sliderআন্তর্জাতিক সংবাদশিরোনাম

পুতিন-নাভালনি ক্ষমতার ব্যতিক্রমী লড়াই

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রায় ২১ বছরের ক্ষমতার মেয়াদে তার সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছেন বিরোধী দলীয় নেতা অ্যালেক্সি নাভালনি। তার ওপর নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ গত বছর আগস্টে তার ওপর স্নায়ুগ্যাস প্রয়োগ করা হয়েছে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন নাভালনি। তাকে জেল দেয়া হয়েছে একাধিকবার। কিন্তু কোনোকিছুতেই তিনি পিছপা হচ্ছেন না। তার মুখ বন্ধ করতে পারছেন না পুতিন। এ নিয়ে অনলাইন গার্ডিয়ানে একটি প্রতিবেদন লিখেছেন লুক হার্ডিং।
নাভালনিকে গত মঙ্গলবার আদালতে তোলা হয়েছিল। তিনি জানতেন তাকে জেল দেয়া হবে। এমন রায়ের জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন। মস্কোর আদালতে পিছনের সারিতে বসা ছিলেন তার স্ত্রী ইউলিয়া। তার দিকে তিনি ভালবাসার প্রতীক হার্ট প্রদর্শন করলেন। নাভালনি হাসলেন এবং কাঁধ ঝাঁকালেন। তার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, কষ্ট নিও না! সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। পিছন থেকে জবাবে হাত নাড়েন ইউলিয়া।
গত সপ্তাহের এই বিচারকে রাশিয়ার ভবিষ্যত নির্ধারণকারী দু’ব্যক্তির মধ্যে লড়াইয়ের একটি পর্ব বলে আখ্যায়িত করেছেন লুক হার্ডিং। তিনি লিখেছেন, এ দু’জনের মধ্যে একজন কাঠগড়ায় দাঁড়ানো। তিনি রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা। তবে বর্তমানে তিনি বিশ্বের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। কেউ কেউ তাকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনা করেন। লড়াইয়ের অন্যপাশে রাশিয়ার দু’দশকের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি সাবেক কেজিবির একজন কর্নেল। দৃশ্যত, তিনি ক্ষমতায় অটুট থাকার পথ পাকা করে নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে জনপ্রিয় বিদ্রোহকে তিনি দমন করেছেন, করেন। এই দুই নেতার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জিতবে কে? নাভালনির চেয়ে পুতিনের হাতে ক্ষমতা বেশি। রাষ্ট্রযন্ত্র তার। তিনি যা বলবেন, তাই হবে। কিন্তু নাভালনির অস্ত্র হলো বিশ্বের সমর্থন। তার নেতাকর্মীদের সমর্থন। এই লড়াইয়ের শেষ পর্ব গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হলো। তাতে জিতে গেছেন পুতিন। নাভালনিকে দুই বছর আট মাসের জেল দেয়া হয়েছে। যুদ্ধে যাওয়া একজন বর্ষীয়ান যোদ্ধাকে অবমাননার অভিযোগে শুক্রবার তাকে আদালতে তোলা হয়েছিল। তবে এখানেই শেষ নয়। নাভালনির বিরুদ্ধে আরো মামলা হবে বলে মনে করা হয়। কারণ, তিনি এখন পুতিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কাছে জিম্মি।
কিন্তু নাভালনির ক্ষেত্রে পুতিনের যেটা করার কথা ছিল তিনি তা করেননি। এটা পুতিনের নীতির বিরুদ্ধে। তার নীতি হলো, যেকেউ যদি তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের চেষ্টা করেন তাহলে তিনি দুর্নীতিবাজ অথবা তার ওপর আস্থা রাখার জন্য তিনি খুবই দুর্বল। বেশ কয়েক বছর ধরেই নাভালনি ইস্যুতে ক্রেমলিন দ্বিধাদ্বন্দ্বে। নাভালনির দুর্নীতি বিরোধী ভিডিও এবং তদন্ত প্রকাশ করে দিয়েছে রাশিয়ার অনেক গোপন সত্য। এর ফলে তাকে অনুসরণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি জেল, জুলুমকে অবজ্ঞা করেছেন। স্পষ্টভাবে এর কোনো মেথড বা পদ্ধতিই কাজ করেনি। বার বার তিনি হুমকি ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিকে উড়িয়ে দিয়েছেন। নাভালনির অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ পুতিন তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশে নাভালনির সাইবেরিয়া সফরের সময় তার ওপর গত গ্রীষ্মে বিষ প্রয়োগ করে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবি’র ছদ্মবেশী টিম। কপালগুণে এ যাত্রায় রক্ষা পান নাভালনি। তিনি কোমায় চলে যাওয়ার পর জার্মানিতে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। সুস্থ হয়ে দেশে ফিরতেই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। তাকে এফএসবি হত্যার চেষ্টা করেছিল বলেও অভিযোগ করেছেন।
