উৎপাদনে রেকর্ড ভাঙছে বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক ডেস্ক : পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যে পরিচিতি আর ভাবমূর্তি ছিল সেটি পাল্টেছে বহুভাবে। স্বাধীনতার ৫ দশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত উৎপাদন বাড়ায় এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। এতে দেশীয় চাহিদা যেমন পূরণ হচ্ছে, তেমনি শস্য, মাছ এবং মাংস উৎপাদনে নিজেদের রেকর্ড ভাঙছে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার ৫০ বছরে বেশ কিছু পণ্য রপ্তানিতেও বিশ্বে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। ৭০-এর দশকে স্বাধীন বাংলাদেশকে খাদ্য ঘাটতি, দুর্ভিক্ষ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত জনপদ হিসেবে চিনেছে বিশ্ববাসী। ১৯৭০-৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন ছিল ১০.৮ মিলিয়ন টন, এখন সেখানে ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় চার গুণ বেড়ে ৩৮.৭ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে হিসাবে ধরে বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য তথা চালের বর্তমান চাহিদা প্রায় ৩৫.৩ মিলিয়ন টন।
মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে লাল-সবুজের বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এই অর্জন বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রার এক মহান মাইলফলক।

চলতি বছরের ২৯শে নভেম্বর কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলনের একটি অধিবেশনে বলেন, ২০১৫ সাল থেকে খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমাদের বর্তমান লক্ষ্য পুষ্টিকর এবং মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, মানসম্মত এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে আমরা জনগণ এবং কৃষকদের আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছি। মন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেন, জনগণের আয় কমে যাওয়ায়, ক্রয় ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়েছে। গত অর্থবছরে মোটা চালের গড় দাম খুচরা বাজারে ১০.৮৯ শতাংশ এবং পাইকারি বাজারে ১০ শতাংশ বেড়েছে।
মানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য বিভাগে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২১-এ এটি ১১৬টি দেশের মধ্যে ৭৬তম অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশী ভারত ৭১তম এবং মিয়ানমারের অবস্থান ৭২তম, পাকিস্তান ৭৫তম, শ্রীলঙ্কা ৭৭তম এবং নেপাল ৭৯তম স্থানে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরিব-ধনীর মধ্যে সম্পদ ও আয়ের ব্যবধান, মানসম্পন্ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত কঠিন করে তোলে। উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করা সত্ত্বেও অনেক সময় উচ্চমূল্যের কারণে বাজার থেকে খাদ্য কিনতে পারছে না মানুষ। তাদের মতে, একজন কৃষক তার প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সব খাবারই উৎপাদন করেন না। ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় কৃষক বর্তমানে তিন থেকে চার গুণ বেশি উৎপাদন করেন। কিন্তু সীমিত বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষক ও বাজারের মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে সুফল মিলছে না। তিনি বলেন, বাজার মূল্যের চেয়ে তিনগুণ কম মূল্য পান কৃষকরা। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষক। বাজারে দাম বেশি। কিন্তু কৃষকের কাছে দাম কম। দামের ব্যবধান চাষিদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অতএব, খাদ্যে ভেজাল এবং খাদ্য দূষণও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। কারণ ভেজাল খাদ্য জনস্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬৯ মিলিয়ন। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন প্রায় চার গুণ বেড়ে ৩৮.৭ মিলিয়ন টন হয়েছে। বর্তমানে চালের চাহিদা প্রায় ৩৫.৩ মিলিয়ন টন। একইভাবে গত ৫০ বছরে আলুর উৎপাদন প্রায় ১৩ গুণ বেড়েছে, ভুট্টা ১৯০০ গুণ এবং গম ১০ গুণ।
কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরা ও সবজি চাষে তৃতীয়, ধান ও তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে চতুর্থ, মিঠা পানির মাছ চাষে পঞ্চম, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ এবং আম ও পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে।

২০১০ সালে ৩১.৫ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে মাথাপিছু ক্যালরির পরিমাণ কমে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশে দৈনিক মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ১৯৬০ সালে গড়ে প্রায় ২ হাজার ১০০ (কিলো) ক্যালোরি ছিল। কিন্তু ১৯৬০ সালে তা কমে ১ হাজার ৮৪০-এ নেমে আসে। দ্য জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের তথ্যানুসারে, শুধুমাত্র ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ১৯৮৭ সালের মধ্যে এটি আবার ২ হাজারে (কিলো) পৌঁছেছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সমীক্ষা ২০১৬ অনুসারে, দেশে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণ ২০১০ সালে ২ হাজার ৩১৮.৩ কিলোক্যালরি থেকে ২০১৬ সালে দিনে ২ হাজার ২১০.৪ কিলোক্যালরিতে নেমে এসেছে।
২০১০ সালে ৬ হাজার ৩১ টাকা থেকে ২০১৬ সালে খাদ্যের ওপর পারিবারিক ব্যয় বেড়ে ৭ হাজার ৩৫৪ টাকা হয়েছে। গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ (এইচআইইএস)-এর করা ২০১৬ সালের জরিপে পরামর্শ দেয়, চাল খাওয়ার হ্রাসের প্রবণতা কম ক্যালোরি গ্রহণের কারণ হতে পারে। তবে পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এটা সমর্থিত নয়।
২০২০-২১ অর্থবছরে মাথাপিছু চাল প্রতি বছর ১৮১.৩ কেজি হবে, যা এশিয়াতে সর্বোচ্চ হবে। জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থার ‘দ্য ফুড আউটলুক’ শিরোনামের প্রতিবেদন অনুসারে, যখন ২০১৬-১৯ সালে এই পরিমাণ ছিল ১৭৯.৯ কেজি প্রতি বছর।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে সরকারি খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষমতা ২২ লাখ টন এবং ২০২৫ সালের মধ্যে এটি ৩০ লাখ টনে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত খাদ্য মজুত ছিল ১৫.১৩ লাখ টন। এর মধ্যে ১২.২৯ লাখ টন চাল, ২.৮৪ লাখ টন গম এবং ১০ হাজার টন ধান। সরকার বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে স্বল্পমূল্যে ১৫.৬০ লাখ টন খাদ্যশস্য এবং ৭.৮৪ লাখ টন ত্রাণ বিতরণ করছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ২২.৮৯ লাখ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫.৫৬ শতাংশ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০০৫-৬ অর্থবছরে শ্রমিকের একদিনের মজুরির বিপরীতে ৪-৫ কেজি চাল কেনা যেতো, যা ২০১৮ সালে ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে ১১ কেজি হয়েছে।

Check Also

নবাবগঞ্জে শীতার্তদের পাশে প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড

নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি : ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় দুস্থ, অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে কম্বল বিতরণ …