sliderআইন আদালতশিরোনাম

১৮ বছর পর্যন্ত সেই শিশুর খরচ রাষ্ট্রকে বহন করতে হাইকোর্টে রিট

পতাকা ডেস্ক : ময়মনসিংহের ত্রিশালে সড়ক দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া শিশুটির যাবতীয় খরচ ১৮ বছর পর্যন্ত রাষ্ট্রকে বহনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় ব্যারিস্টার সৈয়দ মাহসিব হোসাইন জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন। রিটে শিশুর যাবতীয় খরচ বহন ও তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামীকাল মঙ্গলবার রিট আবেদনটির ওপর শুনানি হতে পারে।
গত রোববার (১৬ জুলাই) ময়মনসিংহের ত্রিশালে ট্রাকচাপায় মারা গেছেন এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, তার স্বামী ও মেয়ে। তবে মারা যাওয়ার আগে নারীটির পেট ফেটে সড়কেই ভূমিষ্ঠ হয় একটি ফুটফুটে নবজাতক। তাকে ময়মনসিংহ সদরের সিবিএমসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মিরাকল বেবি সুস্থ আছে

টক অব দ্য কান্ট্রি এখন ত্রিশালের সেই শিশু। অলৌকিকভাবে জন্ম নেয়া এ শিশুকে নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা। জন্মের আগেই পিতা, মাতা ও বোনকে হারায় মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায়। ট্রাক চাপায় মা যখন মৃত্যুর কোলে পেট ফেটে পৃথিবীর আলো দেখে এ শিশু। গত দুদিন ধরে এ শিশু নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। কেমন আছে শিশুটি? ময়মনসিংহের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন শিশুটিকে পালাক্রমে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন ওই হাসপাতালে সদ্য সন্তান প্রসব করা প্রসূতি মায়েরা। গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাক-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দরিরামপুর কোর্ট ভবন নামক স্থানে একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্টো-ট ২০-৩৫৮০) চাপায় ওই শিশুর বাবা ত্রিশাল উপজেলার রায়মনি গ্রামের জাহাঙ্গীর (৪২), মা রত্না বেগম (৩০) ও বোন সানজিদা (৬) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। অলৌকিকভাবে নিহত রত্না বেগমের গর্ভে থাকা কন্যা শিশু পেট ফেটে ভূমিষ্ঠ হয়। প্রতিবেশী শাহজাহান জানান, নবজাতক শিশুটিকে প্রথমে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে ময়মনসিংহের সিবিএমসি হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আরিফ আল নূরের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তিনি জানান, শিশুটি বর্তমানে সুস্থ আছে।
তবে এক্সরে করার পর দেখা যায় তার ডান হাতের দু’টি অংশ ভেঙে গেছে। পরে শিশুটিকে ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া লাবিব হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। লাবিব হাসপাতালের পরিচালক বলেন, আমি সিবিএমসি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর এক্সরে করে জানতে পারি তার ডান হাত ভেঙে গেছে। তখন আমি অর্থোপেডিক্স ডা. সোহেল রানা সোহাগের সহযোগিতা চাই। উনি সহযোগিতা করবেন বললে আমি বাচ্চাটিকে ওনার কাছে নিয়ে আসি এবং উনি দ্রুত হাতে রুল ব্যান্ডেজ দিয়ে প্লাস্টার করে দেন। তখন আমি ওনার পরামর্শে আমার নিজের জিম্মায়, লাবিব হাসপাতালে নিয়ে আসি। এরপর থেকে শিশুটি লাবিব হাসপাতালেই আছে। ওদিকে ওই শিশুর দায়িত্ব নিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক। গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে লাবিব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই শিশুকে দেখতে গিয়ে শিশুটির চিকিৎসা ও পরবর্তী ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন তিনি। শিশুটির চিকিৎসা খরচসহ ভবিষ্যতে যেন কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য তার নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করে দেবেন জেলা প্রশাসক।
ত্রিশাল থানার ওসি মাইন উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলেই ৩ জন নিহত হয়েছে। ঘাতক ট্রাকটিকে আটক করা হলেও চালক পলাতক রয়েছে। তবে চালককে আটকে অভিযান চলছে। শোকে স্তব্ধ রায়মণির ফকির বাড়ি স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ থেকে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় পুত্র, পুত্রবধূ, নাতিসহ ৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রায়মণি এলাকার ফকির বাড়ি এখন শোকে স্তব্ধ। নিহত জাহাঙ্গীর আলমের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু কবর দেখিয়ে বললেন, আমার দুনিয়াতে আর কেউ নেই। ৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় আমার ছোট ১ ভাই, ২ পুত্র, পুত্রবধূ, নাতিসহ ৫ জন হারিয়েছি। বাড়ির পেছনে নতুন ৩টি কবরসহ ৫টি কবর দেখিয়ে কেঁদে উঠেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জাহাঙ্গীর আলমের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু। নিহত জাহাঙ্গীরের মা সুফিয়া আক্তারের বিলাপ থামছেই না। ৩টি নতুন কবরের সামনে এলাকার মানুষের ভিড়।
একই পরিবারের ৩ জন নিহত হওয়ায় পরিবারের অন্য সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে এসেছেন সবাই। গত শনিবার বিকাল পৌনে ৩টার দিকে ত্রিশালের কোর্ট ভবন এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান অন্তঃসত্ত্বা রত্না বেগম (৩২), তার স্বামী জাহাঙ্গীর আলম (৪০) এবং তাদের ৬ বছরের মেয়ে সানজিদা। একপর্যায়ে বাবলু হাউমাউ করে কেঁদে বলতে থাকেন, ‘এইহানে ৭ জনের কবর। তাগর ৫ জনই মরছে এক্সিডেন্টে। এই সড়কই আমার ভাই, দুই ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিরে কাইড়া নিছে। সড়ক আর কার জীবন নিবো আল্লাহই জানে।’ ২০০৪ সালে বাড়ির সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যান তার ছোট ছেলে শামসুল হক। এর আগে ১৯৯৫ সালে একই মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যান ছোট ভাই ফজলুল হক। সবাইকেই শায়িত করা হয়েছে বসতঘরের পেছনে। বারবার সড়কে এমন মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। দুর্ঘটনার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেয়াকেই দায়ী করেছেন সবাই। নবজাতক ছাড়াও নিহত জাহাঙ্গীর-রত্না দম্পতির এক ছেলে আর এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে জান্নাত (১০) চতুর্থ শ্রেণিতে পড়লেও ছেলে এবাদত (৭) স্কুলে যায় না।

Related Articles

Back to top button