sliderস্থানিয়

আন্দোলনের ফসল ব্রাকসু এখন প্রশাসনিক ব্যর্থতার বলি

রতন রায়হান, রংপুর: দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের দাবি, আন্দোলন, মানববন্ধন ও অনশন শেষে যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তা এখন প্রশাসনিক অদক্ষতা, সিদ্ধান্তহীনতা ও দায়িত্বহীনতায় চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বারবার তফসিল পরিবর্তন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের একের পর এক পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনের কার্যত অচল অবস্থার কারণে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া আজ গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত। শিক্ষার্থীদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে গত ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে শিক্ষার্থী সংসদ যুক্ত হলেও বাস্তবায়নের পথে শুরু থেকেই প্রশাসনের অস্পষ্টতা ও গড়িমসি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৬তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে ছয় সদস্যবিশিষ্ট ব্রাকসুর প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু কমিশন ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগে নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এই অপ্রত্যাশিত পদত্যাগ প্রশাসনের প্রস্তুতি ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় মহলে। পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১১৭তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। তবে কমিশন পুনর্গঠনের পরও কার্যত কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়তে থাকে। নিরুপায় হয়ে শিক্ষার্থীরা আবার রাজপথে নামলে প্রশাসন চাপের মুখে পড়ে।

‎শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে ২৯ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে প্রথম তফসিল প্রকাশ করে। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে ২০ নভেম্বর সেই তারিখ পরিবর্তন করে ২৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করে দ্বিতীয় তফসিল প্রকাশ করা হয়। এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ও প্রার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। এরপর ২৫ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান প্রথমবারের মতো পদত্যাগপত্র জমা দেন। যদিও প্রশাসনের অনুরোধে তিনি পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে এই ঘটনাই কমিশনের স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। সব নাটকীয়তার পর ১ ডিসেম্বর বিকেলে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় অসংগতি দেখিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে।শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা কমিশনের মৌলিক দায়িত্ব হলেও সেটিকে অজুহাত বানিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের চাপে ৩ ডিসেম্বর রাতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী সংশোধিত তৃতীয় তফসিল ঘোষণা করা হয়। এই তফসিল অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন, ডোপ টেস্ট রিপোর্ট সংগ্রহসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। ক্যাম্পাসে নির্বাচনী আমেজ ফিরতে শুরু করে। কিন্তু নাটকীয়ভাবে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন ৯ ডিসেম্বর কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কমিশনের কোনো সদস্যকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।প্রার্থীরা দিনভর অপেক্ষা করেও মনোনয়নপত্র জমা দিতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন এরপর ১০ ডিসেম্বর রাতে আবারও তফসিল পরিবর্তন করে ২৪ ডিসেম্বরের পরিবর্তে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে চতুর্থ তফসিল প্রকাশ করা হয়। এর পরদিন ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. শাহজামান দ্বিতীয়বারের মতো পদত্যাগপত্র জমা দেন। এতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্বশেষ তফসিল অনুযায়ী ১৩ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। রাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ব্যতীত বাকি পাঁচ কমিশনারের স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের লিখিত নির্দেশনা বা দায়িত্ব অর্পণ ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রম আইনসম্মত নয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের বিষয়টি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পেরেছি। এখন পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর।”

‎এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলেন, “তিনবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ আর চারবার তফসিল পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশাসন নিজেদেরকে সার্কাসে পরিণত করেছে। একটি সাধারণ ব্রাকসু নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা যদি প্রশাসনের না থাকে, তবে তারা কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করছে এটাই এখন বড় প্রশ্ন।” এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেন বারবার পদত্যাগ করছেন, সেটি আমার নিজেরও প্রশ্ন। পদত্যাগ যেন খেলায় পরিণত হয়েছে। আমরা শিক্ষক, আমাদের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের পাশে থাকা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে আমরা প্রস্তুত।” এক দশকের বেশি সময় ধরে আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত ব্রাকসু নির্বাচনের অধিকার আজ প্রশাসনিক ব্যর্থতায় হুমকির মুখে। শিক্ষার্থীরা দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় আরও কঠোর আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button