আমরা তোমাদের থেকে ঠিক কয়েক কদম এগিয়ে আছি, ঠিক যেভাবে উহান আমাদের থেকে কয়েক দিন এগিয়ে ছিলো। আমরা ঠিক যে আচরণ করেছিলাম, আমি দেখতে পাচ্ছি তোমরাও একই আচরণ করছ, “ও কিছু না, এটা ঠাণ্ডা-জ্বরের মতোই, সেরে যাবে আপনাতেই।”
তোমরা এখন ঘরে আটকে থেকে হয়তো জর্জ অরওয়েল কিংবা হবসের থিওরি নিয়ে পড়ে আছো। হয়তো ভাবছো এই বন্দিদশা আসলে সরকারের চালমাত্র। কিন্তু বিশ্বাস করো, আর কয়েকদিন পর তোমরা এগুলো ভাবারও কোনরূপ অবকাশ পাবে না।
তোমরা খাওয়া-দাওয়া নিয়ে চিন্তা করবে, নেটফ্লিক্স নিয়ে চিন্তা করবে, হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতে একে অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করবে, কীভাবে এই লকডাউনের সময় কাটানো যায়। ঠিক এর কিছুদিন পর তোমাদের কাছে এগুলো সব অর্থহীন লাগবে। তুমি বুকশেলফ থেকে কোনো অ্যাপোক্যালিপ্টিক বা ডিস্টোপিয়ান বই নিয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝতে পারবে তোমার আসলে ওসব পড়ার দরকার নেই। কারণ, তুমি সেরকম একটা জগতে ইতিমধ্যেই বাস করা শুরু করেছো।
তোমরা যারা পরিবার থেকে দূরে আছো, তোমরা যে কোনো কিছুর বিনিময়ে চাইবে প্রিয়জনের সঙ্গে হয়তো একটা শেষ আলিঙ্গন করতে। কিংবা বহুবছর অভিমানে কথা না বলা মানুষগুলোকে ফোন দিয়ে দেখবে তারা আদৌ বেঁচে আছে কিনা।
ঘরে থেকে তোমার ওজন বাড়বে হয়তো। তুমি অনলাইনে ফিটনেসের একগাদা মডিউল নিয়ে বসবে। সুপারশপে যাওয়ার বাহানায় তুমি একা বের হয়ে একটু দেখতে চাইবে তোমার মতো অন্য কোনো মানুষকে। তোমার মানুষের হট্টগোল, চেঁচামেচি শুনতে ভীষণ মন চাইবে কিন্তু তুমি পারবে না।
এরকম সময়ে তুমি আরও ভালোমতো মানুষ চিনতে শুরু করবে। মানুষের প্রকৃত রূপ দেখে তুমি আতঙ্কিত হবে। আবার যাকে কোনোদিন কল্পনাও করোনি সে তোমাকে সাহায্য করতে ছুটে আসতে চাইবে।
মানুষের অনুপস্থিতিতে প্রকৃতি হয়তো আরোগ্য লাভ করবে-তুমি দেখবে, কিন্তু তারপর তুমি ভাববে প্রকৃতি আরোগ্য লাভ করলে আমার কি? আমার বাজার খরচটা কে দেবে এখন?
ঘরের ভেতরে থেকে তোমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে। তোমরা ভাববে এই লকডাউন শেষ হলেই ডিভোর্সের জন্য আবেদন করবো। আবার অনেকে নতুন জীবন আনবে এই পৃথিবীতে… সদ্য ভূমিষ্ট সেই শিশুর দিকে তাকিয়ে তোমরা অনেকেই আবারও অপরাধবোধে তাড়িত হবে, কেনো এরকম একটা পৃথিবীতে তাকে আনলে।
তোমরা ভাববে এই অসুখ ধনী-গরীব মানছে না। তবুও দেখবে বিশাল লনওয়ালা ডুপ্লেক্স বাড়ির লকডাউন আর জীর্ণ বস্তির লকডাউন কখনোই এক না।
আমরা ইতালিতে আছি। তোমাদের থেকে মাত্র কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক দিনের ভবিষ্যতে। দূর ভবিষ্যতে কী হবে তোমরা যেমন জানো না, আমরাও জানি না।
তবে একটা জিনিস আমি জানি। আমি জানি, একদিন যখন এই বিভীষিকা শেষ হয়ে যাবে। তখন কোনো কিছুই আর আগের মতো থাকবে না-রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, সম্পর্ক, সৃষ্টি সব সবকিছু আবার নতুন করে সংজ্ঞায়িত হবে।
(ইতালির প্রখ্যাত সাহিত্যিক ফ্রান্সেস্কা মেলান্দ্রি তিন সপ্তাহ ধরে লকডাউনে রয়েছেন। তিনি তার ইউরোপীয় বন্ধুদের জন্য চিঠিটি লিখেছেন)
অনুবাদ করেছেন- আরাফাত মোহাম্মদ নোমান
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)
পূর্বপশ্চিম




