sliderবিবিধশিরোনাম

আজ প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ৯২তম জন্মদিন

৯১তম বছর পার করে ৯২তম বছর শুরু করলেন। প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, জন্মদিনে শুভকামনা রইল। সুস্থ থাকুন সবসময় এই কামনা করি।
খুলনা শহরের উপকন্ঠে দৌলতপুর গ্রামে জন্ম ১৯৩১ সালের ৩১ জুলাই। শৈশবকালেই মেধাবিত্বের পরিচয় মেলে। আজীবন স্কুলশিক্ষক গণিতে অতিশয় পারদর্শী দরিদ্র পিতার সার্বক্ষনিক তত্ত্ববধানে লালিত হয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। ১৯৪৬ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক, ১৯৪৮ সালে ব্রজলাল একাডেমীতে ৩টি লেটারসহ আইএসসি, ১৯৫০ সালে বিএসসি পাস কোর্সে distinction IEB লাভ ও শিক্ষা বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান দখল করেন। ১৯৫০ সালে আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে পুরকৌশল বিভাগে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাশ করেন ও (৭৫% এর অধিক মার্ক পাওয়ার দুরুন) অনার্স এবং গোল্ডমেডাল লাভ করেন। পেশাগত জীবনে প্রথমে চাকুরী ও নির্মাণ সংস্থায় কাজ করার পর ১৯৬৪ সাল থেকে উপদেষ্টা প্রকৌশল সেবা দান করে আসছেন। প্রকৌশলী হিসাবে অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৯২ সালে ওঊই স্বর্ণপদকে ভূষিত হ’ন।
দেশপ্রেমিক সমাজকর্মী হিসাবে দেশের তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ রক্ষায় গত দেড় দশক ধরে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ : সফল মানুষের প্রতিকৃতি
প্রকৌশল বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া বা প্রকৌশল পেশায় খ্যাতিমান হওয়া খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু পেশাগত ক্রিয়াকলাপের বাইরে নিজেকে আপামর জনসাধারণের সারিতে দাঁড় করিয়ে, শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াকু সৈনিক হিসেবে জীবনব্যাপী দূরপাল্লার দৌড়বিদ হওয়াটা কষ্টসাধ্য।
পেশাগত সততা, ব্যক্তিগত জীবনের নীতি-নৈতিকতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সমাজ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা-সর্বোপরি দেশমাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা যাঁকে অনন্য অসাধারণ করেছে তিনি প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। যে কেউ প্রকৌশলী হতে পারে কিন্তু প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হয়ে উঠতে পারে না। কেননা সুবিধা-সম্ভাবনার দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে জীবনব্যাপী সৎ ও প্রজ্ঞাবান থাকাটা দুরুহ ব্যাপার এবং দৃঢ় মনোবলের পরিচায়ক। জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, অবহেলা উপেক্ষা করে তিনি আজ সমাজে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সাফল্য আজ তাঁর পদতলে কিন্তু তা অর্জিত হয়েছে অনেক শ্রম, ত্যাগ এবং সংগ্রামের বিনিময়ে।
১৯৩১ সালের ৩১ জুলাই খুলনার শিল্পনগরী (তখন পল্লীগ্রাম) দৌলতপুরের এক শিক্ষানুরাগী নিন্ম মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পিতা শেখ মুহাম্মদ হানিফ পেশায় শিক্ষক। দৌলতপুরের স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ মুহসিন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। মা মরিয়ম খাতুন, গৃহিনী। ছয় ভাই এক বোনের বিশাল পরিবার। ভাই-বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। দৌলতপুর বণিকপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। প্রাথমিক শেষ করে ভর্তি হন পিতার আজীবন কর্মস্থল মুহসিন উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৪৬ সালে মাত্র ১৪ বছর ৭ মাস বয়সে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আরবীতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন ব্রজলাল একাডেমি (বি এল কলেজ) থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পূর্বপাকিস্তান বোর্ডে আইএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১৯তম স্থান অধিকার করনে। ১৯৫০ সাালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে ডিসটিংশনসহ বিএসসি পাস কোর্সে উত্তীর্ণ হন। বিএসসি পাস কোর্সে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান বোর্ডে দ্বিতীয় স্থান অধিকার কারেন। ওই বছরই তিনি আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারি কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং ভর্তিপরীক্ষায় প্রথমস্থান অধিকার করেন। এই কারণে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তাঁকে মাসিক ২৫ টাকা মেরিট স্কলারশিপ দেয়। এছাড়া সৈয়দপুর মহসিন এস্টেট খুলনার মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করতো, তিনি সেখান থেকেও মাসে ২৫ টাকা বৃত্তি পেতেন। ইঞ্জিনিয়ারিং চূড়ান্ত পরীক্ষায় শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ শতকরা ৭৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক প্রকৌশল ডিগ্রী অর্জন করেন। অভূতপূর্ব ফলাফল করায় তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়।
শিক্ষা জীবনে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র ফলাফলের সাফল্য যতটা সহজে ধরা দিয়েছে, যাপিত জীবনের সাফল্যটা অতটা সহজে ধরা দেয়নি। জীবনের শুরু থেকে নিরন্তর সংগ্রামী জীবনের উদাহরণ তাঁর মতো দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। আজ সাফল্যের শিখরে দাঁড়িয়ে যে নির্মোহ সত্য তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছেন, অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব হয় না। আমরা সামাজিকভাবে একটু ভালো অবস্থানে পৌঁছালেই পেছনের অনটনের কথা ভুলে যাই। কিন্তু শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উচ্চকিত কণ্ঠে পারিবারিক অনটনের কথা অবলীলায় প্রকাশ করেন। তিনি যখন বলেন, ‘আব্বা ছিলেন আমাদের দুই ভাইয়ের কাছে ফ্রেন্ড, ফিলোসফার এবং গাইড।’ ‘বাবা একবার বলেছিলেন, তোমরা দুই ভাই রেলগাড়িতে যাত্রীদের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হও। লিখিত আবেদন নিয়ে বল যে আমাদের আর্থিক অসচ্ছলতার জন্য উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছি না, তাই সাহায্য প্রার্থী।’ এই সত্যকথন তাঁর জীবনের সংগ্রামকে যেমন প্রশস্ত করেছে তেমনি করেছে মহিমান্বিত। জীবনের ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর দীর্ঘমেয়াদী দৌড়ে তাঁকে প্রস্তুত করে দিয়েছিলেন স্বয়ং পিতা। কী মানসিকভাবে, কী সামাজিকভাবে। ছেলের ভেতরে স্বপ্ন তৈরি করার জন্য তিনি বলেছেন, ‘তোমাকে হয় ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে’। আবার বলেছেন, ডাক্তারের চেয়ে ইঞ্জিনিয়ার বেশি পছন্দ, কেননা বাড়ির আশে-পাশের ত্রিশ মাইলের মধ্যে বেশ কয়েকজন ডাক্তার থাকলেও ইঞ্জিনিয়ার কেউ নেই।’ অর্থাৎ প্রচ্ছন্নভাবে সন্তানের রণক্ষেত্রটা তিনিই প্রস্তুত করে দিলেন; যেন নিজের সাথে নিজের প্রতিযোগিতা। পিতা-পুত্রের এমন পরিপূরক চিন্তা খুব কম পরিবারেই দেখা যায়। নির্মোহ এবং সত্যকথনে অটল থাকার শিক্ষাটাও পৈত্রিকসূত্রে পেয়েছেন শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
