sliderস্থানিয়

আজ বাসন্তী পূজার বিজয়াদশমী

স্বীকৃতি বিশ্বাস, যশোর: সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে বাসন্তী পূজা পালন করা হয়। সকল বাধাবিঘ্ন দূর করে নিজের পরিবার-দেশেরসহ বিশ্বের শান্তি কামনায়। পূজার কয়েকটি দিন আত্মীয় পরিজনসহ সামাজিক মেলবন্ধনের সৃষ্টি হয়। পূজার শেষে যেমন মায়ের বিদায় ঘটবে তেমনি আপনজনও প্রয়োজনের তাগিদে যে যার কর্মস্থলে ফিরে যাবে।এই উভয়ের বিদায়ের সুরে পরিবেশ ভারী হয়ে আসে।

আজ ২৮ মার্চ ২০২৬, শনিবার—চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথি। আজকের দিনটিই মূলত বাসন্তী দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমী। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন পঞ্জিকা অনুযায়ী আজকে
*দশমী তিথি সমাপ্ত হবে সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে এবং আজ সকালেই দেবীর দশমী বিহিত পূজা সমাপন এবং বিসর্জন প্রশস্ত। দশমী তিথি থাকাকালীনই দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

শাস্ত্র মতে, দেবীর বাহন নির্ধারণ করে আগামী বছরের শুভ-অশুভ ইঙ্গিত দেওয়া হয়। আজ শনিবার দশমী হওয়ায় দেবীর গমন হচ্ছে ঘোটকে (ঘোড়ায়)। শাস্ত্রে বলা হয়েছে- “ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে”। অর্থাৎ, ঘোড়ায় গমনের ফলে সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিশৃঙ্খলার একটি আশঙ্কা থেকে যায়। এবার দেবীর আগমন হয়েছিল নৌকায়, যার ফল হলো শস্যবৃদ্ধি ও সুবৃষ্টি।

শারদীয়া দুর্গোৎসবের মতো বাসন্তী পূজাতেও বিজয়া দশমীর আচারগুলো একইভাবে পালিত হয়।
অপরাজিতা পূজা: বিজয়া দশমীর অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো অপরাজিতা পূজা। এটি মূলত জয়ের কামনায় করা হয়।

সিঁদুর খেলা: সধবা মহিলারা দেবীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে এবং একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে উৎসব উদযাপন করেন।এটি স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনার প্রতীক।

শান্তিজল ও কোলাকুলি: বিসর্জনের পর বড়দের প্রণাম করা এবং ছোটদের আশীর্বাদ করার মাধ্যমে ভাতৃত্বের মেলবন্ধন তৈরি হয়।এটি সমাজে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেয়। তাই ঘরে ঘরে নাড়ু ও মিষ্টিমুখের রেওয়াজ আজও অমলিন।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য প্রথম এই বসন্তকালেই দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। তাই শাস্ত্রীয়ভাবে এটিই দেবীর ‘আদি দুর্গাপূজা’। শ্রীরামচন্দ্র অকালে (শরৎকালে) দেবীকে বোধন করেছিলেন বলে শারদীয়া পূজাকে ‘অকালবোধন’ বলা হয়, কিন্তু আদি পূজা হিসেবে বাসন্তী পূজার গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু আজ সকালেই দশমী তিথি সমাপ্ত হচ্ছে, তাই অধিকাংশ মন্দিরে বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা দুপুরের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার কথা।
বাসন্তী পূজার বিজয়া দশমী কেবল একটি উৎসবের সমাপ্তি নয়, বরং এটি শক্তির আরাধনার এক পূর্ণতা এবং মর্ত্যলোক থেকে দেবীর কৈলাসে প্রত্যাবর্তনের এক আবেগঘন মুহূর্ত।

অশুভ শক্তির বিনাশ ও জয়ের প্রতীক’বিজয়া’ শব্দের অর্থ হলো জয়। পুরাণে বর্ণিত আছে, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তি মহিষাসুরকে বধ করে সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন। বাসন্তী পূজা হলো জগতের আদি পূজা, যা রাজা সুরথ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পেতে বসন্তকালে করেছিলেন। তাই বিজয়া দশমী হলো সত্যের জয় এবং অন্যায়ের পরাজয়ের একটি চিরন্তন স্মারক।

মর্ত্যলোক থেকে বিদায় ও কৈলাসে প্রত্যাবর্তন হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা তাঁর সন্তানদের নিয়ে প্রতি বছর বাপের বাড়িতে (মর্ত্যলোকে) আসেন। বিজয়া দশমীর দিনটি হলো তাঁর শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ শিবের আলয় কৈলাসে ফিরে যাওয়ার দিন। এই বিদায়বেলা ভক্তদের মনে একদিকে যেমন বিষাদ আনে, অন্যদিকে আগামী বছর দেবীর পুনরায় আগমনের আশার সঞ্চার করে।

বিজয়া দশমীর ভূমিকা কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামাজিক মেলবন্ধনেরও এক বড় মাধ্যম।

আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে, বিজয়া দশমী আমাদের শেখায় যে জীবন পরিবর্তনশীল। আগমন এবং গমনের এই চক্রই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের ভেতরে থাকা কাম, ক্রোধ, লোভ ও মোহ নামক ‘অসুর’দের বিনাশ করে অন্তরে দেবীরূপী শুভ চেতনার জাগরণ ঘটানোই হলো এই বিজয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য।
বাসন্তী পূজার বিজয়া দশমী হলো দুঃখ ভুলে নতুনের আহ্বানে এগিয়ে যাওয়ার দিন। এটি ত্যাগের মাধ্যমে প্রাপ্তির আনন্দ এবং বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পুনরায় আবাহনের প্রস্তুতি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button