি বিচ্যুতির মধ্যে পড়তে পারে, দক্ষিণপন্থী লেজুড়বাদী বিচ্যুতির মধ্যে দু’এক বছর কাটালেও তার কমিউনিস্ট চরিত্র মৌলিকভাবে খোয়া নাও যেতে পারে। কিন্তু দশককাল ধরে অব্যাহতভাবে এই বিচ্যুতির মধ্যে থাকা এবং যে সময়কালেই সৃষ্টি হয়েছে পার্টির ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ সভ্য সংখ্যা, তার পক্ষে মৌলিক কমিউনিস্ট চরিত্র অক্ষুণœ রাখা কঠিন।

(২) পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই অবস্থার পটভূমিতে এলো সোভিয়েত পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেস। এই কংগ্রেসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়ে সংশোধনবাদী বিচ্যুতি সম্পন্ন লাইন গ্রহণ করা হল। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রের শক্তি এবং সা¤্রাজ্যবাদের শক্তির মধ্যকার অনুপাত এমন জায়গায় পৌঁছেছে যখন পশ্চাৎপদ দেশগুলির বিপ্লবের চরিত্র হবে “জাতীয় গণতান্ত্রিক” এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সহযোগিতায় ও জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণীর যৌথ নেতৃত্বে (হেজিমনিতে) শান্তিপূর্ণভাবে অ-ধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব হবে।

গণচীনের কমিউনিস্ট পার্টি সোভিয়েত পার্টির এই বক্তব্যকে সংশোধনবাদী বলে আখ্যায়িত করে। পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের একাংশ সোভিয়েত পার্টির এই বক্তব্যকে লুফে নেন। অপর অংশ চীনা পার্টি বক্তব্যের সঙ্গে সায় মিলিয়ে একে সংশোধনবাদী বলে বিরোধিতা করেন।

এই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে তখন স্বাভাবিক কারণেই মধ্যবিত্ত সুলভ মানসিকতার প্রাবল্য ছিল। আর তার ফলশ্রæতিতে পার্টির মধ্যে উপদলীয় ঝোঁকও উপস্থিত হয়েছিল। সবমিলিয়ে ১৯৬৬ সালে পার্টির একটি অংশ সংশোধনবাদ বিরোধী অবস্থান ঘোষণা করে বিচ্ছিন্ন হয়ে এসে স্বতন্ত্র পার্টি গঠন করেন। দেখা গেল এই বিভক্তির ব্যাপারে সংশোধনবাদ, এবং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট বহিঃপ্রকাশ (গধহরভবংঃধঃরড়হ) গুলিকে চিহ্নিত করা এবং তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ব্যাপার নিয়ে কোন নীতিগত সংগ্রামের কিছুই হলো না। যারা বেরিয়ে এলেন তাদের সমগ্র র‌্যাঙ্ককে সংশোধনবাদ এবং তাকে কীভাবে সংগ্রাম করতে হবে তার সম্পর্কে সচেতন ও শিক্ষিত করে তোলার কোন কাজই হল না। ফলে নিজেরাই সংশোধনবাদী খাদে পিছলে পড়বার বাস্তবতায় রয়ে গেলেন। শুধু মস্কোপন্থীদের বিরুদ্ধে চীনপন্থী হিসাবে অবস্থান গ্রহণ করাই হল মাত্র। আর একটি মাত্র বুঝই গোটা র‌্যাঙ্কের মধ্যে চালু হল যে মস্কোপন্থীরা বিপ্লব চায় না, আমাদের চীনপন্থীদের সশস্ত্র বিপ্লব করতে হবে। এই বিভক্তির ব্যাপারে উপদলীয় মানসিকতাও কাজ করেছে, এটাও অস্বীকার করা যায় না।