ছাত্র জীবনের অর্জিত ভালো ফলাফল সাধরণত মানুষের ভবিষ্যত জীবন গড়ে দেয়। কিন্তু শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষক হতে চেয়েছিলেন কিন্তু নিজের শিক্ষকের অসহযোগিতার কারণে সে স্বপ্নপূরণ করতে পারেনি। প্রভাষক পদে তাঁকে অযোগ্য অথবা চাকরি দিবেন না সেটা অধ্যক্ষ বলেননি কিন্তু কিছু অনৈতিক শর্ত জুড়ে দিয়ে কৌশলে চাকরি নেয়া থেকে অনুৎসাহিত করলেন। তিনি জানতেন, তৃতীয়বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করেছেন শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং তার একটি সন্তানও আছে। অথচ তাকে চাকরি করার প্রধান শর্ত দিলেন কোন পারিবারিক বাসস্থান বরাদ্দ দেয়া যাবে না, প্রকারান্তরে ব্যাচেলর শ্রেনীতে থাকার প্রস্তাব দিলেন। এমন স্বে”চ্ছাচারি সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে শিক্ষক হবাব স্বপ্ন থেকে সরে আসলেন তিনি। এরপর মাসিক ২৭৫ টাকা বেতনে পূর্ব পাকিস্তান ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে জি কে প্রজেক্টের সহকারি ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মে যোগদান করলেন। শুধুমাত্র আর্থিক কারণে এ চাকরিও তিনি ছেড়ে দিলেন, বেতন কম বলে। সংসার চালিয়ে বাবাকে সহযোগিতা করতে পারছিলেন না। তখন কর্ণফুলি হাইড্রোইলেকট্রিক প্রজেক্ট নির্মাণ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। ভালো বেতন, মাসিক ৪৫০ টাকা। আবাসিকসহ অন্যান্য সুবিধা প্রজেক্ট থেকে দেয়া হতো। সেকালে এ বেতনটা অনেকটা আকর্ষণীয়। কর্মক্ষেত্রে নিজের নিষ্ঠা এবং দক্ষতার গুণে অল্পদিনেই শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কর্তৃপক্ষের সু-নজরে পড়েন এবং বেতন বৃদ্ধিসহ পারিবারিক বাসস্থান বরাদ্দ পেলেন।
বাবার দ্বিতীয় স্বপ্ন সরকারি প্রকৌশলী হবার দ্বারপ্রান্তে গিয়েও ফিরে আসতে হয়েছে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। কেননা পাকিস্তানী বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে তাঁকে CES (Central Engineering Services) পরীক্ষাতে ইংরেজী বিষয়ে ফেল করানো হয়েছিলো।
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলামের প্রস্তাবে ১৯৫৮ সালে কনস্ট্রাকশন বিজনেসে যুক্ত হলেন। কেবলমাত্র সৎ এবং পরিশ্রমী হবার কারণে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে ব্যবসায়ে কোন আর্থিক বিনিয়োগ করতে হয়নি। বরং মাসিক ১৫০০ টাকার সম্মানী ধার্য করা হয়েছিলো তাঁর জন্যে, যা সেকালে অনেকটা উচুঁ মাসিক সম্মানী। ব্যবসা পাঁচ বছর চললেও আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখলো না।
দেশের প্রখ্যাত স্থপতি মাযহারুল ইসলামের আহবানে ১৯৬৪ সালের জুন মাসে ‘বাস্তকলাবিদ’ নামের একটি ফার্ম তাঁর সঙ্গে গড়ে তুললেন। মাযহারুল সাহেব সরকারি চাকরি ছেড়ে দিলেন। বাস্তকলাবিদ ব্যবসায়িক সাফল্য পায়। কিন্তু ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে তাঁকে বাস্তকলাবিদ থেকে বাদ দেওয়া হয়, সম্ভবত: রাজনৈতিক কারণে।
এর আগে ১৯৬৯ সালে ঘটে যায় আরো একটি বড়ো ঘটনা। মার্কসবাদী রাজনীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে পুলিশ শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে গ্রেফতার করে। তিনি কোন মার্কসবাদী পার্টির সদস্য ছিলেন না, এমন কী সদস্যপ্রার্থীও ছিলেন না; সহানুভূতিশীল শুভানুধ্যায়ী ছিলেন। নিজের দর্শনের সাথে মিল থাকার কারণে সে কালের মার্কসবাদী বড় বড় নেতাদের সাথে তাঁর হৃদ্যতা ছিলো, তিনি তাঁদের যথেষ্ট আর্থিক সহযোগিতাও করতেন। সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোয়াহা, কমরেড আব্দুল হক এর মতো বড়োমাপের