sliderস্থানীয়

বন্ধু হত্যার মুল হোতা রাব্বি সহ গ্রেফতার ১ ডজন আসামি

মোঃ মাসুদ, কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি : ঢাকা জেলার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন শুভাঢ্যা ইউনিয়নের তেলঘাট এলাকায় রাতভর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে রাসেল (৩২) নামের এক যুবকে হত্যা করেন তার বন্ধুরা, এসময় হত্যার মুল হোতা রাব্বি বাহিনীর প্রধান রাব্বি কে বেশ কয়েকবার ‘আব্বা ডেকেও রেহাই পায়নি’ নিহত রাসেল।

বুধবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল ১১ টায় এবিষয়ে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং এর আয়োজন করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, এসময় উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান গত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই গত ১০ জানুয়ারী অনুমানিক রাত ৮ টার সময় রাসেলকে তার বন্ধু আফতাব উদ্দিন রাব্বির লোক মারফত দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার তেলঘাটে পারভিন টাওয়ারের নিচ তলায় তার নিজ অফিসে ডেকে নিয়ে যায়।

রাসেল রাব্বির অফিসে হাজির হলে সেখানে উপস্থিত রাব্বির অন্যান্য বন্ধুরা রাব্বির নেতৃত্বে রাতভর রাসেলকে এলোপাথাড়িভাবে লাঠিসোঠা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রচন্ড মারধর করে মারাত্মক জখম করে এবং কেচি দিয়ে রাসেলের মাথার চুল কেটে দেয়।

নির্যাতনের একপর্যায়ে রাত ২ টার দিকে রাসেল গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে রাব্বির নির্দেশে ৪/৫ জন লোক রাসেলকে অজ্ঞান অবস্থায় তার বাসায় পৌঁছে দেয় এবং রাসেলের স্ত্রীকে এ বিষয়ে থানা পুলিশ বা কাউকে না জানানোর জন্য হুমকী প্রদান করে আসামীরা চলে যায়।

পরদিন সকালে রাসেলের শারীরিক অবস্থা আরো অবনতি হলে তার স্ত্রী তাকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত মিডফোর্ড হাসপাতাল নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাসেলকে মৃত ঘোষনা করেন। রাসেল মারা যাওয়ার পর রাব্বির অফিসে নিহত রাসেলকে নির্যাতনের বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আলোচিত এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহত রাসেলের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হাওলাদার বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় আফতাব উদ্দিন রাব্বিকে ১ নম্বর আসামী করে ১৩ জন এজাহারনামীয়সহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১৫ জন আসামীর বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

চাঞ্চল্যকর ও ব্যাপক আলোচিত এই হত্যাকান্ডের শুরু থেকেই ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন ও ঘটনায় জড়িত আসামীদের দ্রুত গ্রেফতার করার জন্য ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান (পিপিএম-বার) সার্বক্ষণিক তদারকি ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন। এরই ধারাবাহিকতায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস অ্যান্ড ট্রাফিক-দক্ষিণ) আমিনুল ইসলাম এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরাণীগঞ্জ সার্কেল) শাহাবুদ্দিন কবীর’ বিপিএম, এর নেতৃত্বে একটি চৌকষ তদন্ত টিম চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকান্ডের মূল রহস্য উদঘাটন ও ঘটনায় জড়িত পলাতক আসামীদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে ঘটনার পর থেকেই ব্যাপক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।

এসময় পুলিশ সুপার আরও জানান হত্যাকান্ডের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা পুলিশ হত্যার ঘটনাস্থলে (রাব্বির অফিস) গিয়ে হত্যাকান্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন আলামত জব্দ করে। হত্যাকান্ডে জড়িত এজাহারনামীয় আসামী ছাড়াও তদন্তটিম ঘটনাস্থলের আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া নির্যাতনের বিভিন্ন ভিডিও পর্যালোচনা করে ঘটনায় জড়িত অন্যান্য আসামীদের শনাক্ত করে।

পরবর্তীতে শাহাবুদ্দিন কবীর বিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরাণীগঞ্জ সার্কেল) এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ও দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহাবুব আলম এর সার্বিক সহযোগীতায় এবং ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মাসুদুর রহমান, দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানা এর নেতৃত্বে একটি আভিযানিক দল তথ্য-প্রযুক্তির সাহায্যে ঝিনাইদহ জেলার মহেষপুর থানার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বাঁশবাড়িয়া বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অত্র হত্যাকান্ডের মূল হোতা ১) আফতাব উদ্দিন রাব্বি ২)সজীব (৩৬), ৩) রাজীব (৩৫), ৪) হীরা (৩০), ৫) ফিরোজ (৩১) দের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।

