sliderস্থানীয়

অসময়ে বর্ষা ও খরায় কৃষক নিঃস্ব

নাসির উদ্দিন, হরিরামপুর প্রতিনিধি: মানিকগঞ্জের হরিরামপুর পদ্মা বেষ্টিত নিম্নাঞ্চল প্লাবন ভুমি এলাকা। এখানকার মাটি বেলে দু’আশ মাটিতে চর ও নিন্ম প্লবন ভুমিতে ধনিয়া, রাঁধুনী, কালিজিরা, পিয়াজ, রসুন, মরিচ, বাঙ্গি, শরিষা, তিল, কাউন, গুজিতিল, লাউ,লালশাক, পাটশাক, কচু, ঢেরস, বেগুন, মিষ্টি আলু, গোল আলু, খেসারী, মুগ ডাল ও আমন মৌসুমে হিজল দিঘা ধান চাষ করেন। এবছর দেখা যায় বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে রুদের খড় তাপে মাঠের ফসল পুড়ে যায়। কৃষক সেচ দিয়েও মাঠের ফসল রক্ষা করতে পারেনি। তাপমাত্রা বেশী হওয়ায় মানুষ সহ প্রাণি সম্পদ ও পশু পাখি টিকে থাকা কষ্ট হয়েছে।

মানিকগঞ্জ পদ্মা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, কালিগঙ্গা বেষ্টিত নিচু এলাকা হওয়ায় উজানে বৃষ্টির পানিতে আষাঢ়ে প্রথমে বর্ষার দেখা মেলে। কিন্তু এবছর আষাঢ়ের শেষেও বর্ষার দেখা মেলেনি। মানিকগঞ্জ এলাকায় আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি সময়ে অল্প পরিমানে বৃষ্টির দেখা পেলেও তেমন বৃষ্টি হয়নি। তবে দেশের কোন কোন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতে খবর পাওয়া যায়। ফলে মাঠে পলি মাটিসহ পানি মাঠে প্রভাহিত হয়নাই। ফলে বৈশাখ মাসে মাঠে বপন করা হিজল দিঘা, মোল্লা দিঘা, ভাউয়্যালা,বার্গা দিঘা, দিঘা ধান ছোটই রয়ে গেছে। এসকল ধানের বৈশিষ্ট্য হলো বর্ষার পানি আসবে, পানির সাথে সাথে ধান বড় হয়। তাছাড়াও মাঠে পল্লি না পড়ায় ফসল বৈচিত্র্য আবাদে ব্যাঘাত ঘটে। এই জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণে ফসলের মাঠ থেকে হারিয়ে গেছে লক্ষি দিঘা ধান, গুজিতিল, জৈন, কাউন, তিশির আবাদ।

বাসুদেবপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক শহিদুল ইসলাম বলেন, তার ১০ বিঘা আউশধান ও ১৩ বিঘা তিল ক্ষেত বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। আর কয়েকদিনের মধ্যে ফসল ঘরে উঠতো। পদ্মার পানি বারতি লোকালয়ে ঢুকতে থাকে। তাই সব ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
এনায়েতপুর গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ঝিলু মোল্লা বলেন, ৫ বিঘা আউশধান ও ৫ বিঘা তিল ছিলো আমার আউশধান পানিতে ডুবে গেছে, কিছু তিল কেটে খোলাই আনছি সেখানে ও পানি উঠে ডুবে গেছে।

হরিরামপুরের বাহিরচরের কৃষক সুচরন সরকার বলেন, কৃষক চাষাবাদ কিভাবে করবে প্রকৃতির হাবভাব বুঝি না। কখন বৃষ্টি হবে আর কখন খরা হবে। আগে সুনিষ্টি সময়ে বৃষ্টি হতো চাষাবাদ করতে ভালো লাগত। এখন খরা ও অতি বৃষ্টিতে দুই ভাবেই ফসল নষ্ট হচ্ছে। এবছর বৈশাখ জৈষ্ঠ্য দু মাসের খরায় কৃষকে নিঃস্ব করেছে। আমি ৩০০ শতক জমিতে ভুট্টা, তিল, রাঁধুনী, কালিজিরা, ধনিয়া কচু চাষ করেছি। রুদ্রে পুড়ে গেছে ছাই হয়ে গেছে। স্বেচ দিয়েও ফসল রক্ষা করতে পারেনি। রুদ্রের এত তাপ ছিল। আমাদের কাছের রুদ্রে পুড়ার ছবি আছে, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলা না। আমার এবছর দুই লক্ষ টাকার মসলা নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আমরা আমাদের চাষাবাদের বীজ হারিয়েছি। হাতে সম্বল হারা হয়েছি, আগামীতে আবাহাওয়া ভালো হলে আমরা সবাই ভালো থাকতে পারব। আমরা চেষ্টা করি গোবর সার ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমানো। মাঠে বিভিন্ন ফসল চাষ করে লাভবান হওয়ার।

