আউটসোর্সিং
আরশাদ উল্লাহ্
অভিধান খুঁজে দেখলে উল্লিখিত ‘আউটসোর্সিং’ কথাটির বহুবিধ অর্থ বের হয়। কিন্তু সঠিক বাংলা অর্থ যে কি এক কথায় বের হয়ে আসেনা বলে যথাযথ অর্থ বুঝতে অনেক ভাবতে হয়। এই ইংলিশ শব্দটি আজ থেকে সাত বৎসর পূর্বে প্রথম শুনেছিলাম এক মহিলার মুখে। মহিলাটির বয়স তখন চল্লিশের কোঠায়। তিনি বিধবা এবং দুই সন্তানের জননি। পেশা হল কলেজ টীচার। প্রথমে যখন তিনি আউটসোর্সিং এর কথাটি বললেন। তখন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে না পেরে চুপ করে রইলাম। ভাবছিলাম কথাটিতে মহিলা আমাকে কি বুঝাতে চাচ্ছেন। সেই মহিলাকে কোনদিন সামনা সামনি দেখিনি। তিনি আমার একজন ফেস্বুক বন্ধু। দেশে থাকেন। আমি প্রবাসে।
ফেস্বুকের অবদান অনেক। তার পরিমাপ করতে গেলে মহাশূন্যের সীমানা যেমন নির্ধারণ করা সম্ভব নয় – ঠিক তেমনি ফেস্বুকের ক্ষেত্রেও তাই। মানব জীবনের ইতিহাসে ফেসবুক একটি বড় আবিষ্কার। ফেসবুকের মাধ্যমে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তের মানুষকে জানতে পারে। বন্ধু হয়ে ভাব বিনিময় করতে পারে। লেখালেখি করতে পারে। আনন্দ, ক্ষোভ, প্রেমভালবাসা ছাড়াও এটা হয়েছে এখন বিশ্বের সর্বশ্রেণীর মানুষের নিকট উত্তম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
একজন শিক্ষিত বন্ধুর সাথে কথা বলে অজানা অনেক কিছু শিখা যায়। তার মত আমার আরো বন্ধু আছে। কেউ উশৃংখল, কেউ উগ্র, কেউ ধার্মিক আবার কেউ নাস্তিক আবার কেউ ধ্যানি শান্তশিষ্ট মনিষির মত। তাদের মধ্যে যারা লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত তাদের আমি পয়লা কাতারের বন্ধু ভাবি। কারণ, আমি বিখ্যাত না হলেও কিছু লেখালেখি করি। অন্যান্য যারা আছেন – তাদের সাথে ঘর সংসার ও জীবন যাত্রার কথা বলি।
এখানে যে টীচার বন্ধুটির কথা বলছি। তিনি একদিন জানতে চাইলেন, “দেশে কখন আসবেন?”
বললাম, ‘ঈদের সময় যাব। দেশে গিয়ে ঈদ করতে ভাল লাগে।‘ আমার কথা শুনে মনে হল তিনি খুশি হলেন। বললেন, “এবারের ঈদ আমাদের সাথে করেন!”
এমন কথা শুনে অবাক হলাম। কিন্তু মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “আপনার বাড়িতে যদি ঈদ করি – আমার ভাই বোন আত্মীয়স্বজনেরা কি মনে করবেন। তাছাড়া আপনার মেয়েটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে এবং ছেলেটি এবার উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষার্থি। তারাতো আমাকে দেখে সহজ ভাবে গ্রহণ করবে না।“
“ না, না, সেরকম কিছু হবে না। তাদেরকে আমি বুঝাব। আপনি আসবেন কি না বলেন?”
