sliderবিবিধশিরোনাম

লায়লা কানিজ লাকী গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

মোঃ মাহবুব আলম চৌধুরী জীবনঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকী গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। নামে-বেনামে রয়েছে অঢেল সম্পদ। সরকারি কলেজের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হয়ে কীভাবে তিনি এত সম্পদের মালিক বনে গেলেন- এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এলাকাবাসী বলছেন, রাজাকার ও বিএনপি পরিবারের সন্তান হয়ে কীভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয় এবং এত সম্পদের মালিক বনে যান। এলাকায় কেউ তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পায় না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমান বর্তমানে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। তার প্রথম স্ত্রী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকী। প্রথম সংসারে তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও ফারজানা রহমান ইপসিতা নামের দুই সন্তান রয়েছে। অন্যদিকে আলোচিত ওই তরুণ মুশফিকুর রহমান (ইফাত) মতিউর রহমানের দ্বিতীয় সংসারের প্রথম সন্তান। দ্বিতীয় স্ত্রী ফেনীর সোনাগাজীর এলাকার শাম্মী আখতার।

লায়লা কানিজ লাকী ছিলেন রাজধানীর তিতুমীর সরকারি কলেজের বাংলা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক। শিক্ষকতার পাশাপাশি রায়পুরা উপজেলার মরজালে নিজ এলাকায় প্রায় দেড় একর জমিতে ওয়ান্ডার পার্ক ও ইকো রিসোর্ট নামের একটি বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। সেখানেই ২০১৮ সালের এক দিন তার সঙ্গে পরিচয় হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজীউদ্দিন আহমেদ রাজুর। ২০২৩ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান সাদেকুর রহমান মারা গেলে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে উপনির্বাচনে প্রার্থী হন এবং সংসদ সদস্যের প্রভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হন লায়লা কানিজ। জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটির তিনি দুর্যোগ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক।

শিক্ষক থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া লায়লা কানিজের নামে বেনামে রয়েছে প্রচুর সম্পদ। তার নির্বাচনী হলফনামা থেকে জানা গেছে, বাৎসরিক আয় বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে ৯ লাখ ৯০ হাজার, কৃষি খাত থেকে ১৮ লাখ, শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানতের লভ্যাংশ থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০, উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্মানী বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৫, ব্যাংক সুদ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৯ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা রয়েছে ৩ কোটি ৫৫লাখ টাকা। তার কৃষিজমির পরিমাণ ১৫৪ শতাংশ, তার অকৃষিজমির মধ্যে রয়েছে রাজউকে পাঁচ কাঠা, সাভারে সাড়ে ৮ কাঠা, গাজীপুরে ৫ কাঠা, গাজীপুরের পুবাইলে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, গাজীপুরের খিলগাঁওয়ে ৫ শতাংশ ও ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, গাজীপুরের বাহাদুরপুরে ২৭ শতাংশ, গাজীপুরের মেঘদুবীতে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, গাজীপুরের ধোপাপাড়ায় ১৭ শতাংশ, রায়পুরায় ৩৫ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ ও ৩৩ শতাংশ, রায়পুরার মরজালে ১৩৩ শতাংশ, সোয়া ৫ শতাংশ, ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ, শিবপুরে ২৭ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, শিবপুরের যোশরে সাড়ে ৪৪ শতাংশ, নাটোরের সিংড়ায় ১ একর ৬৬ শতাংশ।

নাম না প্রকাশের শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, শিক্ষকতার আয়ে তার এত সম্পদ থাকার কথা নয়। শুধু অবৈধ টাকার জোরেই লায়লা কানিজ লাকী স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজীউদ্দিন আহমেদের পৃষ্ঠপোষকতায় রায়পুরার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। এসব টাকার সবই তার স্বামী আলোচিত রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের অবৈধ উপার্জন।

মরজাল বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মতিউর রহমান ও লায়লা কানিজ দম্পতির আধুনিক স্থাপত্যের ডুপ্লেক্স বাড়ি।

শুক্রবার (২১ জুন) দুপুরে ওই বাড়িতে গেলে ভেতরে ঢুকতে দেননি বাড়ির দায়িত্বে থাকা কেয়ারটেকার।

এ সময় তিনি জানান, উপজেলা চেয়ারম্যান এখন বাড়িতে নেই। কোনো দরকার থাকলে রায়পুরা অফিসে যোগাযোগ করুন। এখন এখান থেকে চলে যান। আমার নাম জেনে আপনি কী করবেন। টাকা দিবেন, টাকা দেন বক্তব্য দিব। শুধু শুধু ছবি তুলেন। কোনো ছবি কিংবা ভিডিও করবেন না। সমস্যা হবে, চলে যান।

ফটকের বাইরে থেকে দেখা যায়, কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্থাপত্যের বাড়িটি বেশ বিলাসবহুল। আলিশান বাড়ির আলিশান গেট। বাড়ি ভেতরে রয়েছে দেশি-বিদেশি গাছের সারি, সবুজ ঘাসের আঙিনা, পাশে রয়েছে কর্মচারীদের থাকার রুম। বাড়ির ভিতরেই পিছনে রয়েছে সান বাঁধানো ঘাট ও বিশাল লেক।

