মওদুদ আহমদ যখন রিমান্ডে (৪১) ‘এক লাখ লোকের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি ছিল হাস্যকর’

বুধবার ৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৪৬
আজ যৌথবাহিনীর সদস্যরা আমার ভাই অবসরপ্রাপ্ত একজন ব্যাংক ম্যানেজার শাকেরের বাসায় কোনো নোটিশ ছাড়াই ঢুকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের সামনে দু’ঘণ্টা ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। নিঃসন্দেহে তার জন্য এটা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও বিব্রতকর একটি পরিস্থিতি। শুধু আমারই কারণে আমার সমস্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের কপালে এ ধরনের নির্যাতন ঘটছে। তারা সবাই এখন ভীত, সন্ত্রস্ত ও নিরাপত্তাহীন। মাসকয়েক আগে শাকের জেলখানায় আমার সাথে দেখা করতে এলে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সেনা সদস্যরা জেলগেটে তার কাছ থেকে মোবাইল সেটটি ছিনিয়ে নিয়েছিল। এরপর থেকে সে আর আমার সাথে দেখা করতে আসেনি। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার পর ঘটনা আমার কানে আসে।
আমার ভাগ্নে ডা. হেলাল সেখানে কাজ করে ডেন্টিস্ট হিসেবে। জেলগেটে দেখা করার নিষেধাজ্ঞা আসার পর হাসপাতালে গিয়ে সেই দেখা করার সুযোগ পাই।
চিকিৎসার পাশাপাশি সে সময় আমি হাসনা, আনা ও আমানসহ অন্যদের খোঁজ-খবর নিতে পারি, কখনো বা হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি অশোক বাবুর কাছে টাইপ করতে পাঠাতে পারি এবং পরেরবার সেসব টাইপ করা কপি ফেরত নিয়ে আবার নতুন হাতে লেখা কপি চালান করতে পারি। পাহারারত পুলিশেরা পলিথিন ব্যাগে কাগজ কিংবা মেডিক্যাল রিপোর্টের মতো কিছু কাগজপত্র বলেই মনে করে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে খবর ও তথ্য আদান-প্রদানের এই কায়দাটি হলো কার্যকর একটি পদ্ধতি। এর মাধ্যমে আমি আমার আইনজীবীদের কাছে নিয়মিত নির্দেশনাও পাঠাচ্ছি এবং তাদের জবাবও আসে আমার কাছে। সাথে চলে চিঠি হস্তান্তরের কাজ। কাজেই আমিও যতটা সম্ভব ঘন ঘন হাসপাতালে যাওয়ার উপক্রম তৈরি করি। ডা. হেলাল ও সিনিয়র চিকিৎসকেরাও প্রায়ই অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে সহযোগিতা করেন। অন্যদিকে আমার চিকিৎসার স্বার্থে জেল কর্তৃপক্ষ সেসব অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী ডাক্তার দেখাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে একরকম বাধ্য থাকে ।
বহস্পতিবার ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৪৭
গতকাল চিকিৎসা শেষ না হওয়ায় আজ আবার আমাকে আনা হয়েছে পিজি হাসপাতালের দন্ত বিভাগে। আমার চিঠিপত্র, মামলার নথিপত্র, পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি হাতবদল করার জন্য ডা. হেলাল সহযোগিতা করছে। আমি হাসপাতালে আসছি জেনে আমার কতিপয় আত্মীয়স্বজনও আমার সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পুলিশ আমার সাথে কথা বলার সুযোগ তাদের দেয়নি।
আটদিন রিমান্ডে থাকার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক ফিরে জেলখানায় এসেছেন। নিঃসন্দেহে ওদের ওপর অশেষ নির্যাতন চালানো হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো তিনজন অধ্যাপক আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর তাদের জেলখানায় পাঠানো হয়েছে।
এক লক্ষ লোকের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়টি নিঃসন্দেহে হাস্যকর একটি বিষয়। মামলার অন্তর্ভুক্ত করে হাজার হাজার ছাত্রের ওপর নির্যাতন চালানোর প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে। এসবের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা শিক্ষকদেরও জড়িত করা হচ্ছে। আসলে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকসহ গোটা সমাজের মধ্যে এ নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে শাসকগোষ্ঠী যেন তা অনুধাবনই করতে পারছে না। এর সবই হলো গোটা সমাজব্যবস্থার কাঠামোকে ভেঙে ফেলার একটি ষড়যন্ত্র কিংবা হতে পারে সরকার পরিচালনাকারী শাসককুলের গুটিকয়েক লোকের অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা ও অজ্ঞতারই কুফল তাদের আসল লক্ষ্য কী? তারা আসলে কী করতে চায় মানুষের কাছে তা ঠিক বোধগম্য নয়।
