আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

ইসরায়েলে ‘শান্তির মরূদ্যানে’র ভবিষ্যৎ কী?

ইসরায়েলে ইহুদি এবং আরবদের মধ্যে সন্দেহ, বিভেদ, শত্রুতা দুর করার লক্ষ্য নিয়ে ব্যতিক্রমী এক জনবসতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল এবং তেল আবিবের মাঝামাঝি একটি জায়গায় এক পাহাড়ের ওপর এই গ্রামের পত্তন করেছিল চারটি ইহুদি এবং আরব পরিবার।

নামকরণ করা হয়েছিল – হিব্রুতে ‘নেভি শালোম’ আর আরবিতে ‘ওয়াহাত আল সালাম।’ বাংলায় যার অর্থ – শান্তির মরূদ্যান।

চল্লিশ বছর পর বিবিসির মাইক ল্যানচিন গিয়েছিলেন ঐ বসতিতে। এর প্রতিষ্ঠা, এর অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন ঐ জনপদের প্রথম প্রজন্মের দুই বাসিন্দার সাথে। তাদের একজন ইসরায়েলি ইহুদি- নাভা সোনেনশাইন; অন্যজন ফিলিস্তিনি আরব -দাউদ বুলোশ।

১৯৭৮ সালের শেষ দিকে এই বসতির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন নাভা সোনেনশাইন। সে সময়কার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “এই পাহাড়ে তখন কোনো গাছ ছিলনা। পানি সরবরাহ ছিলনা। কোনা পাকা রাস্তা ছিলনা। কিন্তু যেটা আমাদের ছিল তা হলো – বিশাল এক স্বপ্ন”।

নাভা সোনেনশাইনের পরিবার ছিল এই বসতির প্রথম ইহুদি বাসিন্দা। তারা এসেছিলেন হাইফা শহর থেকে। “যদিও হাইফা ইহুদি ও আরবদের একটি মিশ্র শহর, কিন্তু কোনো আরব পরিবারের সাথে সেখানে আমাদের যোগাযোগ ছিলনা…বিকল্প একটি জীবন যাপন করতে চাইছিলাম আমরা যেখানে একটি জায়গায় ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করবে।”

আরো বেশ পরে আসেন ফিলিস্তিনি আরব দাউদ বুলোশ, তার স্ত্রী রিটাকে নিয়ে।

“ইসরায়েলে বেশ কিছু শহর আছে যেখানে আরব এবং ইহুদিরা পাশাপাশি থাকে। সুতরাং সেই অর্থে একদম নতুন কিছু আবিষ্কার করা হয়নি এখানে । তবে এখানে যেটা আলাদা তা হলো এই গ্রামে আমরা সবাই স্বেচ্ছায় এসেছি।”

ইসরায়েলে ‘শান্তির মরূদ্যানে’র ভবিষ্যৎ কী? শুনুন প্রতিবেদন।

খ্রিষ্টান এক পাদ্রির স্বপ্ন ছিল এই শান্তির মরূদ্যান

ইসরায়েলে এই মিশ্র বসতি তৈরির প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত এক খ্রিষ্টান পাদরি – ফাদার ব্রুনো হুসা। তিনি ১৯৫০ এর দশকে ইসরায়েলে আসেন। তিনি ইসরায়েলের নানা ধর্মের লোকজনের সহাবস্থানের স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্ন থেকেই নেভি শালোম নামে এই মিশ্র বসতি গড়ার সিদ্ধান্ত।

১৯৯২ সালে তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন তার স্বপ্নের বসতির আদর্শ – “..এখানে যারা থাকবে তারা নিজেদের বদলাবে না। যারা খ্রিষ্টান তারা খ্রিষ্টানই থাকবে, যারা ইহুদি তারা ইহুদি থাকবে, মুসলিম যারা তারা মুসলিম থাকবে, কিন্তু তারা পরস্পরকে বোঝার চেষ্টা করবে, সম্মান করবে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা।”

ফাদার ব্রুনোর এই আদর্শিক প্রকল্পে প্রথম যে কজন যোগ দিয়েছিলেন তাদের একজন ছিলেন সাবেক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা ওয়েলেসলি এ্যারন। ৮০ বছর বয়সে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে তিনি ঐ কম্যূনিটিতে বসবাস করতে চলে এসেছিলেন।

“আমি তেল আবিবে খুবই সুন্দর একটি এপার্টমেন্টে থাকতাম। আমি যখন বললাম আমি নাভি শালোমে চলে যাবো, সবাই বললো – তোমার কি মাথা খারাপ হলো। আমি বললাম – আসলেই হয়েছে, আমি যাচ্ছি, তোমরা আমার সাথে দেখা করতে যেও। অমি অনেক আরাম আয়েশ ত্যাগ করেছিলাম, কিন্তু বদলে পেয়েছিলাম আত্মতৃপ্তি।”

মি. এ্যারনের মতো তাকেও তার প্রতিবেশী ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকেও তাকে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল দাউদ বুলোশকেও।