বললাম, ‘ঈদের তো আরো দুই মাস সময় আছে। পরে জানাব।‘
দুই মাস পরে তার মেসেজ পেলাম। সিরিয়াসলি বললেন, “আসার সময় ছেলেটির জন্য একটি লেপটপ এবং মেয়ের জন্য একটি ক্যামেরা আনবেন।“
মহিলার কথা শুনে মনে হল ধীরে ধীরে তিনি আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছেন। সময় থাকতে সরে না গেলে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু তার কথার তো একটি উত্তর না দিলেই নয়। তাই একটি সহজ জবাব দিলাম, “দেশে এবার ঈদ করা হবে না। কাজের চাপ বেশি।”
মনে করেছিলাম আমার কথা শুনে মহিলা দমে যাবেন। কিন্তু আমার সে ধারণা ভুল ছিল। জবাবে তিনি বললেন, “তাহলে এক লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দেন। জানেন তো যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চলে না।“
বললাম, ‘সেটা আপনার ব্যাপার। আমাকে টাকা পাঠাতে হবে কেন? আমারও তো আত্মীয়স্বজন আছে। যাদেরকে কিছু না দিলেই নয়।“
তখন তিনি বললেন, ‘আউটসোর্সিং’ কি শুনেন নি? এটা হল আমার আউটসোর্সিং!”
আমি তার কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে তিনি আবার মেসেজ পাঠালেন। এই মেসেজে তার আরো একটি প্রশ্ন, “আমার কথার মানে বুঝেন নি?”
তৎক্ষণাৎ কথাটির সঠিক অর্থ বুঝলাম। কিন্তু কোন জবাব না দিয়ে তাকে ব্লক করে দিলাম।
সেদিন প্রথম ‘আউটসোর্সিং’ কথাটি জেনেছি, পরে তা যে ব্যাপক ভাবে সমাজের একটি শ্রেণীর নিকট ছড়িয়ে যাবে – তা কখনো ভাবিনি।
অনেকদিন পরে আমার কৈশোর কালের পরিচিত একজন নারীর ফোন কল পেলাম। তিনি আমার সিনিয়ার ছিলেন বলে আপা ডাকতাম। তার বাবার নিকট আমি প্রাইভেট পড়েছিলাম। সেই আপাটি বেশ মেধাবি ছিলেন। তিনি একটি মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন। তার বাবার কোন পুত্র সন্তান ছিলনা। তার এই মেয়েটিকেই পুত্র সন্তানের মত মানুষ করবেন মনে করেছিলেন। আমি সে আপাটিকে শ্রদ্ধা করতাম। কয়েক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আপাটি যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রি – তখন তিনি পালিয়ে গিয়ে একজন লোককে বিয়ে করেন। মধ্যপথে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। একথা শুনে বড় বিস্মিত হলাম। মনে প্রশ্ন জাগল, “এই মেধাবি আপাটি এমন কাজটি কেমনে করলেন?” এমন প্রশ্ন – তাকে চিনে এমন আরো অনেকের মনে জেগেছিল। সবাই দুঃখ প্রকাশ করেছে।
আপাটির ব্যাপারে জানার আগ্রহ ছিল। বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করে জেনেছি যে তার স্বামি একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনীয়ার। সৌদি আরবে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ চার দশক পরে সেই আপাটি আমাকে ফোন করলেন। তিনি আমার ফোন নাম্বার কেমনে পেলেন ভেবে পেলাম না। অস্থির হয়ে তিনি বললেন, “আমাকে চিনেছো? আমি তোমার সেই …আপা!”
