আন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

ইরানে করোনায় এত মৃত্যু কেন?

রাফসান গালিব : করোনাভাইরাস সংক্রমিত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। দেশটিতে এর মধ্যে মারা গেছে এক হাজার ৬৫৮ জন মানুষ।
সম্প্রতি ইরানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি দশ মিনিটি একজন করে ইরানি মারা যাচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় আক্রান্ত হচ্ছে অন্তত ৫০ জন।
এখন পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ৬৩৮ জন। তবে ইরানিদের মধ্যে প্রবল ধারণা, শুরু থেকেই দেশটির সরকার করোনা সংক্রমণ নিয়ে জনগণকে সঠিক ধারণা দিচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহলও।
করোনা নিয়ে সরকারের রাজনীতি
ইরানের সরকার শুরু থেকেই এই সংক্রমণের মাত্রা অস্বীকার করে আসছে বলে দাবি করেন দেশটির সরকারের সমালোচকেরা।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার ঘোষণা দেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই, এটা নিয়ে ইরানের শত্রুরা বাড়িয়ে বলছে।’
এক সপ্তাহ পরে ইরানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে যখন, তখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী হাসান রুহানি একই কথা আবারও বলেন।
করোনাভাইরাসকে তিনি আখ্যা দেন, ‘এটা ষড়যন্ত্র ও শত্রুদের ভীতি দেখানোর একটা কৌশল।’
তিনি বলেন, ‘দেশটিকে স্থবির করতে এই নকশা করা হয়েছে। ইরানিদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করার পরামর্শ দেন তিনি।’
সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয় করোনাভাইরাস হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ‘জৈব অস্ত্র’।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তার টুইটে লেখেন, ‘বায়োলজিক্যাল অ্যাটাক।’
সরকার তথ্য গোপন করছে
বিবিসির কাছে চিকিৎসকের অভিযোগ, আনুষ্ঠানিক যে সংখ্যা সরকার বলছে তা বাস্তবের চেয়ে অনেক কম।
একজন চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ রোগী আসছে। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই করোনায় আক্রান্ত। কিন্তু আমাদের যথেষ্ট উপকরণ নেই, তাই যাদের অবস্থা খুব খারাপ তাদেরই আমরা আমলে নিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘গেল দুই সপ্তাহে দিনে পাঁচজন রোগী মারা গেছেন।’
অনেক সময় এমনও হয়েছে যতক্ষণে করোনাভাইরাস পরীক্ষার যন্ত্র এসেছে ততক্ষণে রোগী মারা গেছেন।
সংক্রমণের পর ইরানে অনেক চিকিৎসক টানা কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের একজন মোহাম্মদ। তিনি উত্তর প্রদেশের গিলানের একটি হাসপাতালে কাজ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কত মানুষ মারা গেছে কিন্তু সরকার নিশ্চিতভাবেই এই সংকটের মাত্রা কমিয়ে বলছে। তারা সংক্রমণের শুরু থেকেই মিথ্যা বলছে।’
মেডিকেল কর্মীও কম মারা যায়নি এই ঘটনায়। মেডিকেলে কাজ করা অনেক কর্মী বলছেন, ‘আমরা আমাদের বহু সহকর্মী হারিয়েছি।’
এর মধ্যে একটি ঘটনা হৃদয়বিদারক। নার্জেস খানালিজাদি ২৫ বছর বয়সী একজন নার্স, তিনি ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মারা যান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সরকার এটা স্বীকার করেনি যে, তিনি কভিড-১৯ এ মারা যান।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সবসময়ই দেখাতে থাকে যে সাহসী একদল মেডিকেল কর্মী সহজেই কাজ করে যাচ্ছে এবং তারা ভাইরাসের সঙ্গে লড়াই করে রোগীদের বাঁচাচ্ছে।
কিন্তু ইরানের নার্সিং সংস্থা এটা নিশ্চিত করেছে যে করোনাভাইরাসের ফলেই নার্জেসের মৃত্যুর হয়।
মারা যাচ্ছেন চিকিৎসকেরা, আছে সরকারি চাপও
