sliderরাজনীতিশিরোনাম

সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কট থেকে দেশকে উদ্ধার করুন-প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, দেশের সমস্যার সমাধানের কোনো পথ দেখছি না। আজ নিম্ন মধ্য আয়ের মানুষগুলো কি নিরাপদে তাদের কর্মস্থলে আসতে পারে? নাকি তার সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে পারে?
বিশ্ব বিদ্যালয় শিক্ষক, পুরেহিত, দোকানদার কেউ কি নিরাপদ বোধ করছেন? আমরা কেউ নিরাপদে নেই। এভাবে বেশি দিন চলতে পারে না। একটি গুপ্তহত্যার বিচার হয়েছে-এমন নজির কি দেখাতে পারবেন? যে সমাজে এসপির স্ত্রী নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হতে পারে? সুশাসন আজ কেবল প্রশ্নবিদ্ধ নয়, গুলিবিদ্ধ। আসুন, দেশকে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য সবাই মিলে ঐক্য গড়ে তুলি।
প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো সবাইকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করুন। কঠিন সঙ্কট থেকে দেশকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন।
সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মঙ্গলবার তিনি একথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বাজেট আলোচনা অব্যাহত থাকে। এরশাদ বলেন, আমাদের সমস্যার কোনো অন্ত নেই। সমস্যার কোনো পথ দেখছি না। আজ দেশের নিম্ন মধ্য আয়ের মানুষগুলো কেমন আছে? তারা কি নিরাপদে তাদের কর্মস্থলে আসতে পারে? নাকি তার সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে পারে? বিশ্ব বিদ্যালয় শিক্ষক, পুরেহিত, দোকানদার কেউ কি নিরাপদ বোধ করছেন? আমরা কেউ নিরাপদে নেই। অনেকের ছেলে যখন বড় হয় অনেকে শংকিত হন সন্ধার পর বাইরে গেলে বাড়ি ফিরবে কিনা। এই সংস্কৃতি চলছে। এবাবে বেশি দিন চলতে পারে না। তনুর মা বলেছেন, গরিব বলে কি বিচার পাবো না। সাগর-রুনী হত্যার কি বিচার হয়েছে? একটি গুপ্তহত্যার বিচার হয়েছে-এমন নজির কি দেখাতে পারবেন? যে সমাজে এসপির স্ত্রী নিরাপদ নয় সেখানে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হতে পারে? গত মার্চ মাস থেকে এই পর্যন্ত ১৩ জন গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছে। এ দায়িত্ব কি সরকারকে নিতে হবে না? ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে ১ হাজার ৭১৫ জন নিহত হয়েছে। এগুলো কি সুশাসনের ইঙ্গিত বহন করে? এসব সন্তানহারা মায়ের চোখের পানিতে আমরা ভেসে যাবো।
এদেশে ২০০৪ সালে প্রথম ক্রসফায়ার চালু করেছিল বিএনপি। কেন করেছিল? কারণ আইনের শাসন ছিল না, বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছিল। সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমরা এখনো বহন করে চলেছি।
জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের প্রধান বিচাপতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে এদেশে বিনিয়োগ হবে না। যখন দেশের প্রধান বিচারপতি আইনের শাসন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন তখন সাধারণ মানুষের আইনের অধিকার পাওয়ার উপায় থাকে না। মানুষে চোখে মুখে অন্ধকার দেখে। সরকারের সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত ম্লান হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন ও সুশাসন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িন। সুশাসন ছাড়া উন্নয়নের সুফল জনগণ পায় না।
তিনি বলেন, সুশাসন আজ কেবল প্রশ্নবিদ্ধ নয়, গুলিবিদ্ধ। আসুন, দেশকে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য সবাই মিলে ঐক্য গড়ে তুলি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো, যে সমস্ত রাজনৈতিক দল সন্ত্রাসে বিশ্বাস করে না, জ্বালাও পোড়াও এ বিশ্বাস করে না তাদের সবাইকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করুন। কঠিন সঙ্কট থেকে দেশকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন।
এরশাদ বলেন, কেউ যদি উন্নয়নের চিত্র দেখাতে পারে সেটা জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ দেখাতে পারে। বিএনপি দেখাতে পারে না। তাদের আমলে একটি জিনিস ছিল তা ছিল হাওয়া ভবন।
এরশাদ বলেন, দেশ আজ বহুমুখী সংকটে নিমজ্জিত। আইন শৃংখলার অবনতি, বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, মামলার জট, অপরাধীরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকা, ঘুষ দুর্নীতি মহামারি আকার ধারণ করেছে। এসব সঙ্কটের পাশাপাশি অসহনীয় বেকারত্ব জনসংখ্যার বিস্ফোরণ গোটা জাতিকে ক্রমান্বয়ে গভীর অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে। উত্তররণের উপায় কী। সতের কোটি মানুষ। এই মানুষের দেখাশুনার মানুষ হলো একজন প্রধানমন্ত্রী। এসম্ভব নয়। আমিও একদিন এদেশের দায়িত্বে ছিলাম। তখন এতো মানুষ ছিল না। তখনো আমি ১৮ ঘন্টা কাজ করেছি। প্রধানমন্ত্রী কিভাবে করেন জানি না। কিন্তু করে যাচ্ছেন। অনেক উন্নয়নের কাজ হয়েছে আমি বলবো। এতো লোড আপনি নিতে পারবেন না। বিকেন্দ্রীকরণ করেন। প্রাদেশিক সরকার-ব্যবস্থা করেন। এটা করলে গুরুভার কমে যাবে। সমগ্র দেশ উন্নতির দিকে চলে যাবে। এটা করলে স্বর্ণাক্ষরে আপনার নাম লেখা থাকবে। তিনি এই সংসদে প্রাদেশিক সরকার বিল পাসের প্রস্তাব করেন।