চার দশক পরেও তার কন্ঠস্বর চিনতে পারলাম। বললাম, ‘চিনেছি।‘
বললেন, “ আজকের মধ্যে আমাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠাও। তোমার দূলাভাইয়ের ওপারেশন হয়েছে হাসপাতাল থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য তাকে ঘরে আনতে পারছি না।“
বললাম, “ মাস খানেক আগে দেশ থেকে ফিরে এসেছি। টাকা পয়সা এখন আমার হাতে নাই।“
ব্যাকুল হয়ে তিনি বললেন, “ পঞ্চাশ হাজার দিতে না পার তো ত্রিশ হাজার দাও।“
বললাম, আজকের মধ্যে কি করে টাকা পাঠাব। তা সম্ভব নয়।
বললেন, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মধ্যমে পাঠিয়ে দাও। নইলে তোমার দূলাভাইকে ঘরে আনতে পারব না।“ তারপর তার নাকি কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম।
বললাম, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে টাকা পাঠাবার পদ্বতি আমি জানি না।
“বল কি, এত বছর প্রবাসে থেকে ওয়েস্টার্ণ ইউনিয়ন চিন না? তাছাড়াও রিমিটেন্সের অনেক পথ আছে।“
বললাম, ‘আপনি এত সিস্টেমের কথা কি করে জানেন? জরুরি ভিত্তিতে টাকা আমি পাঠাইনি। ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়েছি।“
জবাবে বললেন, “জানব না মানে? এখন অনেকেই ‘আউটসোর্সিং’ মাধ্যমে টাকা অর্জন করছে।“
“আপনিও আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে অর্জন করেন না কি?”
“আরে না, না। কথাটা শুনেছি। আমি সেরকম নই।“
তারপর অনুনয় বিনয় শুরু করলেন। আজকের মধ্যে টাকা পাঠাতে বলছেন তা কিছুতেই সম্ভব নয়। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে বললাম, “কুড়ি হাজার পাঠাব। এর বেশি পাঠাতে পারব না।‘
অতি অস্থির হয়ে বললেন, “তাহলে পাঠিয়ে দাও, ভাই। টাকা ধার হিসাবে নিচ্ছি। পরে ফেরত দিব।‘
বললাম, “এখন আমি কর্মস্থলে আছি। বাসাতে নেই। বাসাতে ফিরতে সন্ধ্যা ছ’টা বেজে যাবে। কাল পাঠাতে চেষ্টা করব।“
“শুধু চেষ্টা করলে হবে না। পাঠাতেই হবে।“
তারপর বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করে বিভিন্ন জরুরি রিমিটেন্স পদ্বতির কথা জেনে নিলাম। বাসায় ফিরে আসার পর তিনি দশ বারের উপর মিস কল দিলেন। এক অস্থির অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলাম। মিসকল দিতে নিষেধ করার পরেও কলের পর কল দিচ্ছেন। তাই মোবাইল ফোন অফ করে রেখে রাতে ঘুমালাম।
ভোরে ফোন অন করার সঙ্গে সঙ্গে আবার মিস কল পেলাম। টাকা পাঠাব বলে ফোন আবার অফ করে রাখলাম। দেশে যে লোকটি তাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছে, মনে মনে তার উপর রেগে গেলাম। কয়েক জনকে সন্দেহ হয়েছে। কিন্তু সে লোকটি কে বুঝতে পারলাম না।
টাকা পাঠাবার পরে ফোনে জানালাম। বললাম, শহরে ব্যাংকে গিয়ে এই কোড নাম্বার বললেই টাকা দিয়ে দিবে। টাকা পাঠাবার আগে বাসার ঠিকানা চেয়েছিলাম। ঠিকানা দিয়ে বলেছিল, “এই ঠিকানা অন্য কাউকে দিবে না!”
“আমি কেন অন্যকে আপনার ঠিকানা দিব। এসব অবান্তর কথা বলবেন না। টাকা পাঠিয়েছি। সে টাকা ব্যাংকে গিয়ে আনেন। আরেকটি কথা – বাসার ঠিকানা যদি না ই দিবেন। আমার টাকা ফেরত দিবেন কেমনে?“
টাকাটা পাওয়ার পরে আবার মিস কল দিলেন। আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে বললেন, “দেশে যখন আসবে আমাকে জানাবে।“
“কেন?”
“ওমা…তোমার টাকাটা ফেরত দিতে হবে না? এই টাকা আমি ধার নিয়েছি!”