নাম না প্রকাশ করা শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, বাড়িটির ভেতরে রাজকীয় সব আসবাবপত্র ও দামি জিনিসপত্র রয়েছে। এবাড়িটিতে চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ থাকেন। এটা তার পৈতৃক সম্পত্তি। এখানেই পূর্বে তেমন ভালো কোনো দালান ছিল না। প্রায় দুই বছর পূর্বে এ বিলাসবহুল বাড়িটি নির্মাণ করেন।

ওয়ান্ডার পার্ক ও ইকো রিসোর্টে গিয়ে দেখা গেছে, দেড় একরের বেশি আয়তনজুড়ে পার্কটির অবস্থান। ভেতরে রয়েছে বিলাসবহুল একাধিক কটেজ। নির্ধারিত টাকায় এ কটেজে রাত্রিযাপন করা যায় বলেও জানান পার্কের গেটে থাকা আবু সাঈদ নামে একজন।

এ ছাড়া পার্কে রয়েছে বিভিন্ন বয়সীদের জন্য বেশকিছু রাইড। পুরো পার্কজুড়ে বিভিন্ন ভাস্কর্য ও স্থাপনা এবং বিশাল আয়তনের একটি লেক। স্থানীয়দের কাছে উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকীর পার্ক বলে প্রচার আছে। ছোট পার্কটিকে ক্রমে ক্রমে আধুনিক করে ইকো রিসোর্ট তৈরি করেছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, লায়লা কানিজের বাবা কফিল উদ্দিন আহম্মদ ছিলেন একজন খাদ্য কর্মকর্তা। তার চার মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে লায়লা কানিজ সবার বড়। সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করলেও রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের সঙ্গে বিয়ের পর তার ভাগ্য খুলে যায়। গত ১৫ বছরে তার সম্পদ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। পূর্বে লাকীদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। এছাড়া লায়লা কানিজ লাকী একজন রাজাকারের নাতনি। দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আব্দুল কাদির চেয়ারম্যান ছিলেন রাজাকারদের সংগঠন শান্তি কমিটির সদস্য এবং আব্দুল কাদির চেয়ারম্যান (মরজাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান) ছিলেন চিহ্নিত রাজাকার ময়দর আলী দারোগার মেয়ের জামাতা। এ ছাড়া তিনি বিএনপি পরিবারের সন্তান। তার চাচা এবং মামারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

বিমান বাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরি করে এত টাকার মালিক কীভাবে হলো, এটা আমার বোধগম্য নয়। তিনি আমার জমিসহ অনেকের জমি দখল করেছে। জমি ক্রয় করার কথা বলে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে জমি দখলে নেয়। বাকি টাকা দেওয়ার পর রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হবে বলে কথা থাকলেও তিনি আর কোনো টাকা দেয়নি। জোর করে জমি দখলে নিয়ে ঢালাই করে পার্কের জন্য ব্যবহার করছে। আমি জমির কোনো দলিল করে দেইনি, জোরপূর্বক এখন আমার জমি দখল করে রেখেছে। এ ছাড়া তিনি প্রশাসনিকভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমি একজন দরিদ্র মানুষ আমার তেমন পয়সা নেই, তার অনেক পয়সা, তার বিরুদ্ধে আমি আর কি করতে পারি, এভাবেই আছি, আল্লাহ যদি কোনোদিন বিচার করে।

এ ব্যাপারে মরজাল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সানজিন্দা সুলতানা নাসিমা বলেন, ওনি সরকারি চাকরি করেছেন, উনি সম্মানিত একজন টিচার, এমন অবস্থায় এত সম্পদের মালিক নিয়ে জনমনে প্রশ্নই উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া উনি আওয়ামী লীগের পরিবারের সদস্য না। ওনি একজন রাজাকারের নাতনি। ওনার বাবার বাড়ি বলেন, নানার বাড়ি বলেন সবাই বিএনপি। বিএনপি থেকে ওনি আওয়ামী লীগ সেজেছেন। রায়পুরা উপজেলায় আওয়ামী লীগটাকে ভাগ করে দিয়েছেন। পুরো উপজেলাটাকে তছনছ করে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে রায়পুরা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধার সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ময়দর আলী দারোগা ছিল তৎকালে চিহ্নিত রাজাকার। এটা সবাই জানে। আর ময়দর আলী দারোগার মেয়ের জামাতা আব্দুল কাদির চেয়ারম্যানের কথা আমার মনে নেই। অনেক দিন হয়েছে তো, এটা মনে নেই।

রায়পুরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসাইন বলেন, লায়লা কানিজ টাকার পাহাড় গড়েছেন। রায়পুরার এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর উৎসাহেই রাজনীতিতে এসেছেন তিনি। এ ছাড়া রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু সাহেব প্রভাব খাটিয়ে তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। লায়লা কানিজকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের খুব ক্ষতি করে ফেলেছেন সংসদ সদস্য রাজিউদ্দীন আহমেদ। টাকাই কী সব। আর এসব টাকা তো তার নিজের নয়, স্বামী মতিউর রহমানের।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button