
মাঝ সমুদ্রে ভিড়ের চাপে নৌকা তখন প্রায় ডুবতে বসেছে। প্রাণ বাঁচাতে কিশোরীটিকে হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছিল ভূমধ্যসাগরে। কনকনে ঠাণ্ডায় প্রায় তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর মনে হয়েছিল, এ বার বোধহয় জমেই যেতে হবে! চোখ বুজে আসছিল ক্লান্তিতে। হাত-পা অসাড়। সীমানাহীন সমুদ্রে তখন শুধুই মৃত্যুর কথা মনে পড়ছিল ইউসরা মারদিনির।
সিরিয়া থেকে শরণার্থীরা তখন আশ্রয়ের খোঁজে দলে দলে চলেছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। সেই তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলতে হয়েছিল সিরিয়ার দামাস্কাসে বসবাস করা ইউসরার পরিবারকেও। মাথা গোঁজার মতো একটা ঠাঁই পেতে তাই সমুদ্রে ভেসে পড়া। কিন্তু নৌকার ইঞ্জিন হঠাৎই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বোটের ভার কমাতে সবাই ব্যাগ, জামাকাপড় খুলে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত জলে ঝাঁপ দেয়া ছাড়া উপায় ছিল না। সেই দলে ছিলেন ইউসরা এবং তার বোনও। নিজের
জীবন বিপন্ন করে সে দিন ওই কিশোরী শুধু নিজের জীবন বাঁচাননি, বাঁচিয়েছিলেন আরো ১৯ জন শরণার্থীর জীবনও। সেই জীবন যুদ্ধ জয় করে আজ অন্য এক যুদ্ধের মুখোমুখি বছর আঠেরো বছরের ইউসরা।
বছরখানেক আগে ইউসরার পরিবার ভেসে পড়েছিল অনির্দিষ্ট এক জীবনের খোঁজে। ঠিক যে ভাবে এক টুকরো আশ্রয়ের খোঁজে দেশান্তরে পাড়ি দিয়েছিল আয়লান কুর্দির পরিবার। ইউসরাদের মতো একই ভাবে ডুবে গিয়েছিল তাদের নৌকাও। তিন বছরের ছোট্ট আয়লান বাবা-মার হাত ছুটে ভাসতে ভাসতে চলে গিয়েছিল তুরস্কের এক সমুদ্র সৈকতে। সেখানেই বালির চরে পড়েছিল ছোট্ট শিশুটির দেহ। গোটা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল সেই ছবি দেখে। এ রকম কত আইলানই তো হারিয়ে গিয়েছে ভূমধ্যসাগরের
জলে। কিছু জানা গিয়েছে কিছু থেকে গিয়েছে অন্ধকারে। সে রকমই এক অন্ধকার অতীতকে পিছনে ফেলে আলোর সামনে দাঁড়িয়ে মারদিনি।
সিরিয়া থেকে ইউসরার ঠিকানা এখন জার্মানি। অলিম্পিক্স রিফিউজি দলের সদস্য তিনি। এক শ’ মিটার ফ্রি স্টাইলে যখন প্রথম ‘অলিম্পিক্স রিফিউজি’ দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় নামবেন, তখন সে দিনের সেই ভূমধ্যসাগরের কথা নিশ্চিত মনে পড়বে তার!

জীবনের ওই লড়াই-ই তাকে আজ দাঁড় করিয়েছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের মঞ্চে। যেখানে আবার সাঁতার কাটবেন তিনি। শুধু মৃত্যু ভয় থাকবে না সেখানে। থাকবে জয়ের অদম্য সাহস। অলিম্পিক্সের মঞ্চ আরো এক বার তার জীবন যুদ্ধের কাহিনী গোটা বিশ্বকে জানাবে। ‘‘যখন আমি সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি, তখন খুব ভয় করছিল। জানতাম না আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে!’’
স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে কেঁপে ওঠে ইউসরার গলা। বলছিলেন, ‘‘বোটে ওঠার আগে থেকেই শুনছিলাম, মৃত্যুই ভবিতব্য। বোটে উঠছিলাম যখন, মনে মনে নিশ্চিত ছিলাম মরেই যাব আমরা!’’ পরে সেই মৃত্যুর সঙ্গেই পাঞ্জা লড়তে হয় তাদের। তার কথায়, ‘‘যখন সাঁতার কাটছিলাম, তখনও জানতাম না কী হবে। এখনকার জীবনের কথা তো স্বপ্নেও ভাবিনি।’’
সে দিনের সেই ঘটনার পর কী ভাবে গ্রিসের সেই দ্বীপটায় পৌঁছেছিলেন আর মনে নেই। মধ্যরাতে মাটি খুঁজে পেয়েছিল ওরা। চোখে নোনা জল ঢুকে দৃষ্টিশক্তি প্রায় খোয়াতে বসেছিলেন। তার পর হঠাৎ করেই বদলে গেল দিন। এখন সামনে শুধুই অলিম্পিক্স।

ইউসরা বলছিলেন, ‘‘আমরা এখন নিজেদের তৈরি করছি। অনুশীলন করছি নিয়মিত। মা-বাবা যে ভাবে আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে আমি চাই জিতে তাদের গর্বিত করতে।’’ তিনটি স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ইউসরা।
প্রথমত, ভুলতে চান সেই সব দিন। দ্বিতীয়ত, দেখতে চান দেশে সিরিয়ার বুকে ফিরেছে শান্তি। আর? তৃতীয় ইচ্ছেটা একান্তই ব্যক্তিগত। অলিম্পিক্স থেকে পদক জিততে চান তিনি।
‘‘প্রথম যখন জলে ঝাঁপ দেই তখন সারা শরীর কাঁপছিল। ঠিক যে ভাবে প্রতিযোগিতায় নামার সময় হয়। সে দিন অনুভব করেছিলাম আমার একার জীবন তুচ্ছ! ওই বোটে যারা ছিলেন, সবাই আমার অংশ। তখন মনে হয়েছিল জলে ঝাঁপিয়ে পড়াটা আমার কর্তব্য না হলে যে সবাই ডুবে যাবে। যারা সাঁতার জানত জলে নেমে পড়ে। সে দিন এটা না করলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না সারা জীবন।’’
অলিম্পিক্সে যাই হোক না কেন, জীবন যুদ্ধে জয়ীর পদক তো তিনি সে দিনই জয় করে নিয়েছিলেন।




