sliderস্থানীয়

আজীবন বিপ্লবী ভাষা সংগ্রামী কমরেড আব্দুল খালেক মৃধা

মো. নজরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ : বাঙালী জাতিরাষ্ট্রের জন্মের রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে মাইল ফলক হয়ে আছে গেল শতকরে ষাটের দশকটি। এই দশকেই এদেশের ছাত্র সমাজ গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনের বিলটি বাতিলের দাবিতে আন্দালন গড়ে তোলে, এই দশকেই ধর্মবাদি পাকিস্তানি রাষ্ট্র ব্যাবস্থার বিপরীতে ভাষাভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তবাদের উন্মেষ ঘটে। এই দশকেই আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের ’ম্যাগনাকার্ট’ হিসেবে পরিচিত ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়। এই দশকেই গণঅভুথ্থানের মুখে প্রবল প্রতাপশালী শাসক আয়ুব খান বিদায় নিতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনও বিস্তৃতি পায় এই দশকটিতে। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো নিষিদ্ধ। তাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও ছাত্র ইউনিয়ন হয়ে ওঠে রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি।

সেই অগ্নিগর্ভেই ভাষা আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতাসহ শ্রেণী সংগ্রামের অকুতোভয় সৈনিক কমরেড আব্দুল খালেক মৃধার জন্ম হয়। মানিকগঞ্জের এই জনপদে কৃষক ও খেতমজুর আন্দোলনের লড়াকু সংগঠক আব্দুল খালেক মৃধা ১৯০৫ সালে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার দানিস্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম আলী নকী মৃধা একজন কৃষক ছিলেন। আব্দুল খালেক মৃধা পেশায় একজন আদর্শ দলিল লেখক ছিলেন। তিনি মানিকগঞ্জ তেরশ্রী অঞ্চলের বিপ্লবী প্রমথ নন্দীর সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে দিক্ষীত হয়ে নিজেকে শ্রেণী সংগ্রামের আন্দোলন সংগ্রামে নিবেদন করেন। তিনি প্রাতিষ্ঠনিক শিক্ষা বেশিদূর করতে না পারলেও রাজনৈতিক লেখাপড়ায় বেশ সচেতন ছিলেন। কমরেড প্রমথ নন্দী ও সমর ঘোষদের সাথে তিনিও ১৯৪৭ সালে অর্জিত ভুখা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেন। তিনি মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শাসকদের রক্তচক্ষুর শিকারসহ হামলা মামলায় আক্রান্ত হয়েছেন অসংখ্যবার।

তৎতকালীন কমিউনিস্ট নেতাদের অনুপ্রেরণায় রাজনৈতিক সচেতন মানুষ হিসেবে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তেরশ্রী অঞ্চলের মাস্টার মশাই কমরেড প্রমথ নাথ নন্দীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন গড়ে উঠলে তিনিও ছাত্রদের সাথে এই আন্দোলনে সামিল হন। তিনি মূলত কৃষক আন্দোলনের সাথেই ওতপ্রতভাবে যুক্ত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সমাজে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক কৃষক ক্ষেমমজুরদের জন্য কমরেড প্রমথ নাথ নন্দী, সমর ঘোঘ,সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী,ডা. চিত্ত সাহদের নেতৃত্বে ঘিওর,দৌলতপুর,হরিরামপুর ও মানিকগঞ্জ সদরের বেতিলাসহ জেলার বেশিরভাগ গ্রামে কৃষক সংগঠন গড়ে তোলেন। কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে অসংখ্যবার কারাবরন করতে হয়েছে। তখনকার জমিদারগন কমিউনিস্টদের দেখলে যেমন ভয় পেতেন অন্যদিকে সুযোগ পেলে হামলা মামলা দিয়ে শায়েস্তা করতেন। কমরেড খালেক মৃধাসহ কমিউনিস্টরা তাদের বুদ্বিমত্তা দিয়ে সমস্ত ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কৃষকদের সাথে নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

তিনি ১৯৪৮ সালের ২৮ মে থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত কলকাতায় ভারতের ২য় কংগ্রেসে অংশগ্রহন করেন এবং ১৯৪৭ সালের ভূখা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলেন। তখন “ইয়া আজাদী ঝুটা হায়,লাখ ইনসান ভূখা হায়“ এই ¯েøাগানে সামিল হয়ে কমিউনিস্টরা আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলেন। এই স্বাধীনতা মেনে নিতে না পেরে খালেক মৃধা ও তার দল রাতের আধারে গোপনে হরিরামপুর থানা ও ইউনিয়ন বোর্ডে কালো পতাকা উত্তোলন করেন। পাকিস্তান সরকার তার পিছু ছাড়েনি তার পরদিনই তাকেই সন্দেহ করে দেশ রক্ষা আইনে মামলা করেন এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কোলকাতায় গমন করেন। ফিরে আসার পর ১৯৪৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ফতুল্লা স্টেশনে তিনি গ্রেফতার হন। দ্রæত মামলা আইনে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হন।

আব্দুল খালেক মৃধা ছাত্রদের সাথে ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে এক বছর কারাবরণ করেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহন ও সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও তিনি ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে সংগঠিত করতে নিরলসভাবে কাজ করেন। সমাজ পরিবর্তনের মাহন এই বিপ্লবী ১৯৯৬ সালের ২২ ডিসেম্বর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। তার শরিরের পতন হলেও আদর্শিকভাবে তিনি নতুন প্রজন্মের মাঝে জীবন্ত থাকবে। বর্তমান সময়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তথা পিছিয়ে পড়া মানুষরে জীবন মান উন্নয়ন ও সংগঠিত করতে একজন আব্দুল খালেক মৃধাদের খুবই অভাব।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button