মানিকগঞ্জ হরিরামপুরের কৃষক শহীদ বিশ্বাস (৫৭) বলেন বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হয়। বর্ষা হয়ে মাঠে ঘাটে পানি প্রবাহিত হয়। পলি পড়ে মাঠের ফসল ভালো হয়। এবছর আষাঢ় মাস শেষ বর্ষার দেখা মেলেনি। হরিরামপুরে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাস এই সময়ে মাঠে ঘাট পানিতে তলিয়ে থাকে। আমরা জমিতে দিঘা জাতের ধান চাষ করি। পানির সাথে তাল মিলিয়ে বড় হয়। আমরা খড় ও ধান পাই। আবার ঝিটকা হাজারি গুর তৈরিতে দিঘা ধানের খড় প্রয়োজন হয়। তাছাড়াও গবাদি পশুর খাদ্যের সমস্যা থাকে না। বর্ষার সময় প্রানীর সম্পদের খাদ্য হিসাবে অচাষকৃত খাদ্য উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে জল দুর্বা, দুর্বাঘাস, কাটা হেনসি, কাশবন, ছোন, কাইশ্যা, নলখাগড়া ঘাস, গোইচা, হেনসি, বাদলা, হামা, ছোট কলমী ও কস্তরী এ সকল কাচা ঘাস গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

হরিরামপুর আন্ধারমানিকের কৃষক রেনুবালা বিশ্বাস (৫০) বলেন, আমরা মাঠে ফসল ফলাই। কৃষক হিসাবে আমাদের অভিজ্ঞতার কমতি নেই। তবে এবছর বৈশাখ জৈষ্ঠ্য মাসে খড়ায় ফসল পুড়ে। তবে এবছর বর্ষা দেরীতে আসায়, মাঠে ফসল চাষ করতে দেরী হবে, উৎপাদন কম হবে। অসময়ে অতিবৃষ্টিতে ফসলে লালশাক, মুলা, ধনিয়া, ডাটা নষ্ট হয়। বর্ষা আসে দেরিতে, ঠিক সময়ে ফসল বপন করতে পারি না। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে আমরা কৃষকগণ মাঠ থেকে ফসল ঘরে তুলতে পারছে না। তবে আমি খেসারী, দেশি টমেটু, লাল মুলা, আউশা ডাটা, তিল, তিশি, শরিষা, মটর সহ ধান বীজ সংরক্ষণ করে চাষ করি। আমি বারসিক এর নিকট থেকে কাউন, হলুদ, গুজিতিল বীজ সংগ্রহ করে চাষ করছি। কাউন আবাদে সার বিষ লাগে না, ফলে উৎপাদন খরচ কম। বর্তমানে কৃষক কাউন চাষ করে বেশ লাভবান। তবে জমির ঘাস জমিতে পঁচিয়ে সবুজ সার তৈরি ও গোবর সার দিয়ে ফসল উৎপাদন। কৃষক পরিবারে সকলে মিলে কৃষি কাজ করায় উৎপাদন খরচ কম ও আমরা ভালো আছি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাঠাৎ অতি বৃষ্টিতে কৃষকের ফসল নষ্ট হয় আবায় খরায় ফসল পুড়ে যায়। আবার বর্ষা দেড়িতে আসায়, চাষাবাদ করতে দেরি হয়। উৎপাদন কম হয়। এভাবে ফসল নষ্ট হওয়া ও ফসল উৎপাদন কমে আসায়, কৃষকের নিকট থেকে ফসলের বৈচিত্র্য হারা হচ্ছে। মাঠ থেকে প্রান্তিক কৃষক ফসল ঘরে তুলতে না পারায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার রহমান জানান, প্রতিবছরেই বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির মুখোমুখি হন এই এলাকার কৃষকেরা। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ করার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সরকার।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button