এরশাদ বলেন, আমি সবসময় আওয়ামী লীগের পাশে থেকেছি। ‘৯১ সালের সংসদে আওয়ামী লীগের সাথে একসঙ্গে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছি। আমি তখন জেলে ছিলাম। আমরা যুগপৎ আন্দোলন করে অত্যাচারী বিএনপি সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছি। ‘৯৬ সালে সংসদে আপনাদের সমর্থন দিয়ে ২১ বছর পর ক্ষমতায় এনেছি। ২০০৬ সালে মহাজোট গঠন করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আপনাদের পক্ষে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছি। আমার যে কষ্ট আমাকে বেশি তাড়িত করে সেটি হচ্ছে, আমিই প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান জাতির জনকের কবর জেয়ারত করেছি। আমার এখনো ইচ্ছা হয় জাতির কবরে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করি। কিন্তু জাতির জনক তো আমার জনক নয়, আওয়ামী লীগের জনক। আমি অনুরোধ করবো, জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সার্বজনীন করেন। উনি যেন আমাদের সকলের জাতির জনক থাকতে পারেন। দেশ ও জাতির কল্যাণে আমরা এক ও অভিন্ন।
এরশাদ বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন ব্যাংকে সাগরচুরি হয়েছে। তাহলে আর তো কিছু থাকে না। এই সাগর চুরির দায়ী কে? সাগরচুরি বন্ধ করার কী ব্যবস্থা আপনারা নিয়েছেন। বাজেট বক্তৃতায় এর কোন রূপরেখা দেয়া হয়নি। হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়। আমরা এখানে এখানে আলোচনা করি, লুটপাট আরো দ্বিগুণ গতিতে চলে।
যারা লাখ লাখ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি তারা ঋণ অবলোপন করেন। কৃষকদের যে ঋণ দেয় তা কিন্তু অবলোপন করা হয় না। আমি শুনেছি , দেখেছি ৩৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ অবলোপন করেছেন। এই টাকা একটি পদ্মা ব্রিজ করার পরও তো কিছু থাকতো। রিজার্ভ ব্যাংক থেকে টাকা পাচার পৃথিবীর ইতিহাসে এটা প্রথম। পৃথিবীর কোথাও এই ঘটনা ঘটেনি। ফরাস উদ্দিন সাহেব যে একটা প্রতিবেদন দিয়েছেন সেটা কেন প্রকাশ করেন না, কেন অপরাধীদের ঢেকে রেখেছেন? কেন এদের আড়াল করে রেখেছেন। কেন তাদের নাম জনগনের সামনে প্রকাশ করেন না। তাদের বিচার করুন। আপনার কী ভয়। অন্যায় করে বেঁচে যাবে তাতো হতে পারে না। লুট চলতে থাকবে। লুট প্রতিরোধ করার জন্য ব্যবস্থা নেবেন না- এটা বিচারহীনতার লক্ষণ। গত ১০ বছরে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই অর্থ বাজেটের চেয়েও এক লাখ কোটি টাকা বেশি। এই টাকা থাকলে ৪৭ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট দিতে হতো না, ট্যাক্স বাড়াতে হতো না, ভ্যাট দিতে হতো না।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন তিনি ৬ এর গন্ডি অতিক্রম করে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। আপনি হিসাব বের করে দেখেন অর্থনৈতিক খাতে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার লুটপাট না হলে বহু আগেই ৮-৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারতাম। আমি জোর দাবি জানাচ্ছি অবিলম্বে লুটপাটের অর্থ উদ্ধার করা হোক। এর সাথে যারা জড়িত আইনের আওতায় আনা হোক। আমি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানাব সরকারের কাছে।
তিনি বলেন, ২০১১-১২ সালে শেয়ার বাজারে ধবস নেমেছিল। আমরা সেখান থেকে উদ্ধার হতে পারিনি। শেয়ার বাজারের সঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তদন্ত রিপোর্ট আমরা জানতে পারিনি। সমাধান তো দেখিনি। তাহলে এই ধরণের তদন্ত কমিটি করা কী জনগণের সাথে প্রতারণা নয়? এটি কি সুশাসনের মধ্যে পড়ে?
আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটেছে প্রসার ঘটেছে। শিক্ষার মানের কি উন্নত হয়েছে? গত দেড় দশকে আমাদের দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩৩ হাজার। এর অধিকাংশ শিক্ষিত বেকার। তাদের সামনে শুধু অন্ধকার। নিরাশা দূর করতে না পারলে ইয়াবামুক্ত মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে পারব না। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দবি জানান এরশাদ।
সুত্র: নয়াদিগন্ত

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button