sliderস্থানীয়

শিক্ষা নগরী রাজশাহী এখন যানজটের নগরী

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী শহরকে বলা হয় আধুনিক শিক্ষানগরী। শুধু শিক্ষানগরীই নয়, রাজশাহীকে ডাকা হয় সবুজনগরী, শান্তির নগরী, রেশম নগরী কিংবা সিল্ক সিটি নামে। যেখানে গড়ে উঠেছে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পদচারণা, চঞ্চলতা, কোলাহল, গল্প, আনন্দ, উল্লাস, ব্যস্ততা ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় প্রাণবন্ত এক শহর রাজশাহী।

দেশের অন্যান্য শহরের তুলনায় স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে রাজশাহী অনেকের মন জয় করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে পরিষ্কার এবং বায়ুদূষণ মুক্ত শহরগুলোর মধ্যে প্রথমদিকেই রয়েছে রাজশাহী শহর। জেলায় ৩৬৭টি মাদ্রাসা, ১৯৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৯৮৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১০টি কলেজ রয়েছে। দেশের একমাত্র পুলিশ একাডেমি ও পোস্টাল একাডেমিও এ জেলাতেই অবস্থিত। রয়েছে দৃষ্টিনন্দন রাজশাহী কলেজ। নতুন করে সাজানো এই কলেজ দেখলে মনে হতে পারে ইউরোপের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি রাজশাহীর এত সব সুনাম, সুখ্যাতিতে যানজটের কারণে ভাটা পড়েছে। নগরীতে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট। মুলত এই যানজটের কারণ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। অপরিকল্পিতভাবে দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ খাদক অটোরিক্সার লাইসেন্স বা নিবন্ধন। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এই শিক্ষা নগরী এখন যানজটের নগরীতে রুপান্তরিত হয়েছে। বাসা থেকে বের হলেই নাগরিকদের পড়তে হচ্ছে যানজট ভোগান্তিতে। রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বিভিন্ন মেয়াদে আমুল পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজশাহীবাসিকে উপহার দিয়েছেন একটি পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন নগরী । যার প্রশংসা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কাছেও উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে রাজশাহীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০১৬ সালে বাতাসে ক্ষতিকারক ধূলিকণা কমাতে বিশ্বের সেরা শহর নির্বাচিত হয় রাজশাহী। এরপর ২০২০ সালে এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি সিটি অব দ্য ইয়ার সম্মাননা পায় রাজশাহী। এমন দৃষ্টিনন্দন শহরে দিন দিন বেড়েই চলেছে যানজট সমস্যা। যানজট নিরসনে ব্যর্থতার পরিচয় মিলছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের।

রাসিকের অবহেলা ও ট্রাফিক পুলিশের উদাসিনতা যানজটের অন্যতম কারন। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ আইনের প্রয়োগ করেও কমাতে পারছেনা যানজট। দিনের পর দিন তা যেন বেড়েই চলেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ফুটপাত দখল, রাস্তার ধারে গাড়ি পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রীদের উঠা নামা, রাস্তার মাঝে ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ী দাঁড়িয়ে থাকা যানজটের প্রধান কারন। পথচারী ও যাত্রীদের অভিযোগ অপরিকল্পিতভাবে রাসিকের অটো রিক্সার লাইসেন্স প্রদান, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকা এবং নগরীতে সিটিং সার্ভিস এর ব্যবস্থা না থাকায় এমন যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

পুলিশের সামনে রাস্তার মাঝে গাড়ী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও পুলিশের নিরবতা। আবার রাস্তায় দাঁড় করানো যানবাহন হটিয়ে দিলেও চালকরা পরক্ষনে আবারো রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা। সচেতন নাগরিকরা যানবাহন রাস্তায় রাখতে নিষেধ করলে তাদের সাথে চালকদের অশালীন আচরন যেন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নগরীর অভিমুখে প্রবেশ করতে প্রথম বড় যানজটের মুখোমুখি হতে হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটে। এরপর দেখা মিলে ভদ্রা মোড়ে। সেখানে রাস্তার চার ভাগের তিন ভাগ রাস্তা দখল করে ব্যাটারি চালিত রিক্সা ও অটোরিক্সা। যার কারনে মাঝেমধ্যে ঘটছে দুর্ঘটনা। তব নগরীতে যানজটের ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে, বাস টার্মিনাল, কামরুজ্জামান চত্বর (রেলগেট), রেলগেট বাসষ্ট্যান্ড (রাজশাহী-নওগাঁ), রেলগেট থেকে সাহেব বাজার, কুমারপাড়া থেকে রাজশাহী কলেজ গেট, লক্ষিপুর মোড়, আদালতের প্রবেশদ্বার ও কোর্ট ষ্টেশন মোড়। তবে রেলগেট হতে বাজার ও কুমারপাড়া হতে কলেজ গেটের যে যানজট দেখা যায় তার সিংহভাগ কৃত্রিম। এছাড়াও নগরীতে যে সকল কমার্শিয়াল ভবন রয়েছে দুই একটা ছাড়া কোনটিতে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা নাই। যার কারনে রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিং করে মার্কেট ও অফিসে কাজ করা হচ্ছে। অথচ এই সমাধানে দৃষ্টি নেই নগর পরিকল্পনাকারি প্রতিষ্ঠান রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ)’র। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রয়েছে যেন তেনভাবে ভবন নির্মান নকশা (প্ল্যান) পাশের অভিযোগ।