এ অবস্থায় ক্রেমলিন হয়তো হিসাব কষেছিল যে, বার্লিন থেকে নাভালনি হয়তো আর দেশে ফিরবেন না। কিন্তু তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিলেন তিনি। গত ১৭ই জানুয়ারি তিনি পুতিনের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মস্কোতে ফেরেন। দেশে পৌঁছামাত্র তাকে গ্রেপ্তারের ফলে রাশিয়াজুড়ে বিক্ষোভ হয়। ১৮০টি শহরে বিক্ষোভ হয় ক্রাইমিয়া থেকে ভ্লাদিভস্তক পর্যন্ত। এমনকি ইয়াকুতস্কে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বিক্ষোভ করেন তার ভক্তরা। এই সমর্থন তিনি এমনি এমনি পান নি। এর জন্য তাকে অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে। এ জন্যই তাকে দেখা হয় পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে, যিনি ক্রমশ অমিত সাহসী হয়ে উঠছেন। একটি ক্লাবের ২৪ বছর বয়সী সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ভ্লাদিস্লাভ বলেন, নাভালনি যে একেবারে সাধু তা নয়। তবু দেশে এখন যা ঘটছে, দেশগুড়ে প্রশাসনে যা ঘটছে, যেভাবে চুরি হচ্ছে, তাতে নাভালনি ক্ষমতায় থাকলে এর চেয়ে ভাল থাকতো দেশ। হাঁটু সমান তুষারের মধ্যে দাঁড়িয়ে অন্য মানুষদের সঙ্গে বিক্ষোভ করছিলেন ভ্লাদিস্লাভ। তার পাশেই ছিলেন তরুণ, যুবকরা। তাদের একজন ২২ বছর বয়সী নাস্তিয়া। তিনি বলেন, একজন ব্যক্তিকে তার রাজনৈতিক ধারণার জন্য জেলে দেয়া উচিত নয়। মূল কথা হলো ভয় করা যাবে না এবং ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই আমিও ভয় পাচ্ছি। আমাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে। তবুও ভয়কে জয় করতে হবে।
তাদের এই বিক্ষোভ, জমায়েতকে বেআইনি সমাবেশ আখ্যায়িত করে এর জবাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ওপর লাঠিচার্জ ও সহিংস হামলা চালানো হয়েছে। দাঙ্গা পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষকে। মস্কোর জেলখানাগুলো উপচে পড়ছে মানুষে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের ফ্রিজিং ভ্যানে কয়েক ঘন্টা আটকে রাখা হয়েছে তাদের। টার্গেট করা হয়েছে সাংবাদিকদের। তাদেরকে প্রহার করা হয়েছে। একটি রিটুইটের কারণে একজন খ্যাতনামা সম্পাদককে ২৫ দিনের জেল দেয়া হয়েছে।
নাভালনি নিজে একজন প্রশিক্ষিত আইনজীবী এবং রিক অ্যান্ড মর্টি কার্টুনৈর ভক্ত। তিনি কোনো আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আসেননি রাজনীতিতে। তিনি এসেছেন ভিন্ন একটি জগত থেকে। তাকে সরিয়ে দিতে রাষ্ট্রের আছে অনেক শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল, অনুগত নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যবস্থা, আছেন অনুগত বিচারক ও প্রসিকিউটর, চটকদার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন- যা শুধু নাভালনি বিরোধী প্রচার প্রচারগান্ডা ছড়ায়। কিন্তু নাভালনির অস্ত্র তিনি নিজে। তিনি যেভাবে মানুষের মনে ঢুকে যান তা বিরল। আরেকটি অস্ত্র হলো- তার কোনো ভয় নেই। এমনটা মনে করেন লন্ডনভিত্তিক নাভালনির দুর্নীতি বিরোধী ফাউন্ডেশনের পরিচালক ভ্লাদিমির আশুরকভ। তিনি বলেন, পুতিনের তুলনায় নাভালনি ব্যতিক্রম। তার আগ্রহ দেখে আমি বিস্মিত হয়। তিনি অনেক বিষয় গায়ে মাখেন না। তিনি জগিং পছন্দ করেন না। কিন্তু নিয়মিত ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার দৌড়ান। তিনি পাইথন নামের প্রোগ্রামিং শিক্ষা দেন নিজেকে। তিনি একজন মজাদার মানুষ।
লিথুয়ানিয়াভিত্তিক নাভালনির আরেক সহযোগী লিওনিদ ভলকোভ বলেন, পুতিনের মুখ নামিয়ে আনতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ নাভালনি। তিনি বড় লক্ষ্য ধারণ করেন সবসময়। তিনি জানেন, রাশিয়ার বিরোধীরা ঐতিহাসিকভাবে জিতবে। পুতিনের তুলনায় আমরা তরুণ, তবে তার চেয়ে আমরা স্মার্ট। আমাদের আন্দোলন হলো সত্য ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে। আর আমাদের প্রস্তাবনা হলো- দুয়ে দুয়ে চার হয়। মানবজমিন

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button