“আমি শান্তির অন্বেষায় এখানে চলে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি তো আমার অতীত পুরোপুরি ফেলে আসতে পারিনি। আমার পরিবারের অধিকাংশই লেবাননে থাকে। কারণ তাদের সম্পত্তি, বাড়িঘর বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছিল ইসরায়েলি সরকার। এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনির মতো তারাও শরণার্থী হয়ে দেশ ছেড়েছিলো।”

এই বসতির ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের প্রায় সবারই একই কাহিনী। তবে সেই ট্রাজেডি তারা শান্তির জন্য কাজে লাগান। আর সেজন্য নাভি শালোমে বসবাসের অভিজ্ঞতা বাইরের লোকজনের কাছে প্রচার শুরু হয়, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ইহুদি ও আরবদের।

আরব ও ইহুদি তরুণদের একসাথে এনে ওয়ার্কশপ করানো হয় যাতে তারা পরস্পরকে চিনতে পারেআরব ও ইহুদি তরুণদের একসাথে এনে ওয়ার্কশপ করানো হয় যাতে তারা পরস্পরকে চিনতে পারে

দুই ভিন গ্রহের মানুষকে কাছে আনার প্রয়াস

৮০’র দশকে দুই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার কিশোর তরুণদের এখানে এনে রেখে কয়েকদিনের জন্য ওয়ার্কশপ করা হয়েছে যাতে তারা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করতে পারে।

নাভা সোনেনশাইন বলেন, “তাদের মধ্যে অধিকাংশই আগে কখনই একে অন্যের সাথে মেশেনি। আমরা সেই সুযোগ সৃষ্টি করতাম।”

মি দাউদ অবশ্য স্বীকার করেন, মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ। “তাদের মধ্যে বিভেদটা বিশাল, দুই সম্প্রদায় যেন দুই ভিন্ন গ্রহের মানুষ।”

কিন্তু ইসারায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সহিংসতা কখনই শেষ হয়নি। গাজার যুদ্ধ, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বা ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা – এসব ঘটনা নাভি শালোম গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

বিশেষ করে ১৯৯৭ সালে লেবানন যুদ্ধের সময় এই গ্রামে বড় হওয়া ২০ বছরের ইহুদি যুবক টম কিডাইনের মৃত্যুর ঘটনা সেখানে বেশ বিভেদ তৈরি করেছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।

স্মৃতিচারণ করছিলেন দাউদ বুলোশ, “পুরো গ্রামই শোকগ্রস্ত পরিবারটির পাশে ছিল। তারপর গ্রামে ঐ তরুণের একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির প্রস্তাব এলো। তখনই শুরু হলো সঙ্কট। আমার পক্ষেও সেটা গ্রহণ করা কষ্ট ছিল। আমি টমের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছিলাম কারণ আমি তাকে দেখেছি একজন মানুষ হিসাবে, আমার প্রতিবেশী হিসাবে, বন্ধু হিসাবে। কিন্তু একজন ইসরায়েলি সৈনিক হিসাবে তাকে নায়কের মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগে আমার আপত্তি ছিল।”

অনেক ফিলিস্তিনি বাসিন্দারই আপত্তি ছিল।

নাভা সোনেনশাইনও বললেন, এই বসতির জন্য সেটি একটি কঠিন সময় ছিল। “আমরা নিজেরা বসে অনেক অনেক আলোচনা করেছি। পরে সিদ্ধান্ত হলো বাস্কেটবল ইয়ার্ডে টমের স্মরণে একটি ফলক বসানো হবে যেখানে লেখা থাকবে – টম যুদ্ধে মারা গেছে।”

ফিলিস্তিনি-ইসরায়েল সংঘাত থামার কোনো ইঙ্গিতই নেইফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত থামার কোনো ইঙ্গিতই নেই

চার থেকে ৬০ পরিবার

গত ৪০ বছরে হাজার হাজার ইহুদি এবং আরব এই গ্রামের শান্তি ওয়ার্কশপে অংশ নিয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৬০টি পরিবার বসবাস করছে। আরও অনেকে আসতে উদগ্রীব।

কিন্তু ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের যখন কোনো লক্ষণই এখন আর চোখে পড়ছে না, তাদের এই শান্তির মরূদ্যানের ভবিষ্যৎ কী?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে নাভা সোনেনশাইন বললেন, একসাথে বসবাসের জন্য রাস্তা খুঁজে বের করতেই হবে। “এটা যে সম্ভব প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা তো তা করে দেখাচ্ছি।”

প্রায়ই একই উত্তর ছিল তার ফিলিস্তিনি প্রতিবেশী দাউদ বুলোশের। “আমি আমার বাপ-দাদাদের মত বলতে চাইনা যে আমার জীবদ্দশায় কিছুই হবেনা। শান্তির আশা করা ছাড়া আমার সামনে কোনো বিকল্প নেই।” বিবিসি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button