মোহাম্মদ জানান, তার সহকর্মীরা মারা গেছেন, তার বন্ধুরা মারা গেছেন এবং ১৪ দিনেও নিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়নি তার। এমনকি তার মেডিকেল স্কুলের সাবেক শিক্ষকও করোনাভাইরাসের একজন ভুক্তভোগী।
এই চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, করোনাভাইরাস শুধু নির্দিষ্ট কোনো হাসপাতাল না বরং পুরো ব্যবস্থাকে স্থবির করে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কর্মীদের উদ্যম কমতির দিকে, পরিবার চিন্তিত এবং আমাদের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।’
ইরানে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দিলে তার ফলাফল হিসেবে গ্রেপ্তার পর্যন্ত হতে পারেন মোহাম্মদ, তাই তার পুরো নাম ও পরিচয় গোপন রাখা হয়।
চিকিৎসা সামগ্রীর সংকট
উত্তরাঞ্চলীয় আরো অনেক চিকিৎসক বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন এবং তারা তাদের শোচনীয় অবস্থার বর্ণনা দিয়েছে। তারা মনে করেন যে, সরকার খুব খারাপ পন্থায় এই সংকট মোকাবিলা করেছে।
মোহাম্মদ বলছেন, ‘আমাদের মেডিকেলের কর্মীরা প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, আমাদের পর্যাপ্ত মাস্ক নেই।’
গিলান, গোলেস্তান এবং মাজারদার্ন ইরানের তিনটি সবচেয়ে সংকটময় প্রদেশ। এসব জায়গার চিকিৎসকেরা বিবিসিকে জানান, করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট এবং অন্যান্য মেডিকেল সামগ্রী খুবই সীমিত সংখ্যায় দেয়া হয়েছে। সাধারণ ওষুধ, অক্সিজেন ট্যাংক, মাস্ক এবং রক্ষাকারী গ্লাভসও সংখ্যায় কম সেখানে।
চিকিৎসকেরা বাধ্য হয়ে অস্থায়ী হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়েছেন।
একজন চিকিৎসক বিবিসিকে বর্ণনা দিয়েছেন কীভাবে এলাকার একটি ফুটবল স্টেডিয়াম বিছানা দিয়ে ঝটপট তৈরি করা হয়েছে রোগী সামাল দিতে।
করোনার কেন্দ্র যখন পবিত্র নগরী কোম
সরকার বলছে ১৯ ফেব্রুয়ারি দু’জন ‘পেশেন্ট জিরো’ ছিল, যাদের একজন কোম শহরে মারা যান।
‘পেশেন্ট জিরো’ হচ্ছে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত একটি কোড। যা কোনো এলাকার বা দেশের প্রথম রোগীকে বোঝানো হয়।
১৯ ফেব্রুয়ারি যিনি মারা যান তিনি একজন ব্যবসায়ী এবং চীন থেকে আসেন।
কোম শহরটি দ্রুতই ভাইরাসের কেন্দ্রে পরিণত হয়। শিয়া মুসলিমদের জন্য কোমের আলাদা তাৎপর্য আছে। দেশটির উচ্চ সারির ইসলামিক নেতাদের জন্য এই জায়গাটা তীর্থস্থান।
এখানে ২ কোটি ঘরোয়া ও ২৫ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক আসেন। অনেক ধর্মীয় স্থান আছে এখানে যা ধর্মপ্রাণ মানুষেরা সম্মান দেখানোর জন্য চুমু খান ও স্পর্শ করে থাকেন। এখান থেকে দ্রুত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এই শহরটিতে কোনো কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা না নিয়ে ধর্মীয় গুরুরা আরো বেশি মানুষকে আমন্ত্রণ জানান। এখানে আসলে রোগ দূর হবে বলেও তারা জানান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি কার্য পরিচালনা বিভাগের পরিচালক রিচার্ড ব্রেনান ইরান ঘুরে এসে জানান, কোম শহরের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ইরানের ভেতর ও বাইরের বহু মানুষ এখানে যাওয়া আসা করছে। এভাবে দ্রুত পুরো ইরানে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে।
রিচার্ড ব্রেনান বলেন, ‘কোম ও তেহরানে পরীক্ষাগার ও হাসপাতালে বাড়তি উদ্যোগ দেখেছেন তিনি। এখন কোম শহরের সকল মাজার বন্ধ আছে।’
ইরানে ফেব্রুয়ারি মাসে দুটো বড় ঘটনা ঘটে যায়। একটি ইসলামিক অভ্যুত্থানের ৪১ বছর পূর্তি অন্যটি দেশটির সংসদ নির্বাচন।
রাজনৈতিক সংকটে ব্যতিব্যস্ত সরকার