শুক্রবার ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৪৮
৫ই সেপ্টেম্বর রেডিসন হোটেলে সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রধান উপদেষ্টা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে প্রবোধ দিতে গিয়ে বলেছেন যে, সরকার ব্যবসায়ী মহলের ওপর এজেন্সি বিশেষের নির্যাতন ও অসদাচরণের জন্য দুঃখিত এবং এরপর থেকে যৌথবাহিনী এবং টাস্কফোর্স ব্যবসায়ীদের আর কোনো প্রকারে বিব্রত করবে না, ওদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলা দায়ের করা হবে না এবং সংবাদপত্রে ব্যবসায়ীদের নতুন কোনো তালিকা প্রকাশ করা হবে না। কিন্তু বৈঠকের মাত্র একদিন পরে এ নিয়ে শঙ্কিত ব্যবসায়ীদের বিশ্বাসের মর্মমূলে আঘাত লাগা বেদনার উপশম ঘটতে না ঘটতেই দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান সংবাদ মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন যে, ব্যবসায়ীসহ সকল মহলের ওপর দুর্নীতি দমন অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনবোধে কমিশন থেকে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের করণীয় কী হবে? মঈন উদ্দিন বা ফখরুদ্দীনই এর ব্যাখ্যা দেবেন কীভাবে?
সরকার এভাবে সুপরিকল্পিতভাবে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানের ভিত নাড়া দিয়ে চলেছে। সংবিধানে উল্লিখিত দেশের গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলো ধ্বংস করার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে নির্যাতনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হচ্ছে এবং নির্বাহী বিভাগের সম্প্রসারিত একটি শাখা হিসেবে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু এখানেই সব শেষ হয়নি। দুর্নীতি দমন অভিযানের নাম করে সরকার তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠানকেও যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে এ দু’টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। জনগণের ওপর রাজনৈতিক নিষ্পেষণের অস্ত্র হিসেবে এ দু’টি প্রতিষ্ঠানকে এখন প্রকাশ্যভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, অতীতে যা কখনো ঘটতে দেখা যায়নি।
শনিবার ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৪৯
যৌথবাহিনী কার বাড়ির ওপর কখন চড়াও হতে যাচ্ছে তা কেউ জানে না। জনগণ এখন আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় প্রতিদিন কাটাচ্ছে। রাজনীতিবিদ, আমলা কিংবা ব্যবসায়ী যাই হোন না কেন, সমাজের জন্য যারা বিন্দুমাত্র হলেও অবদান রাখতে পারেন, তারা এখন ভয়ে, আতঙ্কে জর্জরিত অবস্থায় বিনিদ্র রজনী কাটাচ্ছে। ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টির কারণে যৌথবাহিনীর ওপর জনগণের ঘৃণা ও তিক্ততার বিষয়টি বোধহয় তাদের জানা নেই। রক্ষীবাহিনী অন্ততপক্ষে কাজ করতো একটি আইনের অধীনে। কিন্তু এই যৌথবাহিনী তাদের নিষ্পেষণ চালাচ্ছে সম্পূর্ণভাবে আইনবহির্ভূতভাবে। কাজেই অত্যাচারে রক্ষীবাহিনীর মাত্রাকে অতিক্রম করতে তাদের আইনগত কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না। তাদের কাজকর্মে কেন্দ্রীয় কোনো কমান্ডের অস্তিত্ব। নেই, কাজের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। দেশের প্রশাসন ব্যবস্থার সাথে তাদের নেই কোনো সংযুক্তি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়।
কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ না থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে চলেছে। জরুরি সময়টাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রবলতম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, দেশব্যাপী বায়িং হাউস ও কলকারখানা বন্ধ হওয়ার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়ে নিঃস্ব ভিক্ষুকে পরিণত হচ্ছে।
রবিবার ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৫০
দশ দিন রিমান্ড শেষে বরিশালের নির্বাচিত মেয়র মুজিবর রহমান সারোয়ারকে সেলে ফিরিয়ে নিয়ে এলে পর রাতের পর রাত যৌথবাহিনীর সদস্যরা তার ওপর যে অবর্ণনীয় দৈহিক ও মানসিক অত্যাচার চালিয়েছে সে তার বিস্তৃত বর্ণনা দিলো। একজন জনপ্রতিনিধি হওয়ার পরও তার ওপর চলেছে অবিশ্বাস্য রকমের নির্যাতন, অপমান ও দুর্ব্যবহার, যা সত্য বলে ভাবতেও কষ্ট হয়। নির্যাতনের ক্ষতচিহ্নগুলো উন্মুক্ত করে আমাকে দেখানোর সময় তার মতো সুগঠিত দেহের লোকটিও হু হু করে কাঁদছিল।
নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন চালানোর জন্যই কি আমাদের দেশের সেনাবাহিনীকে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে? তারা কি তাদের নিজ দেশের নাগরিকদের শত্রু হিসেবে মনে করে? আসলে এ হলো সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র এবং জনগণের সাথে সেনাবাহিনীর এই সংঘাত পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের পতনের পথকেই প্রশস্ত করবে।
সোমবার ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ দিন ১৫১
জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা কতিপয় সুকঠিন শর্তসাপেক্ষে দেশে ঘরোয়া রাজনীতি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তবে নিবর্তনের পালা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক ও ৩২ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্বলিত চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আনীত মামলাও রয়েছে অব্যাহত।
দাঁতের চিকিৎসার জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পিজি হাসপাতালে। ডা. হেলাল ছিল সেখানে। আমি আমার কাগজপত্রের স্বাভাবিক আদান-প্রদান করতে পেরেছি, তবে কাউকে আমার সাথে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
জেলখানায় আমার দর্শনার্থী ও আইনজীবীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো বলবৎ রয়েছে। আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করার অনুমতি চেয়ে স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে লেখা চিঠির জবাব এখনো পাইনি।
সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। মাইনাস-টু থিওরি, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে উৎসাহ দেওয়া, সংস্কারের নাম করে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের ছদ্মাবরণে রাজনীতিবিদদের কারাগারে অন্তরীণ রাখা, জামিনের অধিকার অস্বীকার করা, বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষাবলম্বনে আইনজীবীদের বাধা দেওয়া, রাজনীতিবিদদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালানো, যৌথবাহিনীর মাধ্যমে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করা, টাস্কফোর্স গঠন ও ছবিসম্বলিত ভোটার তালিকা প্রণয়নের নাম করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিলম্ব- এ সবগুলোই এই সরকারের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডারই অংশবিশেষ। (চলবে.৪২.)মানবজমিন

Check Also

বাংলাদেশেই করোনা টিকা তৈরির চেষ্টা চলছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

মানিকগন্জ প্র্তিনিধি :স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক স্বপন বলেছেন, বাংলাদেশেই করোনা টিকা তৈরির চেষ্টা চলছে। ভারতসহ …