sliderদূর্ঘটনাশিরোনাম

বাংলাদেশের সড়কে মোটরসাইকেলের কারণে নিরাপত্তা সঙ্কট বাড়ছে

যানজটের মধ্যেও কম সময়ে যাতায়াত এবং তুলনামূলক খরচ কম হওয়ায় মোটরসাইকেল বেশ জনপ্রিয় বাহনে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। তবে সড়কে নিরাপত্তার সঙ্কট তৈরি করেছে এই বাহন।

যদিও ২০২২ সালের তুলনায় গত বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার কমেছে। তবে, এখনো দুর্ঘটনায় প্রধান ভূমিকা পালন করছে দুই চাকার এই বাহন। মৃত্যুর পাশাপাশি অঙ্গহানি, জীবনমানে পরিবর্তনসহ সামগ্রিকভাবে মোটরসাইকেল সম্পর্কিত দুর্ঘটনা ভয়াবহ পরিস্থিত তৈরি করে চলেছে।

সচেতন নাগরিক সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বছরে মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৩-৪০ শতাংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলের কারণে। চলতি বছরের শুরু থেকেই এই পরিসংখ্যান ঊর্ধ্বমুখী।

এনসিপিএসআরআরের পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৮ থেকে ১০ জন মারা যান। যেসব ঘটনার অনেকটাই গণমাধ্যমে আসে না।

সমস্যাটির মূলে রয়েছে সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্ক, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের উপস্থিতি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের অভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

এনসিপিএসআরআরের সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, সড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বৃদ্ধি, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর লাইসেন্স না থাকা, বেপরোয়া চলাচল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বৃদ্ধির কারণ।

এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিআরটিএ’র পদক্ষেপ জোরদারের উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ক্রমবর্ধমান এই সমস্যা মোকাবিলায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন চালক এবং অনিবন্ধিত মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযানের প্রস্তাব করেন আশীষ কুমার।

টানা ৩ মাস সব জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও বলেন তিনি। এই পদক্ষেপকে তিনি সড়কে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে ৬ হাজার ৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯৭৪ জন নারী ও ১ হাজার ১২৮টি শিশুসহ ৬ হাজার ৫২৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী।

আরএসএফ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। যেখানে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায় ২০২২ সালে। তবে, ২০২৩ সালে এই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কারণ, আগের বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা ১৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ ও প্রাণহানির ১৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে।

এসব সত্ত্বেও আরএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, দেশের মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। যার উল্লেখযোগ্য অংশই চালাচ্ছে কিশোর ও তরুণরা। যা ট্রাফিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এর থেকে প্রমাণ হয়, কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগে অভাব রয়েছে। মূলত এসব কারণেই দুঃখজনক পরিণতিগুলো ঘটছে।

ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও বাসের মতো বড় যানবাহনগুলোর সাথে মোটরসাইকেলের ঘন ঘন সংঘর্ষের বিষয় তুলে ধরেন সাইদুর রহমান।

তিনি বলেন, এই যানবাহনগুলোর চালকদের অনেকাংশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকে না। তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রমও করতে হয়। এ কারণে দুর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। এরপরও মোটরসাইকেল জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমার ক্ষেত্রে হাইওয়ে পুলিশের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন সাইদুর রহমান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) আবু রায়হান মো: সালেহও একই অভিমত জানান। তিনি দুর্ঘটনা কমাতে ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগের বিষয় উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, বেপরোয়া গতিতে ও লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল চালানো রোধে পুলিশ তৎপর। তবে এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে অতি উৎসাহী হয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে চালকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পুলিশের এই কর্মকর্তা অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মোটরসাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকতে মা-বাবার দায়িত্বের প্রতি জোর দেন। মা-বাবা ও অভিভাবকদের সতর্কতা বাড়লে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রবণতা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশে এই নিরাপত্তা সংকটে অংশীজনরা সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। এই পরিসংখ্যান ও চিত্রগুলো সামনের দিনগুলোতে চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয় এবং তারা কিছু পদক্ষেপের কথাও উল্লেখ করেন।

তারা বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। এতে সড়ক হবে সবার জন্য নিরাপদ।

সূত্র : ইউএনবি

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button