এদিকে যানজট নিয়ে মন্তব্য ও পরামর্শ দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী সভাপতি, সিনিয়র সাংবাদিক আহমেদ সফি উদ্দিন। তিনি বলেন, এই যানজট নিরসনে ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এর মধ্যে পার্কিং এর সুব্যবস্থা করা, চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, অনিয়ম তান্ত্রিকভাবে অটোরিক্সার নিবন্ধন দেওয়া বন্ধ করা, রাস্তার মোড়ে গাড়ি দাঁড়ানো বা যাত্রীদের উঠা নামা বন্ধ করা, ফুটপাত ও রাস্তার উপরে দোকান উচ্ছেদসহ যানজটের কারন সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে রাজশাহীর উন্নয়ন ও পরিবর্তন নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের অবহেলা বা উদাসিনতা রয়েছে। রাজশাহীর উন্নয়নগুলো হচ্ছে একটি গন্ডির মধ্যে। এই উন্নয়নগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। যানজট নিরসনে শহরের বাইরে অর্থাৎ নওদাপাড়া এলাকায় বাস টার্মিনাল করলেও আধুনিকায়নের অভাবে সেই টার্মিনালের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ছে।
এলাকা থেকে সকল ধরনের বাস সরিয়ে নিতে হবে। নগরীর তালাইমারি মোড় থেকে কোর্ট পর্যন্ত পদ্মার পাড় দিয়ে আলাদা বাইপাস বা ফ্লাইওভার ব্রিজ নির্মান করতে হবে এবং বিশেষ বিশেষ পয়েন্টে যাত্রীদের উঠা নামার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এছাড়াও নগরীর আশেপাশে যুগোপযোগী বাজার সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে সাহেব বাজারের উপর চাপ কমবে। প্রতিটি মোড় থেকে ১০০ গজ দুরে যাত্রীদের উঠা নামার ব্যবস্থা করতে হবে। সাহেব বাজার এলাকায় কয়েকটি পয়েন্টে গাড়ি পার্কিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। তবেই সম্ভব হবে নগরী থেকে যানজট নিরসন।

রাজশাহী মেট্রো পলিটন পুলিশের সহকারি উপ-পুলিশ কমিশনার হেলানা আক্তার বলেন, নগরীতে যানজট সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক সভা করেছি। যানজট নিরসনে কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ প্রচেষ্টায় চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

বিশেষ করে রিক্সা ও অটোরিক্সা চালকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। যানবাহন কেথায় দাঁড়াবে, যাত্রীদের কোথায় নামানো যাবে, রাস্তার মোড়ে কোন জায়গায় পার্কিং করা যাবে এগুলো তারা জানেনা। এমনকি তারা ট্রাফিক আইন কি তা জানেনা।এছাড়াও নগরীর কিছু জায়গা রয়েছে, যেগুলো রাসিক মেয়রের নির্দেশনা প্রয়োজন।যেমন সাহেব বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলগেট সিএনজি ষ্ট্যান্ডে যানজট দুর করতে হলে মেয়রের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন তা নাহলে পুলিশের সাথে বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সাথে সম্পর্কের টানা পোড়ন হতে পারে। তবে এই নগরী আপনাদের, এই নগরীর পরিবেশ বান্ধব করতে আপনাদের সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।

এব্যাপারে রাজশাহী কর্পোরেশনের সচিব আল মাহমুদ রনি’র সাথে কথা বললে তিনি জানান, আধুনিক রাজশাহীর কারিগর গণমানুষের নেতা এমএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন যানজট সমাধানে কাজ করছেন। যানজটের বিষয়টি মাথায় নিয়ে ইতোমধ্যে ওভারব্রিজ বা ফ্লাইওভার নির্মান করেছেন, ভদ্রা থেকে কোর্টষ্টেশন পর্যন্ত আরও একটি ফ্লাইওভারের প্রস্তুতি রয়েছে। আর নগরীতে জনসাধারনের চলাচলের জন্য যে পরিমান অটোরিক্সা ও রিক্সা প্রয়োজন সেই পরিমান নিবন্ধন দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। বর্তমানে রিক্সার নিবন্ধন বন্ধ রয়েছে। যানজট নিরসনে দখল হওয়া রাস্তা ও ফুটপাত উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে সিটি কর্পোরেশন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button