sliderস্থানীয়

পর্যটকদের নৌকা ভ্রমনে মুখরিত চলনবিল

নাসিম উদ্দীন নাসিম : যান্ত্রিক জীবনের প্রশান্তি আনতে বাংলাদেশের বৃহত্তরবিল চলনবিলে নৌকা ভ্রমণে আগ্রহ বেড়েছে পর্যটকদের। চলনবিলের ইতিহাস- ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা এবং ভরা বর্ষায় পর্যটকদের নির্মল বিনোদন ও চলনবিলকে উপভোগ্য করতে গড়ে উঠেছে কয়েকটি বিনোদন কেন্দ্র। তার মধ্যে উল্লেখ্য গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল বিলশা এলাকায় অবস্থিত “স্বর্ন দ্বীপ”।
উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশায় ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘স্বর্ন দ্বীপ’টি নাটোরের সিংড়া ও সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত। গুরুদাসপুর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন নাম দিয়েছিলেন ‘স্বর্ন দ্বীপ’।
চলনবিলের বিশাল জলরাশির উত্তাল ঢেউ, বিশুদ্ধ বাতাস, শ্রাবনের জোসনা, মেঘ রৌদ্দুর খেলা, জেলেদের ডিঙি নৌকায় মাছধরা, পিকনিক পার্টির নৌকায় উম্মাদনা ইত্যাদি উপভোগ করা যায় এই বিনোদন কেন্দ্রে বসে। তাছাড়া বিনোদন কেন্দ্রের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই খুবজীপুর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘চলনবিল জাদুঘর। এই জাদু ঘরটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ। সেখানে রয়েছে চলনবিলের হাজার বছরের কৃষ্টিকালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা দর্শন। বর্তমানে জাদুঘরটি সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালতি হচ্ছে।
পাশের সিংড়া উপজেলায় রয়েছে ঘাসি দেওয়ানের মাজার তাড়াশ উপজেলায় রয়েছে জমিদার বাড়ি ও নওগাঁয় রয়েছে শাহ্ শরীফজিন্দানী (রা.) মাজার শরীফ। আর নাটোর সদরে রয়েছে উত্তরাগণভবনসহ রানীভবনীর স্থাপনা।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ তমাল হোসেন বলেন, এশিয়ার বড় বিল হচ্ছে চলনবিল। দেশের নানা প্রান্ত থেকে বর্ষায় চলনবিলের নির্মল আনন্দ উপভোগ করতে ছুটে আসেন মানুষ। কিন্তু পর্যটকদের বসার জায়গার, গাড়ি পার্কিং- আলোসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারনে পরিবার নিয়ে কিংবা দলগত ভ্রমনটি উপভোগ্য ছিলনা। পর্যটকদের এসব সুবিধা নিশ্চিত করে গড়ে উঠেছে স্বর্ণ দ্বীপসহ কয়েকটি বিনোদন কেন্দ্র। স্থানীয় সাংসদ মো. আব্দুল কুদ্দুস ও জেলা প্রশাসকের সহযোগীতায় এসব সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। তবে বিনোদন কেন্দ্রগুলো গড়ে উঠেছে ব্যক্তি উদ্যোগে। আগামীতে পর্যটকদের সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসন পদক্ষেপ নিবে।
গত শুক্রবার বিকালে গিয়ে দেখাগেছে, চলনবিলের থই থই পানির মাঝে মাটি ফেলে উঁচু করে সেখানে তৈরি করা হয়েছে ঘর। বসার জন্য রাখা হয়েছে চেয়ার-টেবিল। আর রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য টেবিলে বসানো হয়েছে পর্যটন ছাতা। রয়েছে চা-কফিসহ নানা রকম কন্জুমার খাবার। রয়েছে টয়লেট সেবাও। বৃষ্টি শুরু হলে বিনোদন কেন্দ্রের বারান্দায় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মূল সড়ক থেকে বিনোদন কেন্দ্রে চলাচলের জন্য প্রায় ৩০০ মিটার বাঁশের সেতু তৈরি করা হয়েছে। এই বিনোদন কেন্দ্রকে ঘিরে চলনবিলে বেড়ানোর জন্য রয়েছে দ্রুতযান (স্পীডবোড) ডিঙি ও ছইয়ের নৌকা। দরদাম করে ভাড়ায় ইচ্ছামত বেড়ানো যাচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নৌকা চলনবিল বিলশায় ঘুরতে আসেন এবং স্বর্নদ্বীপ কফি হাউজে বসেন।
বিনোদন কেন্দ্রের উদ্যোক্তা একজন কৃষক। তাঁর নাম মো. রমিজুল ইসলাম (৪৫)। বিলশা গ্রামেই তার বাড়ি। খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলামের উৎসাহে বিনোদন কেন্দ্রটি তৈরি করেছেন তিনি।
রমিজুল ইসলাম জানান, চলনবিলের বিলশা বাজারের অদূরে তার পরিবারের ৪০ বিঘা জমি রয়েছে। ওই জমির পশ্চিম পাশের মাথায় এক বিঘা জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেছেন ‘স্বর্ন দ্বীপ’ নামে বিনোদন কেন্দ্রটি। এজন্য খরচ হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা। চলনবিলের উত্তাল ঢেউ থেকে বিনোদন কেন্দ্রটি যাতে ভেঙ্গে না যায় সে জন্য- চার পাশে ইট ও বালির বস্তা ফেলেছেন তিনি।
প্রায় তিন বছর থেকে চালু হয়েছে বিনোদন কেন্দ্রটি । প্রতিদিন গড়ে ১০০০ থেকে ২৫০০ জন মানুষ আসেন এখানে। বেচাবিক্রিও হয় ভালো। তবে বাণিজ্যিক ভাবে চিন্তা করা হয়নি। মানুষের একটু বসার জায়গা আর বিনোদনের কথা ভেবেই এটি করা হয়েছে। বর্ষায় মানুষের সমাগত বেশি হয়। শুকনো মওসুমে সন্ধ্যার পর ভীড় থাকে। প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নানা শ্রেনি পেশার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে আসেন অবসর কাটাতে। তবে ঈদকে ঘিরে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
বিনোদন কেন্দ্রে কথা হয় আনারুল ইসলাম, আনিসুর রহমান, পপি আক্তারসহ কমপক্ষে ২০ জনের সাথে। তাঁদের ভাষ্য, উপজেলায় বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। দিনমান কর্ম ব্যস্ততায় কাটে। শেষ বিকালে একটু প্রশান্তির জন্য চলনবিলে আসি। ক্লান্ত ঝেরে ফেলে ফ্রেস হয়ে বাড়ি ফিরি।
খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলাম জানান, ২০১০ সালে স্থানীয় সাংসদ মো. আব্দুল কুদ্দুস গুরুদাসপুর-তাড়াশ পর্যন্ত চলনবিলের মাঝ দিয়ে একটি পাকা সড়ক ও ‘ মা-জননী সেতু” নির্মান করেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারনে স্থানীয় লোকজনসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ চলনবিল দেখতে আসছেন। তাদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে বিলশার ‘মা-জননী সেতু’ ও বিনোদন কেন্দ্রে ২৫টি সোলারপ্যানেল, বসার জায়গা, গাড়ি পার্কিং-নিরাপত্তাসহ নানা রকম সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। পর্যটকরা যাতে চলনবিলকে উপভোগ করতে পারে সেজন্য বিলের মাঝে বিনোদন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিকাল থেকে গভীররাত পর্যন্ত মানুষের সমাগত ঘটে সেখানে।

Related Articles

Back to top button