sliderস্থানীয়

যেভাবে উত্থান কেএনএফের

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস বান্দরবানে। ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সব কটি সম্প্রদায়ই আছে এখানে। বম হলো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই সংখ্যালঘু একটি সম্প্রদায়, যাদের মোট জনসংখ্যা ১২ হাজারের মতো। কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ এই সম্প্রদায় থেকে সৃষ্ট সশস্ত্র সংগঠন। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী এ সংগঠনের সদস্য সংখ্যা কমবেশি আড়াইশ।

মঙ্গলবার রাতে বান্দরবান জেলার দুর্গম রুমা উপজেলা সদরে সোনালী ব্যাংক এবং গতকাল বুধবার দুপুরে থানচি উপজেলায় সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতির জন্য পুলিশ ও নির্বাহী প্রশাসন সরাসরি বম জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফকে দায়ী করছে। এর আগেও সংগঠনটির হামলায় দুজন সেনা সদস্য নিহত হন। তারা রুমা এলাকা থেকে পর্যটকদের অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কাজে প্রকাশ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে রুমা উপজেলার দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার এবং থানচির দূরত্ব ৯৩ কিলোমিটার। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের অবস্থান বান্দরবানে। সেখানে চাইলেই খুব দ্রুত যানবাহন চলাচল করতে পারে না। খাড়া পাহাড়ের কোলঘেঁষে নির্মিত সড়কগুলো অপেক্ষাকৃত সরু। ফলে এখানে জায়গাভেদে ঘণ্টায় ১০ থেকে ২০ কিলোমিটার গতিতে যাওয়া যায়। পাহাড়ে গাড়ি চলে সময় ধরে, গতি ধরে নয়। কেএনএফ দুর্গম রুমাকেই তাদের কর্মকান্ডর জন্য বেছে নেয়। এ সংগঠনটির প্রধান হলেন নাথান লনচেও বম, যিনি সংক্ষেপে নাথান বম বলে পরিচিত। বয়স আনুমানিক ৪৪ বছর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম এই সংগঠনের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। সেই সময় রুমার দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার সদস্যদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল কেএনএফ। সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যদের অভিযানের মুখে ওই প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ধ্বংস হয়। কেএনএফ ও জঙ্গি সংগঠনের একাধিক সদস্য ধরা পড়ে।

সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যদের ওই অভিযানের আগে কেএনএফ বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলা ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক সশস্ত্র তান্ডব চালায়। তাদের এ কার্যক্রমের কারণে বান্দরবানে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যায়। দেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম হিসেবে পরিচিত রুমা উপজেলার মুনলায় পাড়া হয়ে পড়ে পর্যটকশূন্য। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে কেএনএফ পিছু হটে। ৩১৯টি পরিবার বান্দরবান ছেড়ে পাশে ভারতের মিজুরাম ও মিয়ানমারে চলে যায়। গত বছরের ৫ নভেম্বর সরকারের সঙ্গে চুক্তির পর ৬৭ পরিবার ফিরে এলেও অন্যরা ফেরেনি মিজুরাম ও মিয়ানমার থেকে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সরকার শান্তিচুক্তি করার সঙ্গে সঙ্গেই এ চুক্তির বিরোধিতা করে জন্ম হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ)। দুটি সংগঠনের প্রধানই থাকেন চাকমা নেতা। পরবর্তী সময়ে এই দুই সংগঠনের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংঘাত পাহাড়কে অশান্ত করে। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার মতো নৃগোষ্ঠীদের বাদ দিলে অবশিষ্ট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন হয়ে পড়েন আরও সংখ্যালঘু। নিজেদের আরও বঞ্চিত ভাবতে থাকেন। গত আড়াই দশকে পাহাড়ে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ করেছে সরকার। তবে ক্ষুদ্র জাতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমেনি। বরং ক্রমশ বেড়ে যাওয়া মানসিক সংঘাতেরই অনিবার্য ফল হয়ে দেখা দেয় কেএনএফ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন আমাদের সময়কে বলে, কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। পাহাড়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিকীকরণের কারণেই তাদের সৃষ্টি। তিনি বলেন, সরকার জনসংহতি সমিতির সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছে। কিন্তু পাহাড়ের অন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো আরও সংখ্যালঘু হয়েছে। তবে রাজনীতি কিংবা অধিকারের নামে কেএনএফ অপহরণ ও ব্যাংক ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে গেছে, যা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।

বর্তমানে পাহাড়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের নেতৃত্বে ছয়টি সংগঠন আছে। এগুলো হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জেএসএস সংস্কারপন্থি, ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক, মগ পার্টি ও কুকিচিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ।

পাহাড়ের নৃগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের নেতৃত্বের বড় অংশজুড়েই আছেন চাকমা নেতারা। বলতে গেলে এক চাকমা জনগোষ্ঠী থেকে যে পরিমাণ নেতৃত্ব, অন্য সব জনগোষ্ঠী থেকে তার কাছাকাছি নেতাও নেই। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নেতারা নিজেদের ছয়টি পাহাড়ি সংগঠনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত আছেন।

না পাওয়ার বেদনা : জেএসএসের সঙ্গে সরকার চুক্তি করলেও পরবর্তী সময় দেখা যায়, পাহাড়ে চুক্তির মাধ্যমে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা বেশির ভাগ লোকজনই চাকমা জনগোষ্ঠীর। আবার জেএসএসকে মেনে নিতে না পারা আরও কিছু চাকমা নেতার নেতৃত্বে থাকে ইউপিডিএফ। এভাবে ক্রমে ছয়টি সংগঠন তৈরি হয়। এর মধ্যে কেএনএফের সঙ্গে সংলাপ চলাকালে তারা সরকারের কাছে তুলে ধরেছে নিজেদের না পাওয়ার বেদনার কথা।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন বলেন, একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি নিয়ে সংঘাত শুরু করলেও কেএনএফ সেই দাবি থেকে সরে গেছে। তবে তারা বঞ্চনার অনেক কথা শুনিয়েছে। কেএনএফের মতে, চুক্তির পর পাহাড়ের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমানভাবে লাভবান হয়নি।

গত বছরের নভেম্বরে কেএনএফের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহলা। তিনি বলেন, সরকার জনসংহতি সমিতির সঙ্গে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি করেছে। এখন অনেক উপদল আছে। এসব উপদল কিংবা দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে একই ধরনের চুক্তি সবার সঙ্গে করতে হবে, এমন আশা করার সুযোগ নেই।
আমাদের সময়

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button