sliderশিক্ষাস্থানীয়

“বাবু অজয় কুমার সাহা” প্রাক্তন শিক্ষক , চারিগ্রাম শাহাদাৎ আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়

মো:ফজলুর রহমান,সৌদি আরব: আমাদের শ্রদ্ধেয় অজয় স্যারের বাড়ি শায়েস্তা ইউনিয়নের সাহরাইল গ্রামে। অনেক অনেক স্মৃতি রয়েছ অজয় স্যারকে নিয়ে।

প্রয়াত অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান মাখন মিয়া(মহা পরিচালক, বাংলা একাডেমি), মো:মোসলেম হোসেন বিএসসি, মো: আওলাদ হোসেন বিএসসি এবং আমাদের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো: খলিলুর রহমান স্যার সহ অনেক শিক্ষকই অজয় স্যারের ছাত্র ছিলেন চারিগ্রাম হাইস্কুলে।
এছাড়াও চারিগ্রাম, মহিষদিয়া, সাহরাইল, গোলাইডাংগা ও জামশা সহ আশেপাশের এলাকার অনেক শিক্ষাবিদ অজয় স্যারের ছাত্র ছিলেন।

স্বর্গীয় অজয় স্যার প্রায়শ আসতেন আমার পোদ্দার পট্টির ফার্মেসীতে। চা পান করতেন চিনি ছাড়া। স্যার আসলেই চা অর্ডার দিতাম। স্যার বলতেন,
–ডাক্তার মনে আছে তো, চিনি দিস না। চিনি দিতে মানা করিস।
–আচ্ছা স্যার। ঠিক আছে। আমি জানি আপনি চিনি খান না।
–ওহ! তুর খেয়াল আছে?
— জ্বি স্যার আমার খেয়াল আছে।

একবার এক ঘটনা, মুসলেম হোসেন বিএসসি তখন সাহরাইল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। আর অজয় স্যার চারিগ্রাম হাইস্কুলের শিক্ষক এবং সাহরাইল হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য।

যাহোক আমি ও মোসলেম হোসেন বিএসসি আমার পোদ্দার পট্টির ফার্মেসীতে বসে চা-বিস্কুট খাচ্ছি। হঠাৎ অজয় স্যারের আগমন।
এসেই মুসলেম বিএসসি-র উপর এমন চটে গেলেন। রাগাম্বিত স্বরে বললেন, মুসলেম, তুমি আজও স্কুলে যাওনি? তুমি প্রায়ই স্কুলে অনুপস্থিত থাক। কারণ কি? স্যার সেদিন ভীষণ রেগেছিলেন। এদিকে মোসলেম বিএসসি শুধু বলেই যাচ্ছেন–

স্যার, আপনি রেগে যাচ্ছেন, বসুন এক কাপ চা খান! আপনি স্যার বসুন চেয়ারে।
অজয় স্যার আরও রেগে গেলেন। বললেন না চা ফজলুর রহমান খাওয়াবে ঠিক আছে কিন্তু তুমি আজ স্কুলে যাওনি কেন? এখনই স্কুলে যাও।

আহ! যদিও রাগ, বাক-বিতন্ডা কাহিনী কিন্তু আমার কাছে অজয় স্যারের সেসব কথা হীরা-চুন্নি-পান্নার মত মহা মূল্যবান সম্পদ।
অজয় স্যার কি যে ভালবাতেন আমাকে!
অজয় স্যারের মত একজন প্রবীণ শিক্ষক অত্র এলাকায় আর ছিল না।

অজয় স্যার চারিগ্রাম হাইস্কুলের প্রায় প্রথম দিকের শিক্ষক। চারিগ্রাম হাইস্কুলের জন্মলগ্নে অজয় স্যার সাহরাইল, বালিয়াডাঙ্গি সহ ওই এলাকার বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে চারিগ্রাম হাইস্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।

ছোট বেলায় দেখেছি অজয় স্যার একটা বড় “ভেদি নৌকা” বোঝাই করে ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে চারিগ্রাম হাইস্কুলে আসতেন।