অভিযানের ধারাবাহিকতায় গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভোলা জেলার লালমোহন থানায় অভিযান পরিচালনা করে হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত আসামী ৬) আলমগীর ঠান্ডু (৩৯), ৭) আমির (৩৮), ৮) রনি (৩৫), ৯) দেলোয়ার দেলু (৩৭), ১০) শিপন (৩১), ১১) মাহফুজ (৩৬) ও ১২) মোঃ রতন শেখ (২৮) সহ সর্বমোট ১২ জন আসামীকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারকৃত আসামীরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অত্র হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানান তিনি । আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে অত্র হত্যাকান্ডের কারণ সম্পর্কে জানা যায়, নিহত রাসেল ১ নম্বর আসামী রাব্বির বন্ধু ছিলো,কালিগঞ্জ এলাকায় রাসেল বিভিন্ন ব্যবসায়ীর নিকট থেকে রাব্বির নামে চাঁদা তোলে কিন্তু রাসেল সেই টাকা রাব্বি ও তাদের অন্যান্য সহযোগীদের না দিয়ে নিজে আত্মসাৎ করে, মূলত আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে ও পারস্পারিক মতবিরোধের জেরে রাব্বি ও তার সহযোগীরা রাসেলের উপর ক্ষুদ্ধ হয় এবং রাসেলকে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করে,ঘটনার দিন সন্ধ্যায় রাসেলকে মারার জন্য রাব্বি লোকজন দিয়ে রাসেলকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে আসে,তারপর উক্ত অফিস রুমে রাব্বি ও তার সহযোগীরা মিলে সারারাত রাসেলকে প্রচন্ড মারধর করে ও কেচি দিয়ে রাসেলের মাথার চুল কেটে দেয়।

নির্যাতনের একপর্যায়ে রাসেল তার বন্ধু রাব্বিকে ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকে ও বাঁচার জন্য আকৃতি মিনতি করতে থাকে কিন্তু তার পরেও সবাই মিলে তাকে পালাক্রমে মারতে থাকায় রাসেল গুরুতর আহত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে একপর্যায়ে রাব্বির লোকজন আহত রাসেলকে অচেতন অবস্থায় রাত ২ ঘটিকার দিকে তার বাসায় স্ত্রীর কাছে দিয়ে আসে। পরদিন সকালে রাসেলকে চিকিৎসার জন্য মিডফোর্ড হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাসেল মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। হত্যাকান্ডে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামীদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি ।

অভিযানে গ্রেফতার হওয়া আসামীরা হলেন
১) আফতাব উদ্দিন রাব্বি (২৪), পিতা-বাছের উদ্দিন, মাতা-কানিজ ফাতেমা, সাং-কালীগঞ্জ পূর্ব পাড়া থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ঢাকা।

২) আলমগীর ঠান্ডু (৩৯), পিতা-চান মিয়া, মাতা সেলিনা, সাং-চর খেজুরবাগ, থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, জেলা-ঢাকা

৩) মো: আমির হোসেন (৩৮), পিতা-মৃত আব্দুল মজিদ হাওলাদার, মাতা আম্বিয়া সাং চর খেজুরবাগ থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, জেলা-ঢাকা (ভাসমান)।

৪) মো: শিপন (৩১) পিতা-মোস্তাক আহমেদ, মাতা-মৃত সোনিয়া বেগম, সাং-মাছিমপুর জবেদ আলী চেয়ারম্যানের বাড়ি সংলগ্ন থানা-তিতাস, জেলা-কুমিল্লা বর্তমান চর মীরেরবাগ মোস্তাক আহমেদের বাড়ি থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

৫) দেলোয়ার দেলু (৩৭) পিতা-ফজল মাতবর, মাতা-মরিয়ম, সাং-নাউডোবা নাসি মাতবরের বাড়ী সংলগ্ন থানা-জাজিরা জেলা-শরিয়তপুর বর্তমান সাং চর খেজুরবাগ থানা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

৬) মো: রনি (৩৫), পিতা-আব্দুর রহিম, মাতা-হালিমা বেগম, সাং-চর খেজুরবাগ, থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, জেলা-ঢাকা (ভাসমান)।

৭) অনিক হাসান হিরা (৩০), পিতা-মো ইয়াছিন, মাতা-হেলেনা বেগম, সাং-কইয়া গাও, ষোলঘর ইউপি, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ এপি সাং সবুজ ছায়া, চুনকুটিয়া নাজিরের বাগ দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ঢাকা।

৮) মোঃ সজীব (৩৬), পিতা-আলমগীর হোসেন, মাতা-জোৎস্না বেগম, সাং-কালীগঞ্জ পশ্চিম পাড়া প্রাইমারি স্কুল রোড, থানা- দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

৯) ফিরোজ (৩১), পিতা-মো খোকন, মাতা-ফরিদা বেগম, সাং-টিয়াখালী থানা সাগরদি জেলা বরিশাল এ/পি কালীগঞ্জ দিশারী রোড মুন মিয়ার বাসার ভাড়াটিয়া থানা- দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ঢাকা।

১০) রাজীব আহমেদ (৩৫), পিতা-হাজী গিয়াস উদ্দিন, মাতা-হাজী লুৎফুন নাহার, সাং-কুলপদ্দি, থানা+জেলা মাদারীপুর এপি- সাং আগানগর ইস্পাহানি, হাউজ নং ৩ রোড নং ৫ থানা-দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ঢাকা।

১১) মো: মাহফুজুর রহমান (৩৬), পিতা-আব্দুল মালেক মাতা জাহানারা বেগম সাং চরকসবিয়া থানা -লালমোহন জেলা ভোলা বর্তমান কালীগঞ্জ তেলঘাট ওয়াজেদ আলীর বাড়ির ভাড়াটিয়া থানা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।

১২) মোঃ রতন শেখ (২৮), পিতা-মৃত শাহ আলম শেখ, মাতা-রহিমা বেগম, সাং-দশাত্তর, থানা-টঙ্গীবাড়ী, জেলা-মুন্সীগঞ্জ এ/পি তেলঘাট আবুল মিয়ার বাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ জেলা-ঢাকা। পূর্ব জুরাইন কদমতলী থানা ডিএমপি বোনের বাসা হতে গ্রেফতার।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button