ফিচার

“অকুতোভয় এক সৈনিক সার্জেন্ট জহুরুল হক”

মেসবা খান :
সার্জেন্ট জহুরুল হক আজ উনার ৮৬ তম জন্মদিন (জন্মঃ ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫-মৃত্যুঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী ও শহীদ ব্যক্তিত্ব। আজ উনার ৮৬ তম জন্মদিন
শৈশবকাল:
জহুরুল হক ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার সোনাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে নোয়াখালী জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন।১৯৫৬ সালে জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে ইন্টারমেডিয়েড পাস করেন এবং ঐ বছরই পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগদান করেন। কালক্রমে তিনি ‘সার্জেন্ট’ পদে উন্নীত হন।
কর্মজীবন:
১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গ্রেফতার হন সার্জেন্ট জহুরুল হক।
শাহাদাত বরণ:
সার্জেন্ট জহুরুল হক বন্দীনিবাসে থাকাকালীন সময়ে তাকে প্রহরার দায়িত্বে নিয়োজিত পাকিস্তানী সৈনিকের হাতে থাকা রাইফেলের গুলিতে বিদ্ধ হন। ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তারিখের সন্ধ্যায় ক্যান্টমেন্টে সৈনিকদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহের জন্য বাঙালি শিশুরা ভিড় করে। এতে অবাঙালি সৈনিকেরা কয়েকজন অভুক্ত শিশুকে ধরে এনে বন্দী শিবিরের সামনে অমানবিকভাবে প্রহার শুরু করে।
কয়েকজন বন্দী এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানালে হাবিলদার ‘মনজুর শাহ’ বন্দীদের নিজ নিজ কামরায় ফিরে যেতে আদেশ করেন। জহুরুল হক সে আদেশ উপেক্ষা করে মনজুর শাহের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এতে মনজুর শাহ প্রচণ্ডভাবে রাগান্বিত হয়ে রাইফেলের বেয়োনেট লাগিয়ে তার দিকে ধেয়ে আসেন। কিন্তু সার্জেন্ট জহুরুল হক পাশ কাটিয়ে আক্রমণকারীর হাত থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নেন এবং বিজয়ী বীরের মতো কামরার দরজায় গিয়ে তাকে রাইফেল ফেরত দেন।
পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তারিখ ভোরবেলা জহুরুল হক ঘর থেকে বের হলে মনজুর শাহ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। ঐ গুলিটি তার পেটে বিদ্ধ হয়। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঐদিনই রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
স্বীকৃতি:
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের আবাসিক হলরূপে ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে। দেশের মুক্তির লক্ষ্যে তার অসামান্য অবদানের কথা বিবেচনায় এনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হলটির নূতন নামকরণ করেন ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’।
মূল্যায়ণ ও পর্যালোচনা:
সার্জেন্ট জহুরুল হক স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিক সৈনিক ছিলেন। তার সহকর্মীদের ভাষায় –
তাকে কখনো কাঁদতে দেখা যায়নি। কোনো কারণে কারো কাছে মাথা নত করেননি।
এজন্যে সহকর্মী বন্ধুরা তাকে ‘মার্শাল’ বলে ডাকতেন।
তার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আইয়ুব বিরোধী গণ-আন্দোলন আরো গতি লাভ করে। ব্যাপক গণ-বিক্ষোভের মুখে ২৫ মার্চ ১৯৬৯ তারিখে আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটে। তার শহীদ স্মৃতি পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে শাণিত করে তোলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ গণ-আন্দোলনের পথ ধরেই পরবর্তীকালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। জহুরুল হক ‘বাঙালি জাতির সূর্য সন্তান’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকবেন চিরকাল।
সাঁতার কাটা, খেলাধূলা, ছবি তোলা, ছবি আঁকা, কাঠের কাজ ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে দক্ষতা ছিল তার। সার্জেন্ট জহুরুল হকের অঙ্কিত চিত্রকর্ম ঢাকা জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
তথ্যসূত্রঃ ‘দৈনিক সমকাল’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button