(৩) এই পার্টি বিভক্তির ব্যাপার নিয়ে একটি কথা ওঠে যে পার্টি ভাগ না করে পার্টির ভিতর থেকেই নীতিগত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়াই কমিউনিস্ট সাংগঠনিক রীতিসম্মত ছিল। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা না মানা ঠিক হয়নি। আমরা মনে করি কমিউনিস্ট পার্টি আদর্শভিত্তিক পার্টি। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শ ও বিপ্লবী উদ্দেশ্যই এর ভিত্তি। এবং এই ভিত্তি থাকে বলেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা থাকে। পার্টির একটি অংশ যখন মনে করতে থাকে যে অন্য অংশ মার্কসবাদ পরিত্যাগ করেছে, বিপ্লবের পথ ত্যাগ করেছে তখন আর সেই পার্টির গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা মানার জন্য দাবী করার ভিত্তি থাকে না। এই সঙ্গে অবশ্য আমরা এই হুঁশিয়ারীও রাখতে চাই, যে এই ধরনের মৌলিক এবং ভিত্তিমূলক বিষয়ের ক্ষেত্রে ছাড়া, অন্যান্য বিষয়ে মতবিরোধ হলেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে না মানার ঝোঁক সুনিশ্চিতভাবেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ বিরোধী। আমাদের আলোচ্য এই ক্ষেত্রে, যে মৌলিক বিষয় নিয়ে বিরোধ সেই ধরনের মতবিরোধ নিয়ে এক পার্টি কাঠামো গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার দোহাই দিয়ে টিকে থাকতে পারার কথা নয়। এখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র পার্টি করার ব্যাপারে সমালোচনার যদি কিছু থাকে তবে তা অন্যত্র। বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে প্রয়োজনীয় ব্যাপকতায় এবং গভীরতায় নীতিগত সংগ্রাম হয়নি। বাস্তব কার্যক্রমে এসে কোথায় কী পার্থক্য দাঁড়াবে তার কোন ধারণার মধ্যে যাওয়া হয়নি। তাই পার্টির মধ্যে যে মেরুকরণ হল তার ভিত্তি গভীর উপলব্ধি থেকে ততটা নয়। উপদলীয় এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ হওয়ার মানসিকতাও কাজ করেছে ঐ মেরুকরণের ব্যাপারে।

এই প্রসঙ্গে একটি জিনিস আমাদের লক্ষ্য এড়ায়নি। বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র পার্টি যারা গঠন করতে যাচ্ছিলেন তাদের প্রতি যারা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা মানার দাবী জানাচ্ছিলেন তাদের উপলব্ধিতে ছিল গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা এক ধরনের যান্ত্রিক শৃঙ্খলা। অন্যদিকে যারা বেরিয়ে এসে স্বতন্ত্র পার্টি করলেন-তারাও, এটা যে কেন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে ভঙ্গ করা হচ্ছে না-তার যথাযথ বিচার করেননি। ফলে তাদের মধ্যেও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতি যে কি অপরিসীম গুরুত্বপূর্র্ণ, ছুতা-নাতা যেকোন অজুহাতে এটা ভঙ্গ করার মত জিনিস নয়, এর প্রতি হেলা-ফেলার মানসিকতা নিয়ে যে কোন বিপ্লবী পার্টি গড়া যায় না, সেই উপলব্ধির ঘাটতি থেকে গেল। এর ফলে পরবর্তীতে যে পার্টি গঠিত হল তাতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাও সঠিকভাবে অনুশীলন করা হয় নাই। তার পরিণতি সবারই জানা।
উপরোক্ত বক্তব্য থেকে নি¤েœ উল্লিখিত শিক্ষা পাই।

১. কমরেড অমল সেন বৃটিশ সা¤্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রমূলক ভারত বিভক্তিকে কখনোই নীতিগত ভাবে মেনে নেননি।

২. সা¤্রাজ্যবাদ ও ভারতের শাসকগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া কৃত্রিম পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে মেনে নেওয়াকে সঠিক মনে করেননি। ভারতের হিন্দু জমিদার ও জোৎদারগোষ্ঠীর মুসলিমসহ নি¤œবর্ণের হিন্দুদের উপর শোষণ নির্যাতনের বর্বরতা থেকে মুসলিম সম্প্রদায়কে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাকেও গুরুত্বহীন মনে করেননি। মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি আলাদা রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম ও সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে কমরেড অমল সেন কৌশলগত ভাবে মেনে নিতে চেয়েছেন।

৩.কমরেড অমল সেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিকে ভেঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গঠনকে প্রথম বিভক্তি বলে উল্লেখ করেছেন যা তাৎপর্যপূর্ণ।

৪. পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে বা যারা নৈতিক ভাবে ভারত বিভক্তিকে মেনে নিয়েছিলেন তারা সাম্প্রদায়িক ও কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের কথা ভাবতে পারেননি।