১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিজয় দিবস। এর কিছুদিন আগেই ইরানে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
তেহরানের একজন সিনিয়র চিকিৎসক এ কথা বলেন। তারা তখন দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ইরানের সরকার করোনাভাইরাসের বিষয়টি লুকোতে চেয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় নানা জমায়েত চালিয়ে যেতে চেয়েছে।’
ইরানে ছয় মাস ধরে চলে আসা নানা ঘটনাপ্রবাহের ফলে এই ইসলামিক অভ্যুত্থানের পূর্তি এবং নির্বাচন ছিল সরকারের জন্য পরীক্ষা।
নভেম্বরে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে আন্দোলন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন, মার্কিন হামলায় জেনারেল কাশেম সোলায়মানির মৃত্যু- এসব ঘটনা দেশটির সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।
এরপর আবার ভুলবশত ইউক্রেনের একটি বিমান বিধ্বস্ত করে দেয় ইরান। যেখানে ১৭৬ জন যাত্রী মারা যান এবং ইরানের সরকার প্রথমে এই মিসাইল হামলার কথা অস্বীকার করে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খোমেনী বলেন, ‘ভাইরাসের কথা বলে দেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এটা একটা প্রোপাগান্ডা।’
সম্প্রতি ইরানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাইদ নামাকি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমানোর কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আমরা জানাই দেশে করোনাভাইরাস ধরা পড়েছে। ২১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এটা জেনেও।’
নির্বাচনের পাঁচ দিনের মাথায় ইরানের মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ জনে, ১৩৯ জনের করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়।
কোম শহরের একজন সংসদ সদস্য একই দিনে বলেন, ‘আমাদের শহরে গত দুই সপ্তাহে ৫০ জন মারা গেছে।’
ইরানের ডেপুটি স্বাস্থ্য মন্ত্রী ইরাজ হারিরচি তৎক্ষণাৎ এই দাবি অস্বীকার করেন এবং সেদিন বিকেলেই একটি সংবাদ সম্মেলনে তাকে ঘামতে ও কাশি দিতে দেখা যায়।
পরবর্তীতে তার করোনাভাইরাস ধরা পড়ে এবং ইরানের আরো অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম সংক্রমিত হন।
এরপর পার্লামেন্টের ২৩ এমপি আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ পায়। শীর্ষ নেতার এক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাসহ মারা যান কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও।
বিবিসির পারস্য বিভাগের তদন্তে জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট দিনে যে পরিমাণ মানুষ মারা গেছে বলে সরকার বলছে তার তুলনায় সংখ্যা ছয়গুণ বেশি।
কিন্তু এখন যখন আনুষ্ঠানিক সংখ্যাও বাড়ছে, তখন ইরানিদের প্রশ্ন, কী করে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থামানো যায়। এর মধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জরুরি স্বাস্থ্য সামগ্রীও পাচ্ছে না ইরান। এতে করোনা মোকাবিলায় আরও বেশি সংকট তৈরি হয়েছে।
ইরান থেকে দেশে দেশে সংক্রমণ
ইরানের ৩১টি প্রদেশে কোভিড-১৯ ছড়াতে সময় নিয়েছে মাত্র ১৬ দিন। ১৬টি দেশ দাবি করেছে তারা এমন ব্যক্তি পেয়েছে যার ভাইরাস সংক্রমণ ইরানে হয়েছিল।
ইরাক, আফগানিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, লেবানন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, পাকিস্তান, জর্জিয়া, এস্তোনিয়া, নিউজিল্যান্ড, বেলারুশ, আজারবাইজান, কাতার ও আর্মেনিয়া এই দাবি করেছে।
এর মধ্যে দেশগুলো ইরানের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি, বিবিসি বাংলা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button