ইতালির তিন শহর মৃত্যুপুরী
‘এখানে কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছ কি। চুপ করো… চুপ করো’
উদ্ধারকারীদের একজন সঙ্গীদের উদ্দেশে বললেন। মৃত্যুপুরীতে তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে; কিন্তু উদ্ধারকারীদের তৎপরতা থেমে নেই। প্রতি মুহূর্তে জীবনের সন্ধানে নিরলস কাজ করছেন তারা। আগের রাতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেছে ইতালির মধ্যাঞ্চলীয় তিনটি ছোট শহর। ২০ সেকেন্ড স্থায়ী ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে শহরগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুপুরীতে। পেসকারা দেল ট্রন্টো শহরের একটি গ্রামে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে একদল উদ্ধারকারী ধ্বংসস্তুপের নিচে খুঁজে পায় একটি দশ বছরের মেয়েকে।
কয়েক মুহূর্ত পর আরেকজন উদ্ধারকর্মী বললেন, ‘বের হয়ে এসো গিউলিয়া। গিউলিয়া এসো। তোমার মাথা দেখতে পাচ্ছি।’ একপর্যায়ে দীর্ঘ চেষ্টা সফলতার মুখ দেখল। ১৭ ঘণ্টা পর মৃত্যু গহ্বর থেকে বের হয়ে এলো ছোট্ট মেয়ে গিউলিয়া। একজন আবারো ‘সে বেঁচে আছে’ বলে চিৎকার করে উঠল। আশপাশের কয়েকজন এই হৃদায়বিদরক অবস্থার মধ্যেও মৃদু উল্লাস করে উঠল। দ্রুত মেয়েটিকে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে নিয়ে গেল কয়েকজন।
বুধবার স্থানীয় সময় রাত ৩.৩৬টায় ভূমিকম্প আঘাত হানে ইতালির মধ্যাঞ্চলে। আর পরদিন রাত সাড়ে ৮টায় উদ্ধার হয় গিউলিয়া। তাকে উদ্ধারের পর উদ্ধারকর্মী ও নিখোঁজ লোকদের স্বজনেরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধে। ইট-পাথরের নিচে আরো অনেককে জীবিত পাওয়ার স্বপ্ন দেখে তারা। নিখোঁজ লোকদের স্বজনরা ভিড় করে উদ্ধারকর্মীদের আশপাশে। অনেককে দেখা যায় নিজে আহত হয়েও যেন ভুলে গেছে চিকিৎসা নিতে। ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনগুলোর কাছে, আশা একটিই যদি পরিবারের প্রিয়মুখগুলোকে জীবিত পাওয়া যায়।
গিউলিয়ার ছোট বোন, নয় বছরের গিওরজিয়াকেও খুঁজে পান উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু তার দেহ ছিল নিথর। পাশেই আরেকটি বাড়ি থেকে দুই বালিকা ও তাদের দাদীর লাশ উদ্ধার করা হয়। আরেকটি বাড়ির নিচ থেকে ‘বাঁচাও… বাঁচাও’ বলে এক শিশুর চিৎকার ভেসে আসতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে দুর্বল হয়ে আসে তার কণ্ঠস্বর। উদ্ধারকর্মীরা ইট-পাথর সরিয়ে যখন তার কাছে পৌঁছায়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ১১ বছরের শিশুটি চলে গেছে মৃত্যুর ওপারে।
একই এলাকায় সাত বছর বয়সী সিমনকে মারাত্মক আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও তার যমজ ভাই আন্দ্রেকে পাওয়া গেল লাশ হিসেবে। একটি বাড়ি থেকে দুই কিশোর ভাইয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়ির পাশে গির্জার টাওয়ার ভেঙে পড়ে অন্যদের সাথে নিহত হয়েছে তারা।
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প থেকে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে তিগ্রস্তদের বেশির ভাগই শিশু। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বুধবার সার দিন অভিযানের পর বৃহস্পতিবারও চলমান রয়েছে উদ্ধারতৎপরতা। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের মতো ধ্বংসস্তুপের নিচে জীবিতদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন কয়েক হাজার উদ্ধারকারী। যন্ত্রপাতির পাশাপাশি অনেকে খালি হাতেও চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারতৎপরতা। শক্তিশালী আফটার শকের কারণে উদ্ধারতৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। সরকারি সূত্রে নিহতের সংখ্যা ২৪৭ বলে জানানো হয়েছে।
সূত্র : আইরিশ মিরর ও ডেইলি মেইল।