স্যারের বড় ছেলে “আশীষ দা” সে আমাদের সিনিয়র ভাই। তিনিও চারিগ্রাম শাহাদাৎ আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আশীষ দা ভাল ফুটবল প্লেয়ার ছিলেন। চারিগ্রাম মাঠে তার খেলা অনেক দেখেছি। স্পোর্টসেও আশীষ দা ভীষণ ভাল ছিলেন। চারিগ্রাম হাইস্কুলে ইন্টারস্কুলের স্পোর্টস হলে আশীষ দা কে দেখেছি হাই জাম্প, লং জাম্প খেলতে। ওনার সাথে রাজকুমার স্যারের ছেলে বাদল ভাই ও স্বপন দা কে চমৎকার পুল জাম্প খেলতে দেখেছি স্কুল মাঠে। আমরা তখন সবে মাত্র সিক্স/সেভেনের ছাত্র।

যাহোক বলতেছিলাম অজয় স্যারের কথা। অজয় স্যারের একটা সুনাম ছিল চারিগ্রামে। স্যারের অবদান অনেক।
অজয় স্যার ক্লাসে ঢুকলে শয়তান পর্যন্ত ভয়ে পালিয়ে যেত। আমরা কাঁপতে থাকতাম স্যারের ভয়ে যে কখন কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন।
আমার কাকা মাওলানা মোসলেহ উদ্দিন নায়েব আলী সাহেব চারিগ্রাম হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন বিধায় অজয় স্যার আমাকে মসকরা করে মৌলভীর ভাইস্তা বলে ডাকতেন। স্যার আমাকে বলতেন- মৌলভীর ভাইস্তা ….. “আজকের পড়া বল”…..।

স্যার একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন একটা ট্রান্সলেশন বল,-

“শিক্ষক ক্লাসে ঢুকিতে না ঢুকিতে ছাত্ররা সব দাড়াইয়া উঠিল”

আমি সঠিক বলতে পারলাম না। পরে স্যার বলে দিলেন। ক্লাস সিক্সে থাকাকালীন “শশা” ইংরেজি কি জিজ্ঞাসা করলেন। আমাদের বাবুল বল্ল “কাকুম্বার”। স্যার বললেন, ধুর গাধা.. সঠিক উচ্চারণ–

“কিউকাম্বার”(Cucumber)।

১৯৮০ সনে ক্লাস সিক্সে পড়ি। সবে মাত্র ভর্তি হয়েছি সবাই অজয় স্যারের কথা শুনে এমনিতেই ভয়ে ভয়ে আছি হঠাৎ আমার মিতা “ফজলু” কি যেন একটা ভুল করে বসলো। অজয় স্যার ক্যাপ্টেনকে ডেকে বললেন লাইব্রেরী থেকে জোড়া বেত নিয়ে আস।
ক্যাপ্টেন যথারীতি জোড়া বেত নিয়ে এল। খুব সম্ভবত যতদূর মনে পড়ে বেত নিয়ে এসেছিল আমাদের “এডভোকেট খোরশেদ আলম” হা হা হা। দীর্ঘ দিনের কথা। ৪২/৪৩ বছর তো হয়েই গেল।
স্যার কমছে কম ১০/১২ টি বেত দিলেন বন্ধুর পিঠে। শুয়ে পড়লো দোস্ত আমার…। খুব আফসোস হল। ক্লাসে ভয়ে আমরা সবাই চুপ হয়ে আছি। প্রস্রাব করে দেবার মত আমাদের অবস্থা!! অবশ্য আমরাও ছিলাম দুষ্টের শিরোমণি।

আজকাল কি এই ধরনের বেত্রাঘাত কোন ছাত্রকে কোন শিক্ষক করতে পারবে? মোটেও না।
তখন ছিল অন্য রকম এক জামানা। ছাত্ররা শিক্ষকদের সম্মান করতো। ভয় পেত। আজকাল সব শেষ। অবশ্য আজকাল শিক্ষকদের কিছু ভুলও আছে। কিছু শিক্ষক (সবাই নয়) ছাত্রদের সাথে ক্যারাম বোর্ড খেলে, একসাথে বসে টিস্টলে চা খায়। কাজেই কদর কমে গেছে শিক্ষকদের।

শ্রদ্ধেয় স্যার “বাবু অজয় কুমার সাহা” ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

প্রথিতযশা-প্রবীণ-প্রাণপ্রিয় “অজয় স্যার” গত ৩১শে মে ২০১৪ সালে শনিবার সন্ধ্যা ৬:২০মিঃ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button