sliderফিচারশিরোনাম

কমরেড আজিজুর রহমান এর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সামিম ইমাম : আজ ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় সম্পাদক মণ্ডলীর অন্যতম সদস্য (বর্তমানে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ), বাংলাদেশ কৃষক খেতমজুর সমিতির অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা আজীবন বিপ্লবী কমরেড আজিজুর রহমানের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের এই দিনে তিনি ৭৬ বছর বয়সে ঢাকাতে মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় কৃষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলেন। এই অঞ্চলে ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে ঘেরবিরোধী কৃষক আন্দোলন, জলাবদ্ধতা নিরসনের আন্দোলন এবং ভূমিহীন আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। খুলনার ডুমুরিয়া, রূপসাসহ অসংখ্য অঞ্চলের কৃষক আন্দোলনেও তার বলিষ্ঠ ভূমিকা রয়েছে। এছাড়াও একটা পর্যায়ে ঢাকায় আসার পরে জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন, গার্মেন্টস শ্রমিক সহ শ্রমজীবী মানুষদের সংগঠিত করা সহ জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
কমরেড আজিজুর রহমান ১৯৪৪ সালে বর্তমান ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থানার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রিটিশ জাহাজের একজন সাধারণ নাবিক। ঐ চাকরিজনিত কারণে বাবার সান্নিধ্য তিনি শৈশবে তেমন একটা পাননি। মূলত মায়ের উৎসাহ-উদ্দীপনায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু। কেরোসিনের কুপির আলোয় পড়াশোনা করে তিনি ঐ গ্রামের জুগিভরাট প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তিলাভ করেন- তার গ্রামসহ আশপাশের অনেক গ্রামের মধ্যে তিনিই ওই সময়ে প্রথম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিলাভ করেছিলেন। এরপর মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার আরএসকেএইচ ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে পাড়ি জমান খুলনা জেলায়। খুলনার দৌলতপুরে অবস্থিত হাজী মুহম্মদ মহসীন স্কুল থেকে ১৯৬৩ সালে এসএসসি পাস করেন।
খুলনার ব্রজলাল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান শাখায় পড়ার সময়ে ঐ কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ প্রয়াত মুসা আনসারীর সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত হন। ঠিক একই সময়ে তিনি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির গ্রুপ কমিটির অন্তর্ভুক্ত হন এবং অবিভক্ত ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসেবে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৪ সালে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি সহ তার সহযোদ্ধারা সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামে দৌলতপুর অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল মাসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ ও মতিয়া গ্রুপে বিভক্তির সময় তিনি সহ খুলনা জেলার অধিকাংশ নেতা-কর্মী এই বিভক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সঙ্গে সংযুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি বিপুল ভোটে খুলনা পলিটেকনিক কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর চাকরিতে যোগদান না করে তিনি তৎকালীন পার্টির সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।
আন্তর্জাতিক মতাদর্শিক মহাবিতর্কের কারণে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলে কমরেড আজিজ ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা ইপিসিপিএমএলের পক্ষে অবস্থান নেন। এ সময় তিনি খুলনার বয়রা অঞ্চলে অবস্থানরত তিনটি কড়াই কোম্পানির মানবেতর জীবনযাপনকারী শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং ৮ ঘণ্টা শ্রম সময়ের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে আন্দোলন চলাকালে গ্রেপ্তার হন-১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি কারান্তরীণ থাকেন।
১৯৭১ সালে ইপিসিপিএমএলের একইসঙ্গে দুই শত্রুর মোকাবিলার ভ্রান্ত লাইন গোটা পার্টিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। তখন কমরেড আজিজ এই বাম হঠকারী লাইনের পক্ষে থাকলেও কিছুদিন পরেই এই লাইন যে ভুল সেটা উপলব্ধি করেন। তিনি ১৯৭৩ সালে এই বেআইনি পার্টির খুলনা জেলা সম্পাদক এবং ১৯৭৫ সালের কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির বিকল্প সদস্য নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে মাও-সে-তুংয়ের ‘দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের ওপর তাঁর নেওয়া পার্টি ক্লাসে সুরাইয়া ইয়াসমিনের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। ১৯৭৩ সালে দু’জনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ১৯৭৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনে কমরেড আজিজ গ্রেপ্তার হন এবং ৩ বছরের বেশি সময় ধরে খুলনা, যশোর ও রংপুর জেলে কারান্তরীণ থাকেন। এই সময়ে বাইরে অবস্থানরত তৎকালীন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির (এম-এল) বেশ কয়েকজন নেতা এবং জেলের ভেতর থেকে কমরেড আজিজ সহ আরও কয়েকজন পার্টির বাম হঠকারী লাইন পরিত্যাগ করেন এবং প্রকাশ্য পার্টি গড়ে তোলা ও গণআন্দোলন-গণসংগঠন গড়ে তোলার লাইন গ্রহণ করেন। এই সময়ে তিনি বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মেনন-রনো) ঐক্যবদ্ধ হলে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৪ সালে এই পার্টির যশোর কংগ্রেসে পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃপার্টি সংগ্রামে তিনি ছিলেন অন্যতম নেতা। ২০০৯ সালে এই পার্টির সঙ্গে সুনির্দিষ্ট মতাদর্শিক পার্থক্যের ভিত্তিতে তিনি, কমরেড হায়দার আকবর খান রনো ও কমরেড আবদুস সাত্তার সহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ওয়ার্কার্স পার্টি পরিত্যাগ করেন এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হলে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। তিনি সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী হিসেবে সাতক্ষীরা-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী চীন, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে বিভিন্ন পার্টি কংগ্রেস এবং গণসংগঠনের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন।
তিনি শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনতার জীবনের সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিলেন, তাদের জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন তাদেরই একজন প্রিয়তম নেতা।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button