sliderস্থানিয়

আতঙ্কে পাহাড়ি মানুষ খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে আসছে বুনোহাতির পাল

মিজানুর রহমান, শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুরের ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী লোকালয়ে ইতঃপূর্বে রাতে বন্যহাতির পাল তাণ্ডব চালালেও এখন দিনেও চালাচ্ছে তান্ডব! ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পাহাড়ি বিপুল সংখ্যক হতদরিদ্র মানুষ! অবশ্য বন্যহাতির তাণ্ডব বাড়ে আড়াই যুগ আগে বন কেটে বনায়নের পর থেকেই।

জানা যায়, প্রাকৃতিক বন কেটে বিদেশি কাঠ গাছের বনায়ন করায় বন্যহাতি হাড়ায় আশ্রয়স্থল। তারপর থেকেই বন হারিয়ে বন্যহাতি রাত করে আসা শুরু করে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে। ইদানীং দিন রাত অবিরাম তাণ্ডব চালাচ্ছে লোকালয়ে। মূলতঃ খাদ্যের সন্ধানেই রাত দিন ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্য হাতির পাল। অপরদিকে প্রতি দিন বন্যহাতি দেখতে সীমান্তঘেঁষা পাহড়ি গ্রামগুলোয় দিনের বেলায় উৎসুক জনতা ভিড় জমাচ্ছে। ফলে বাড়ছে প্রাণহানির আশঙ্কা! তবে উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলা হচ্ছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয়রা জানান, গত রবিবার রাত থেকে ঝিনাইগাতীতে বন্যহাতির পাল ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের সন্ধ্যাকুড়া, হলদিগ্রাম, গুমড়া, রাংটিয়া এবং কাংশা ইউনিয়নের ছোট গজনী,বড় গজনী, তাওয়াকুচা গারো পাহাড়ে কমপক্ষে ৩০-৪০টির হাতির পাল রাত দিন অবস্থান করছে। হাতির পাল অবশ্য দিনের বেলায় শস্য ক্ষেতের পাশাপাশি পাহাড়ে অবস্থান করে। আবার সুযোগ পেলেই দিনেই সবজি ক্ষেতে তাণ্ডব চালাচ্ছে।

আবার রাতে খাদ্যের সন্ধানে পাহাড়ের বিভিন্ন টিলায় ঘোরাঘুরি খাদ্যের সন্ধানে বিকেলেই হাতির পাল লোকালয়ে নেমে আসছে। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় গ্রামবাসী রাতে মশাল জ্বালিয়ে হইহুল্লোড় করে বা পটকা ফুটিয়ে হাতির পালকে পাহাড় জঙ্গলে ফেরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।

বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্য হাতির একটি পাল সন্ধ্যাকুড়া এলাকার গোলাপ, আকাশমনি কাঠের বাগান ও বিভিন্ন সবজি খেতে অবস্থান করতে দেখা যায়। পাশাপাশি এলাকাবাসী ও উৎসুক জনতাও ভিড় করেছেন। হাতি তাড়াতে রাতে মানুষ হইহুল্লোড় করছেন। এসময় বন্য হাতির পাল ধান ও বিভিন্ন সবজির খেত পা দিয়ে মাড়িয়ে লন্ডভন্ড করে ফেলছে।

সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের কৃষক দেলোয়ার বলেন, বুধবার রাতে বন্য হাতির পাল আমার ২৫ শতাংশ ধানের জমি পা দিয়ে পিষে নষ্ট করেছে। আমি অসহায় দরিদ্র মানুষ! অতিকষ্টে সংসার চালাই। হাতির অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছি আমরা।

গুমড়া গ্রামের আদর্শ কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আব্দুল কাদের ও সাব্বির বলেন, হাতি আমাদের সবজি ক্ষেতের বরবটি ও বেগুনের খেত ক্রমাগত নষ্ট করেই চলেছে। আমরা এখন খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। ছোট-বড় হাতি সবারই ফসল ক্ষতি করেই চলেছে! বন্যহাতির তান্ডব থেকে রক্ষা পেতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এই সব অসহায় কৃষকরা।

নলকুড়া-গোমড়া গ্রামের কৃষক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পাহাড়গুলোতে বন্যহাতির খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবের কারণেই হাতির পাল লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। প্রতিদিন খাবারের সন্ধানেই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে। মানুষের ফসলের ক্ষেত ও ঘরবাড়িসহ নানা ক্ষয়ক্ষতি করছে। কয়েক দিন যাবৎ আমরা পাহাড়ি মানুষ হাতি আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। হাতি তার স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হারিয়ে মানুষের বসবাড়ি ও ফসলের ক্ষেতেই খাবার খোঁজে। এই প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতার জন্য দায়ী মূলত সরকার ও আমরাই। তবে গারো পাহাড়ে হাতির এই অত্যাচার আজ নতুন নয়। দীর্ঘ দিনের সমস্যা। তাই এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জ অফিসার আব্দুল করিম প্রতিনিধি কে বলেন, হাতির খাবারের জন্য সুফল বাগান তৈরি হয়েছে। সেখানে লতা-পাতা রয়েছে। হাতি সে সব খাচ্ছে। পাশাপাশি চলতি মাসে গারো পাহাড়ের প্রতিটি বিটে ২ হাজার করে কলাগাছ রোপণের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কলাগাছ বড় হলে খাবারের সংকট অনেকটাই কমবে। বনবিভাগ ও ইআরটি হাতিকে পাহাড়ের জঙ্গলে ফেরাতে সার্বক্ষণিক চেষ্টা করছেন।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, মূলত খাদ্যের সন্ধানে বন্যহাতির পাল লোকালয়ে চলে আসে। সীমান্তের পাহাড়ে বন্যহাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারলে। আমার বিশ্বাস বন্যহাতি আর লোকালয়ে আসবে না। উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে বলে আসছি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button