৫. ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী অংশগ্রহণের কথা অনেকে আগে ভাবতে না পারলেও কোনো কোনো কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু নীতিগত ভাবে যেসকল কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা পাকিস্তানকে মেনে নিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নেতিবাচক ভূমিকা নিয়েছিলেন। যদিও তার মধ্যেও বৃহত্তর যশোর, বৃহত্তর নোয়াখালীসহ কিছু কিছু জেলা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোচিত লড়াই করেছেন।

৬. কমরেড অমল সেন স্পষ্টভাবে বলেছেন ১৯৪৮ সালে বাম হঠকারী লাইন অনুসরণ ও প্রয়োগের ফলে সীমাহীন নির্যাতন নিপীড়ন নেমে এসেছিল। তার প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন পার্টি গ্রহণ করেছিল বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির লাইন। যদিও পার্টির স্বতন্ত্র একটি গোপন কাঠামো রাখা হলো।

৭. এই একই সময়ে বাংলা ভাষার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙ্গালি জাতি ও জনগণ রুখে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে প্রকৃত শিক্ষা না নিতে পারার কারণেই আওয়ামী মুসলিম লীগের মধ্যে কাজ করা, বুর্জোয়া দলের মধ্যে কাজ করা এইসব চিন্তায় পার্টির নেতৃত্ব ভেসে গেলেন।

৮. ১৯৫৬ সালে কলকাতা পার্টি সম্মেলনে বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির লাইন আওয়ামী মুসলিম লীগের মধ্যে কাজ করার কৌশল পার্টি গ্রহণ করে। যদিও ওই সম্মেলনে কমরেড কুমার মৈত্র, কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা, কমরেড দেবেন শিকদার, কমরেড সত্যমৈত্রসহ অনেকেই বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তির লাইনকে তীব্র ভাবে বিরোধিতা করেছিলেন। শত্রুর আক্রমণের মুখে অথবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে কাজ করা, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে কাজ করার লেজুড়বৃত্তির অতীতের যে কৌশল তা থেকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি চিন্তা ও চর্চার ক্ষেত্রে বেরিয়ে আসতে পারে না। কমিউনিস্ট পার্টির মৌলিক কাজ শ্রেণীসংগ্রামের ভিত্তিমূলক কাজকে প্রাধান্য দিয়ে নিজস্ব শক্তি গড়ে তোলবার যে মার্কসবাদী কৌশল গ্রহণ করা উচিৎ ছিল সে পথে পার্টি যেতে পারেনি বিধায় ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এসবের মধ্য দিয়ে পার্টিতে ছাত্র, যুবক কর্মীদের যে সমাবেশ ঘটেছিল সেখানে পার্টি শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছাত্র-যুব শক্তিকে প্রকৃত কমিউনিস্ট হিসাবে গড়ে তোলার কাজটি করতে পারেনি।

১৯৫৬ সালে কলকাতা সম্মেলনে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড অজয় ঘোষ সম্মেলনে প্রবেশ করলেন জিন্নাহ টুপি মাথায় দিয়ে ও সম্বোধন করলেন আ¯øামালাইকুম বলে। কমিউনিস্টরা একে অপরকে লাল সালাম দেওয়ার যে আদর্শগত সম্বোধন ছিল সেখানেও কমরেড অজয় ঘোষ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেন। যা আমার জীবনেও দেখলাম ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় কমরেড রাশেদ খান মেনন ও কেউ কেউ আ¯øামালাইকুম বলে সম্বোধন করা শুরু করলেন। এমনকি সিপিবির কোনো কোনো নেতাকেও এই ধরনের সম্বোধন করতে দেখেছি। একসময়ে এটা হয়ে দাঁড়ালো কমিউনিস্টদের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি। সাধারণ জনগণের মধ্যে আ¯øামাআলাইকুম সংস্কৃতি কোনো অবস্থাতেই ভুল কিছু নয়। কলকাতা সম্মেলনের প্রতিনিধি কমরেড আব্দুল মতিন (রাষ্ট্রভাষা) ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড অজয় ঘোষের এই আচরণের কথা ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ ও ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় বহুবার বলেছেন।

৯. উল্লেখ্য কমরেড অজয় ঘোষ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। ক্রুশ্চেভের দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদী লাইন থেকে সম্ভবত কমরেড অজয় ঘোষ এই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।
চলবে/১২

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button