মাস খানেক পরে এই আপাটির ব্যাপারে বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করেছি। যে গ্রামে তার জন্ম সে গ্রামে আমার এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছি। সে বন্ধুটি বলল যে এই আপাটি না কি এলাকার বিভিন্ন প্রবাসিদের কাছ থেকে প্রচুর ‘আউটসোর্সিং’ করেছে। ওরা সবাই তার উপর বিরক্ত। আমি ভিন্ন জেলার লোক। তাই এখন নিজের জেলা বদল করে আমার পিছনে লেগেছে। টাকা নেওয়ার আগে সে তার যে ঠিকানা দিয়েছিল – সে ঠিকানায় লোক পাঠিয়েছি, সেখানে তারা নেই।
তারপর তার খোঁজ নেয়ার চেষ্টাও করিনি। জানতাম যে এই টাকা আর ফেরত পাব না। আমি তাকে ভুলেই গিয়েছিলাম।
প্রায় পাঁচ মাস পরে সে আপাটি আবার মিস কল দিলেন। কথা বললাম। তিনি আবার পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠাতে বললেন। এবার কথা বাড়াই নি। বললাম, “পাঠাব না।“
“বিপদে পড়েছি। কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করবে না?”
“না। আপনি আমার কুড়ি হাজার টাকা ফেরত না দিয়েই আবার টাকা পাঠাতে বলছেন। এভাবে অনেককে আপনি প্রতারিত করেছেন। সব জনেছি।“
তারপর অন্য প্রান্ত থেকে আর কোন প্রতি উত্তর করেনি।
আজ থেকে সাত দিন আগের কথা। খুলনা থেকে জাহানার আক্তার ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছে।
খুলনার একটি বিখ্যাত কলেজের ছাত্রি – তার প্রোফাইলে লেখা। আমার বন্ধু হয়েছে। যেদিন বন্ধু হয়েছে তার পরের দিন চাটবক্সে তার মেসেজ পেলাম।
“হাই!” সালাম না জানিয়ে শুধু ‘হাই!”
‘মাহে রমজানের শুভেচ্ছা” জানিয়ে উত্তর দিলাম।
“আমার দুই ভাই গার্মেনেটস কোম্পানিতে চাকুরি করে। বাবা বেকার। আমি কলেজে পড়ি।“
“বাহ, বড় ভাল কথা। সুখসুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন। সুদিন ফিরে আসবেই। তোমার সার্বিক সাফল্য কামনা করি।“
ভেবেছিলাম প্রতিউত্তরে ভাল জবাব পাব। কিন্তু সব মিথ্যা প্রতিপন্ন করে সে জবাব দিল। সম্ভবত একই কথা প্যাস্ট করে বিভিন্ন জনকে পাঠাচ্ছে। নতুবা তার হান্টিং এর লক্ষ অনেক। এমনও হতে পারে।
“আমার দুই ভাই গার্মেনেটস কোম্পানিতে চাকুরি করে। বাবা বেকার। আমি কলেজে পড়ি।“
একই উত্তর পেয়ে উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলাম।
মেয়েটি এবার লিখল, ছবি পাঠাবার ইচ্ছা ছিল। আমার আই ফোন অচল – নইলে ছবি পাঠাতাম।
“মেসেজ তো ঠিক মতই পাচ্ছি। ছবি পাঠাবার অনুরোধ তো করিনি। পাঠাবার ইচ্ছা থাকলে তো প্রথমেই পাঠাতে!”
এবার অদ্ভুত এবং অপ্রত্যাশিত এক জবাব পেলাম।
“ কিছু বুঝলি না কুত্তার বাচ্চা?”
তারপর মেসেঞ্জার বক্স সহ অতি দ্রুত ব্লক করে দিল। এটাও হালজামানার অভিনব পদ্বতির আউটসোর্সিং হতে পারে।