নেতৃবৃন্দের যাতায়াত ছিলো প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র বাসায়। পিকিংপন্থী মার্কসবাদীরা তখন সাইক্লোস্টাইল করে ‘মার্কসবাদী’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। ১৯৬৯ সালের দিকে এ পত্রিকার জনপ্রিয়তা খুব বেড়ে যায়, সাইক্লোস্টাইল করে চাহিদা মেটানো যাচ্ছিলো না। তাই প্রিন্টিয়ের প্রয়োজন। সবার অনুরোধে তিনি সে দায়িত্ব নিলেন। বাস্তকলাবিদের স্টেশনারী ছাপার কাজ করা হতো ভুতের গলির ‘সেবা প্রিন্টিং প্রেসে’। তাদের জানানো হলো, পত্রিকাটি সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নয়, ছাপানো যাবে কি না। তারা সানন্দে রাজী হলো। পরে জানা গেল প্রেসটি মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সোর্স। প্রেস থেকে পত্রিকা ছেপে বাসায় আনার পথে তিরিশ হাজার টাকা পুরস্কারের বিনিময়ে ওরাই পুলিশকে জানিয়ে দেয় এবং রাস্তায় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। সুখেন্দু দস্তিদার পত্রিকা নিয়ে মফস্বলে বিতরনের জন্য তখন তাঁর বাসায় অপেক্ষা করছিলেন।
বিনা বিচারে হাজতবাস করেছেন এক বছর, আর সশ্রম কারাদন্ড হলো এক বছর। ছাপার কাজের সহযোগিতাকারী তাঁর সঙ্গী অধিনস্থ কর্মচারিকে ডিভিশন দিয়েছিলো কারাকর্তৃপক্ষ, কিন্তু তাঁকে দেয়নি। এছাড়া নানা বৈষম্য ও অত্যাচার সহ্য করেছেন কিন্তু মাথা নত করেননি। বরং জেলারের অন্যায় হুকুমের প্রতিবাদ করেছেন বলিষ্ঠভাবে। কারাদন্ড শেষ হলেও জেল কর্তৃপক্ষ তাকে ছাড়েনি। তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি জেলে আটক ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে না পারলেও তাঁর পরিবার নিদারুণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলো। স্কুল এবং কলেজ পড়–য়া দুই ভাইকে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকসেনাবাহিনী হত্যা করে। আর বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর অন্যান্য বন্দীদের সাথে শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ জেল থেকে মুক্তি পান। মা-বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। বাবার দৃঢ় মনোবলের কারণে তিনি ভাই হারানোর শোকের মধ্যেও শক্তি খুঁজে পান। তাঁর বাবা বরাবর খুবই ধার্মিক ছিলেন। যে ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানীরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করলো তাদের মধ্যে সে ধর্মের লেশমাত্র নাই। সেটা তিনি বুঝতে পারলেন মৃত সন্তানের লাশ সৎকার করার জন্য ফেরত চেয়ে না পাওয়ার মধ্য দিয়ে।
এ ঘটনায় তার বাবার চোখ খুলে গেল। পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় তারা ধর্মকে পুঁজি করেছে কিন্তু ধর্মের প্রতি তাদের কোন শ্রদ্ধা নেই। দাফনহীন অবস্থায় মুসলমানের লাশ পানিতে ভাসিয়ে দিলো অথচ সন্তানের লাশ দাফন করার জন্য পিতার আবেদন প্রত্যাখান করলো! এটা কোনো মুসলমানের আচরণের মধ্যে পড়ে না। চোখের সামনে সন্তানের লাশ পানিতে পঁচে-গলে মিলিয়ে গেলো…। কোনভাবেই সমাহিত হলো না। না ধর্মীয়ভাবে, না সাধারণভাবে মাটিচাপা দিয়ে! এত বড় নির্মমতা সহ্য করতে হয়েছে! এদেশের মানুষ এমন দামই দিয়েই অর্জন করেছে স্বাধীনতা।
প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। নিরন্তর সংগ্রামী একজন মানুষের প্রতিকৃতি। দীর্ঘ প্রতিকুলতার উজান ঠেলে তিনি সফলতার উত্তুঙ্গে পৌঁছেছেন। তাঁর ন্যায়-নিষ্ঠা এবং সততা এবং শোষিত শ্রেণীর মুক্তির জন্য সংগ্রাম বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় উদাহরণ।
সাপ্তাহিক একতা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button